বাস্তবায়নে যত দেরি, তত বেশি ক্ষতি-চার বড় প্রকল্প নিয়ে অনিশ্চয়তা

পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, উড়ালসেতু ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করা—যোগাযোগ খাতের সবচেয়ে বড় এই চার প্রকল্পের সর্বশেষ খবর হতাশাব্যঞ্জক। প্রথম আলোয় মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চার মহা প্রকল্প ‘পথ হারিয়েছে’।


যোগাযোগ খাতে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করলে বলতে হয়, প্রতিশ্রুতি পূরণে সাফল্য নেই। অথচ সরকারের শাসনকালের দুই-তৃতীয়াংশ সময় ইতিমধ্যে পেরিয়ে গেছে।
সর্বাধিক আলোচিত ও বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতু ২০১৫ সালের মধ্যে চালু হবে বলে সরকার ঘোষণা করেছিল। কিন্তু সেতু নির্মাণের একদম প্রাথমিক বিষয় অর্থায়নই মাঝপথে আটকে গেল। বিতর্কিত মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরও পদ্মা সেতুর ভাগ্যে শিকে ছিঁড়েনি। সরকার মালয়েশিয়ার সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করেছে। কিন্তু শিগগির যে এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে, এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। অর্থ জোগানো ও ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে মালয়েশিয়া ৩০ মাস সময় চায়, বাংলাদেশ চায় ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হোক। যা-ই ঘটুক না কেন, কোনো অবস্থাতেই এক থেকে দেড় বছরের আগে সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব হবে না।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পটির কাজ ২৫ মাসে এগিয়েছে মাত্র ১৯ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ে, অর্থাৎ ২০১৩ সালের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব নয়—এ কথা বলছেন প্রকল্পের কর্মকর্তারাই। ঢাকায় মেট্রোরেলের পথ নির্ধারিত হয়েছে, কিন্তু প্রকল্পের প্রস্তাবই এখনো অনুমোদিত হয়নি। অথচ সরকার বলেছিল, ২০১৪ সালের মধ্যে মেট্রোরেল চালু হবে। প্রায় এক বছর হতে চলল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধন করেছেন ঢাকা উড়ালসড়ক প্রকল্প। কিন্তু তারপর আর অগ্রগতি নেই।
এই চার প্রকল্পকেই বিশেষজ্ঞরা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন। কেউ কেউ এগুলোকে আখ্যায়িত করেন জাতীয় অর্থনীতির ‘লাইফ লাইন’ হিসেবে। সরকারও এগুলোকে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প মনে করে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, এগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের লক্ষণ কোথায়?
গুরুতর বিষয় হলো, প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার কারণে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে উচ্চ হারে। পদ্মা সেতুর প্রথম প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১১ হাজার ৪৫ কোটি টাকা; এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ, শুধু বিলম্বের কারণেই পদ্মা সেতুর নির্মাণ-ব্যয় বেড়ে গেছে দ্বিগুণের বেশি। একইভাবে বিলম্বের কারণে মেট্রোরেল প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয়ও বেড়ে গেছে প্রায় পাঁচ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। কাজ শুরু করতে দেরি হলে ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।
প্রতিটি প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে শুরু করে বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে গতিসঞ্চার করা একান্ত প্রয়োজন। বিশেষত, পদ্মা সেতু নিয়ে আর কালক্ষেপণ করা উচিত নয়। সর্বশেষ খবরে জানা গেল, সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরুর প্রক্রিয়া আরম্ভ করেছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে দ্রুত সমঝোতায় আসা প্রয়োজন বলে মনে করি।

No comments

Powered by Blogger.