বীর মুক্তিযোদ্ধা- তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না

৬০৫ স্বাধীনতার চার দশক উপলক্ষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজন। শহীদ মো. রুহুল আমিন, বীরশ্রেষ্ঠ রাজাকাররা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাঁকে হত্যা করে ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়। সেদিন সকালে জলপথে নির্বিঘ্নেই খুলনায় পৌঁছায় তিনটি গানবোট।
এর মধ্যে দুটি ছিল মুক্তিবাহিনীর। নাম ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’। অপরটি ভারতীয় নৌবাহিনীর ‘প্যানভেল’। পলাশ গানবোটের ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার ছিলেন মো. রুহুল আমিন।
মো. রুহুল আমিন ও তাঁর সহযোদ্ধারা ৭ ডিসেম্বর ভারত থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন বাংলাদেশ অভিমুখে। দুই গানবোটে তাঁরা ছিলেন ৫৬ জন। অভিযান শুরু হয় হলদিয়া নৌঘাঁটি থেকে। রায়মঙ্গল নদী অতিক্রম করার সময় তাঁরা বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত গেয়ে গানবোটের মাস্তুলে জাতীয় পতাকা ওড়ান। পথে মিত্র বাহিনীর দুটি রণতরি (প্যানভেল ও চিত্রাঙ্গদা) তাঁদের সঙ্গে যোগ দেয়।
১০ ডিসেম্বর সকালে জাহাজগুলো মংলায় পৌঁছায়। সেদিন বেলা নয়টায় মংলা থেকে শুরু হয় চূড়ান্ত অভিযান। সামনে থাকে প্যানভেল, মাঝে পলাশ, শেষে পদ্মা। চিত্রাঙ্গদা মংলায় থেকে যায়। বেলা আনুমানিক ১১টার দিকে গানবোটগুলো শিপইয়ার্ডের কাছে পৌঁছে। পথে কোথাও তাঁরা বাধা পাননি।
এমন সময় আকাশে দেখা যায় তিনটি জঙ্গিবিমান। শত্রুবিমান মনে করে মো. রুহুল আমিন সহযোদ্ধাদের নির্দেশ দেন বিমানবিধ্বংসী অস্ত্র দিয়ে বিমান প্রতিরোধের। তাঁর সহযোদ্ধারা দ্রুত প্রস্তুত হন। এর মধ্যে ভারতীয় গানবোট প্যানভেল থেকে তাঁদের জানানো হয় ওগুলো ভারতীয় বিমান।
বিমানগুলো কিছুটা নিচে নেমে দক্ষিণ-পশ্চিমে সাগরের দিকে যায়। ১০-১১ মিনিট পর হঠাৎ ঘুরে এসে বোমাবর্ষণ করে পদ্মার ওপর। পরক্ষণেই পলাশে। যদিও গানবোটগুলো মুক্তি না মিত্র বাহিনীর তা শনাক্তের জন্য ছাদে ১৫ ফুট লম্বা এবং ১০ ফুট চওড়া হলুদ কাপড় বিছানো ছিল। তার পরও এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্যানভেল গানবোটে বিমান বোমাবর্ষণ করেনি। সেটি অবশ্য বেশ এগিয়ে ছিল।
বোমার আঘাতে মুক্তিবাহিনীর গানবোটে আগুন ধরে যায়। বিপদ আন্দাজ করে যাঁরা আগেই পানিতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, তাঁরা অক্ষত থাকেন। কিন্তু রুহুল আমিনসহ অনেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গানবোটেই ছিলেন। প্রথম আঘাতেই তিনি আহত হন। বোমার স্প্লিন্টার তাঁর বাঁহাতে লাগে। হাত ভেঙে যায় এবং তিনি মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে থাকে।
একটু পর তাঁর এক সহযোদ্ধা (তাঁর নামও রুহুল আমিন) তাঁকে নিয়ে পানিতে ঝাঁপ দেন। ঘটনাচক্রে এ রুহুল আমিন তেমন আহত হননি। তিনি গুরুতর আহত মো. রুহুল আমিনকে নিয়ে সাঁতরে তীরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রবল স্রোতের কারণে দুজন বিচ্ছিন্ন হয়ে যান।
আহত রুহুল আমিন পরে আপ্রাণ চেষ্টায় সাঁতার কেটে নদীর পূর্বপাড়ে পৌঁছাতে সক্ষম হন। কিন্তু সেখানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল আরেক বিপদ। নদীর পূর্ব তীরে ছিল কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা ও অনেক রাজাকার। রাজাকাররা তাঁকে আটকের পর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। নদীতীরে পড়ে থাকে নিথর তাঁর ক্ষতবিক্ষত মরদেহ।
পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা চলে যাওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা মো. রুহুল আমিনের মরদেহ উদ্ধার করে নদীতীরের এক স্থানে সমাহিত করেন। তাঁর সমাধি চিহ্নিত ও সংরক্ষিত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর সমাধির পাশে এ ঘটনায় শহীদ আরও দুজন নৌমুক্তিযোদ্ধার মরদেহ উদ্ধার করে সমাহিত করা হয়।
মো. রুহুল আমিন পাকিস্তান নৌবাহিনীতে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের পিএনএস বখতিয়ার নৌঘাঁটিতে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে কয়েক দিন পর গোপনে কর্মস্থল ত্যাগ করে বাড়ি যান। বাবা-মার সঙ্গে দেখা করে ভারতে গিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। প্রাথমিকভাবে ২ নম্বর সেক্টরে স্থলযুদ্ধের নানা কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন। পরবর্তীকালে সরাসরি যুদ্ধেও অংশ নেন। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তিনি মুক্তিবাহিনীর নৌদলে অন্তর্ভুক্ত হন।
মুক্তিযুদ্ধে, বিশেষত ‘অপারেশন হটপ্যান্টস’ অভিযানের জন্য শহীদ মো. রুহুল আমিনকে মরণোত্তর বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ০৫।
শহীদ রুহুল আমিনের পৈতৃক বাড়ি নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার বাঘচাপড়া গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মো. আজহার পাটোয়ারি, মা জোলেখা খাতুন।
সূত্র: মেজর (অব.) ওয়াকার হাসান বীর প্রতীক এবং মুক্তিযুদ্ধে নৌ-অভিযান, কমান্ডো মো. খলিলুর রহমান।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
rashedtr@prothom-alo.info

No comments

Powered by Blogger.