পদ্মা সেতু নিয়ে প্রতীক্ষা বাড়ল

পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতি তদন্ত পর্যবেক্ষণের জন্য বিশ্বব্যাংক গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চলমান বৈঠক-প্রক্রিয়ার কারণে সেতুর কাজ শুরুর বিষয়টি আরো প্রলম্বিত হয়েছে।


তিন দিনের ঢাকা সফরে বিশেষজ্ঞ প্যানেল শুধু দুদক কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচয় এবং দুদক আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কে অবহিত হয়েছে। প্রথম সফরে বিশেষজ্ঞ প্যানেল দুদকের কাছে অনেক তথ্য চাইলেও দুদক তা সরবরাহ করতে পারেনি। আবার বিশেষজ্ঞ প্যানেলের কাছে দুদকও কিছু তথ্য চাইলে তা সরবরাহ করা হয়নি। তাই বিশেষজ্ঞ প্যানেলের এ সফর শুধু আইন ও বিধিবিধান জানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ডিসেম্বরের শেষ দিকে বিশ্বব্যাংকের প্যানেল আবারও ঢাকা সফরে আসবে। এভাবে ঠিক কবে নাগাদ পদ্মা সেতুর বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে, তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। এতে করে ধারণা করা হচ্ছে, পদ্মা সেতু নিয়ে প্রতীক্ষার পালা আরো বাড়ল। বিশ্বব্যাংক ও দুদক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
আরো জানা গেছে, বিশেষজ্ঞ প্যানেলের শর্ত পূরণ করতে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনসহ প্রায় ৯ জনকে আবার জিজ্ঞাসাবাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। এ দফায় তালিকাভুক্ত হতে পারেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান। জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপারে শিগগিরই অভিযুক্তদের চিঠি দেবে দুদক।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক প্রধান আইনজীবী লুই গাব্রিয়েল মোরেনো ওকাম্পোর নেতৃত্বে বিশ্বব্যাংকের তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ প্যানেল তিন দিনের সফর শেষে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা ছেড়েছে। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হচ্ছেন হংকংয়ের দুর্নীতিবিরোধী কমিশনের সাবেক কমিশনার টিমোথি টং এবং যুক্তরাজ্যের দুর্নীতি দমন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক রিচার্ড অল্ডারম্যান।
বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি এলেন গোল্ডস্টেইন গত সোমবার সাংবাদিকদের বলেছেন, বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ঢাকা সফরের প্রাথমিক একটি প্রতিবেদন আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দুদককে দেওয়া হবে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন কবে দেওয়া হবে তা তিনি বলেননি। যদিও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) থেকে বলা হয়েছিল, বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রতিবেদন এক মাসের মধ্যে দেওয়ার কথা।
এদিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত চলতি মাসে দরপত্র আহ্বান এবং আগামী এপ্রিলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ শুরুর যে ঘোষণা দিয়েছেন, তা কতটুকু বাস্তবায়ন হবে, এ বিষয়ে দুদকসহ কেউই কোনো উত্তর দিতে পারছেন না।
সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল গত সোমবার সন্ধ্যায় দুদকের সঙ্গে বৈঠকে দুদক আইন ছাড়াও আরো কিছু নথিপত্র চায়। কিন্তু দুদক সেগুলো সরবরাহ করেনি। যদিও আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এসব তথ্য সরবরাহ করা হবে বলে দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বৈঠকে দুদকও বিশেষজ্ঞ প্যানেলের কাছে পদ্মা সেতু প্রকল্পের দুর্নীতির প্রমাণাদি চেয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞ প্যানেলও তা সরবরাহ করেনি। উভয় পক্ষের মধ্যে এখনো তথ্যের আদান-প্রদান পুরোপুরি শেষ হয়নি।
দুদক কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পু গতকাল মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল দুদকের কাছে যেসব কাগজপত্র চেয়েছে, তা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে দেওয়া হবে। এ ছাড়া আগামী ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে বিশেষজ্ঞ প্যানেল আবারও ঢাকা সফরে আসবে। এ সময়ের মধ্যে দুদক তাদের অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। আর বিশেষজ্ঞ প্যানেলও তাদের পর্যবেক্ষণ চলমান রাখবে। ঠিক কবে নাগাদ বিষয়টির নিষ্পত্তি হবে তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।
উভয় পক্ষের মধ্যে চলমান এ আইনি প্রক্রিয়া কবে নিষ্পত্তি হবে এবং পদ্মা সেতুর কাজ কবে শুরু হবে তা দুদকসহ কেউই বলতে পারছে না। আগামী ডিসেম্বরে বিশেষজ্ঞ প্যানেল আবার ঢাকায় এসে কবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবেন সেটাও কেউ বলতে পারেননি। কারণ, বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞ এ প্যানেলের ইতিবাচক প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করছে ১২০ কোটি ডলারের ঋণের অর্থ ছাড়।
এদিকে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন ক্রয় নীতিমালা প্রণয়ন ও সেতু নির্মাণ পদ্ধতি নির্ধারণে বিশ্বব্যাংকের দ্বিতীয় মিশনের ঢাকা সফর নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। এ মিশনের চলতি মাসে ঢাকা সফরের কথা থাকলেও তার কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ মিশন কবে আসবে তার কোনো শিডিউল এখনো ঠিক হয়নি। সদ্য সফরকারী বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রতিবেদন প্রকাশের আগে দ্বিতীয় মিশনের ঢাকা সফরে না আসার সম্ভাবনা বেশি বলে জানা গেছে। দ্বিতীয় মিশনের অর্থ মন্ত্রণালয়, ইআরডি ও সেতু বিভাগের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সঙ্গে দুদকের এ আইনি কার্যক্রম কবে নিষ্পত্তি হবে জানতে চাইলে দুদকের আইন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট আনিসুল হক গত রাতে কালের কণ্ঠকে জানান, এ বিষয়ে একটু অপেক্ষা করতে হবে। পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অনুসন্ধানের রোডম্যাপ ও সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে ঈদুল আজহার পর বিস্তারিত জানানো হবে। তিনি জানান, বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেল দুদকের কাছে পেনাল কোড, দণ্ডবিধি, দুদক আইন, দুদকের অরগানোগ্রামসহ বেশ কিছু তথ্য ও নথিপত্রের কপি চেয়েছে। এগুলো দেওয়া হবে। এ ছাড়া এ প্যানেলের কাছে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করা হবে। আনিসুল হক বলেন, 'আগামী আড়াই মাস দুদক তাদের অনুসন্ধান কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। এ সময় বিশেষজ্ঞ প্যানেল আমাদের কাছে তদন্ত সঠিকভাবে অগ্রসর হচ্ছে কি না এবং অনুসন্ধানের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইবে।'
সূত্র জানায়, পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগে যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, গত দুদিনের বৈঠকে দুর্নীতির সেসব প্রমাণ বিশেষজ্ঞ প্যানেলের কাছে চেয়েছে দুদক। কিন্তু বিশেষজ্ঞ প্যানেল কোনো তথ্য সরবরাহ করেনি।
এ প্রসঙ্গে গতকাল দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান সাংবাদিকদের বলেন, 'বিশেষজ্ঞ প্যানেলকে আমরা অনেক তথ্য দিয়েছি। কিন্তু তাদের কাছে অনেক তথ্য চাওয়া হলেও তারা তা দেয়নি। তবে আমাদেরকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে তারা।'
এ প্রসঙ্গে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের বাংলাদেশে এটি প্রথম সফর। তারা বাংলাদেশের আইনকানুন সম্পর্কে অবহিত হয়েছে। তিনি বলেন, আইনি এ প্রক্রিয়ার কারণে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করতে দেরি হচ্ছে। তাই বিশেষজ্ঞ প্যানেলকে সহায়তা করতে তিনি দুদককে পরামর্শ দেন। কারণ দুদক সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের নেতিবাচক কোনো ধারণা তৈরি হলে তাতে বিশ্বব্যাংকের অর্থ পেতে সমস্যা হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জ্যেষ্ঠ গবেষক জায়েদ বখত কালের কণ্ঠকে জানান, দুদকের অনুসন্ধান ও বিশেষজ্ঞ প্যানেলের পর্যবেক্ষণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। আর এ প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগবে। তাই সহসা বিশ্বব্যাংকের প্রতিশ্রুত ১২০ কোটি ডলার পাওয়া নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। এতে পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হতে আরো সময় লাগবে। তিনি বলেন, কানাডার পুলিশও একটি তদন্ত করছে। দুদক ও কানাডার পুলিশের তদন্তের একটি সন্তোষজনক অগ্রগতি না হলে বিশ্বব্যাংকের অর্থ ছাড় নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ফের জিজ্ঞাসাবাদ : দুদক সূত্রে আরো জানা গেছে, স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের স্বার্থে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির দায়ে যাদেরকে আগে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল, তাঁদেরকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করবে দুদক। বিশ্বব্যাংকের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের অন্যতম একটি শর্ত এটি। সোমবার সন্ধ্যায় বিশেষজ্ঞ প্যানেল দুদককে লিখিত আকারে এ শর্ত দিয়েছে বলে জানা গেছে। তাই বিশেষজ্ঞ প্যানেলের এ শর্ত পূরণে শিগগিরই অভিযুক্তদের পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করা হবে। এতে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররাফ হোসেন ভূঁইয়াসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা থাকবেন। আগামী ডিসেম্বরে বিশেষজ্ঞ প্যানেল দ্বিতীয়বার ঢাকা সফরে এসে এ শর্তের বাস্তবায়ন দেখতে চাইবে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পু কালের কণ্ঠকে বলেন, তদন্তের স্বার্থে দুদক যে কাউকে একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে আগে যাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল, তাঁদেরও পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

No comments

Powered by Blogger.