পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন-আবেগই জনমনোহরণকারী শক্তির উৎস by কৃষ্ণা বসু

মমতাকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখার ফলে তার চরিত্রের কোন দিকটি আমায় আকৃষ্ট করেছে, এ কথা যদি কেউ জিজ্ঞাসা করেন, আমি বলব, সাহস। সাহস না বলে দুঃসাহসও বলা যায়। জানি অনেকে বলবেন, তার চরিত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো মানুষের প্রতি ভালোবাসা।


কিন্তু সেই ভালোবাসায় সাড়া দিয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস থাকা চাই


মমতার সঙ্গে আমার পরিচয় ১৯৮২ সালে। চৌরঙ্গী বিধানসভার নির্বাচনী প্রচারে আমরা খুব ব্যস্ত। একদিন এক অল্পবয়সী মেয়ে এসে আমাদের সঙ্গে কাজে যুক্ত হলো। সে থাকে কালীঘাটে, কিন্তু সে 'শিশিরদা'র অর্থাৎ ডা. শিশির কুমার বসুর সঙ্গে প্রচার করতে উৎসুক। নির্বাচনী প্রচারে আমার হাতেখড়ি মমতার হাত ধরে। বিশাল অট্টালিকার সবচেয়ে উঁচুতলায় দু'জনে লিফটে চড়ে উঠে যাই। তারপর দু'দিকের ফ্ল্যাটে নক করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসি। মমতার চরিত্রের যেদিক আমার চোখে পড়েছিল তা হলো, নেতৃত্ব হাতে তুলে নেওয়ার এক সহজাত ক্ষমতা। আমাকে বলল, ছাতা মাথায় দেওয়া চলবে না, মানুষ পছন্দ করে না। অগত্যা মে মাসের রোদে পুড়তে পুড়তে রাস্তায় ঘুরছি। সেই রাস্তা পরিভ্রমণের সময় মমতা এমন কিছু কথা বলত, যা আজ পেছন ফিরলে খুব তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়। তার সাধারণ কর্মী থেকে রাজ্য-রাজনীতির কাণ্ডারি হওয়া, সর্বভারতীয় নেত্রী হিসেবে তার উত্তরণ আমরা সবিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করেছি।
নেত্রী মমতা সম্পর্কে আরেকটি কথা এখানে বলতেই হয়। সে একজন মহিলা রাজনীতিক। এ দেশে মহিলা রাজনীতিক আমরা আরও পেয়েছি। তাদের অনেকের প্রতিভা, রাজনীতির কূটকৌশলগত যোগ্যতা অনস্বীকার্য। কিন্তু মমতা সম্পর্কে যে কথা বলতেই হবে তা হলো, সে কোনো রাজনীতিকের স্ত্রী নয়, মেয়ে নয়, বান্ধবীও নয়। কালীঘাটের এক অসচ্ছল পরিবারের অনেক ভাইবোনের মধ্যে একজন। রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গে তাকে সংসারে রান্না করতে হয়েছে, অর্থচিন্তা করতে হয়েছে। অনেক দিন পর একসঙ্গে দিলি্ল চলেছি। সে প্লেনে বসে তার দ্বিতীয় বইটি লিখছে_ একটি উপন্যাস। আমাকে কয়েক পাতা পড়তে দিয়ে সে বলল, আরও লেখালেখি করে উপার্জন করতে হবে। মাকে সংসার চালাতে সাহায্য করতে চাই। শুনে কষ্ট হয়েছিল।
প্রথমবার মমতার যাদবপুরে নির্বাচনের লড়াই। অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রত্যেক মানুষের কাছে পেঁৗছেছিল সে। তখনকার লাল দুর্গ সোনারপুরে এক জনসভা থেকে ফিরে ডা. শিশির বসু যখন বললেন, মনে হচ্ছে মমতা জিতবে, কেউ বিশ্বাস করিনি। অথবা কংগ্রেস ভেঙে যখন মমতা তৃণমূল করল, তখন কী কঠিন দিন। নতুন দল হিসেবে এক মাসের মাথায় নির্বাচনে যেতে হলো। অন্য পক্ষের নির্বাচনী চাকচিক্য দেখে আমাদের ম্লানমুখ। নির্বাচন চলাকালে সমালোচনা শুনতে শুনতে তাই মনে হতো, বলি, আজ যদি দলগতভাবে মমতার কিছু স্বাচ্ছন্দ্য এসে থাকে_ নজর দেবেন না। ও সেটা নিজের যোগ্যতায় অর্জন করেছে।
মমতাকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখার ফলে তার চরিত্রের কোন দিকটি আমায় আকৃষ্ট করেছে, এ কথা যদি কেউ জিজ্ঞাসা করেন, আমি বলব, সাহস। সাহস না বলে দুঃসাহসও বলা যায়। জানি অনেকে বলবেন, তার চরিত্রের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো মানুষের প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু সেই ভালোবাসায় সাড়া দিয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস থাকা চাই।
নিজের রাজ্যে, নিজের শহরে বারবার তাকে অপমান, লাঞ্ছনা, এমনকি শারীরিক নিগ্রহ সহ্য করতে হয়েছে। শাসকগোষ্ঠীর প্রতি গভীর তিক্ততা জমেছে তার মনে। আহত মমতাকে দেখতে গেছি কখনও নার্সিং হোমে, কখনও তার ক্ষুদ্র কুটিরের ক্ষুদ্রতর শয়নকক্ষে। তবে আখেরে এতে মমতার ক্ষতি হয়নি। ক্ষতি হয়েছে শাসক দলের। তাদের দেওয়া একেকটি আঘাত মমতাকে এগিয়ে দিয়েছে কয়েক কদম।
মমতার কি কোনো দুর্বলতা নেই, নেই কোনো দোষ-ত্রুটি! আছে বৈকি! মানুষমাত্রেরই যেমন থাকে। সবাই জানে, সে আবেগতাড়িত হয় সহজে। কখনও কখনও আবেগের বশে কাজ করে ফেলে, পরে তাকে অনুশোচনা করতে হয়। কিন্তু একজন ক্যালকুলেটিং রাজনীতিক হিসেবে, ভেবেচিন্তে পদক্ষেপ নেওয়া মানুষ হিসেবে মমতাকে ভাবাই যায় না। তাহলে মমতা আর মমতা থাকে না। আবেগতাড়িত মমতাই সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজে যোগ স্থাপন করতে পারে। আবেগ না থাকলে কোনো মহৎ কাজ করা যায় না। মমতার জনমনোহরণকারী শক্তির উৎস এই আবেগ।
মমতার ক্রোধ দেখেছি। হঠাৎ ত্রুক্রদ্ধ হয়ে কোনো অনুগতজনের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে তাকে বোঝানো মুশকিল।
পশ্চিমবঙ্গ তার ধ্যান-জ্ঞান। দিলি্লতে সাংসদ হয়ে যাওয়ার পর আমি অনেক দিন নিজস্ব থাকার জায়গা পাইনি। মমতা তার নিজের ঘরে সাদরে ডেকে নিয়েছে। গভীর রাত পর্যন্ত গান গেয়েছি দু'জনে, রবীন্দ্রনাথের গান। তারই ফাঁকে সে বলে চলেছে, বাংলাকে কমিউনিস্ট শাসনমুক্ত করতে হবে। রাজ্যের মানুষকে দিতে হবে শান্তি আর উন্নতি। আজ সেই মা-মাটি-মানুষের সেবা করার অধিকার সে অর্জন করেছে।

কৃষ্ণা বসু :ভারতীয় লোকসভার সদস্য
 

No comments

Powered by Blogger.