রেললাইন উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী-ঢাকা-টাঙ্গাইল কমিউটার ট্রেন চালু হবে

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার বিগত দিনে অনেক কৃষককে হত্যা করেছে। তাদের আমলে আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ঘরবাড়ি দখল ও লুটপাট করা হয়েছে। বহু নেতা-কর্মীকে অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকা মানে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস আর দুর্নীতি।


তারা ক্ষমতায় থাকলে মানুষের উন্নয়ন হবে না; দুর্নীতি করে তাদের নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন হবে। দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হবে।
গতকাল শনিবার সকালে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব পাশের রেল স্টেশনসংলগ্ন মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। এর আগে তিনি বঙ্গবন্ধু সেতু-তারাকান্দি রেললাইন উদ্বোধন করেন। এর ফলে নির্মাণ শুরুর ১৩ বছর পর জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত হলো বঙ্গবন্ধু সেতু-তারাকান্দি রেলপথ। বঙ্গবন্ধু সেতুর সঙ্গে স্থাপিত হলো বৃহত্তর জামালপুর ও ময়মনসিংহের রেল যোগাযোগ। জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকার সঙ্গে সহজে যোগাযোগের স্বার্থে কমিউটার ট্রেন চালু হচ্ছে। ভবিষ্যতে টাঙ্গাইলের সঙ্গেও কমিউটার ট্রেন চালু হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা মানে উন্নয়ন করা, জনগণের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া, ভাগ্য পরিবর্তন করা, মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আমরা ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে উন্নত, ক্ষুধামুক্ত দেশ হিসেবে গড়তে চাই। আমাদের লক্ষ্য বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া। আওয়ামী লীগ জনতার সংগঠন। আওয়ামী লীগ জনগণের কল্যাণে কাজ করে। আওয়ামী লীগ দেশকে আত্মনির্ভরশীল করতে চায়।'
টাঙ্গাইলবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, 'টাঙ্গাইলবাসী আগে রেললাইন দেখে নাই। বঙ্গবন্ধু সেতুতে রেললাইনের ব্যবস্থা ছিল না। রেললাইন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ লাইনসহ সেতু নির্মাণ করা দরকার। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সেতুর সঙ্গে এগুলো সংযোজন করে। এখন জনগণ তার সুবিধা ভোগ করতে পারছে। তখনই বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব রেলস্টেশন-তারাকান্দি রেললাইন করার কথা বলা হয় এবং আওয়ামী লীগ এ রেললাইন নির্মাণ করে।'
বিরোধী দলের নেতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, 'বিরোধী দলের নেতাকে ধন্যবাদ জানাই। তাঁর আমলে তিনি রেললাইনের কাজ করেন নাই। তিনি যদি করতেন তাহলে আমি আজকে উদ্বোধন করার সুযোগ পেতাম না। জনমুখী কাজ শুরু করলেই বন্ধ করে দেওয়া হয়- এটা বিএনপির চরিত্র।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, '১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে তা বন্ধ করে দেয়।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, সাধারণ মানুষকে ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা, বেকার যুবকদের বিনা জামানতে এক লাখ টাকা ঋণ প্রদান, ঘরে ঘরে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০২১ সাল নাগাদ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, 'আমরা ঘোষণা দিয়েছিলাম, বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করব। এখন রেলের টিকিট মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে কিনতে পাওয়া যায়। দেশের চার হাজার ৫৮২ ইউনিয়ন পরিষদে তথ্য সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। শিল্প-কারখানার জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তাঁত ও কুটির শিল্পের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।'
শেখ হাসিনা বলেন, 'আমরা উচ্চ শিক্ষার সুবিধার জন্য শিক্ষা-সহায়তা ফান্ড করাসহ বিভিন্ন ভাতা দিয়ে ১০ ভাগ দারিদ্র্য বিমোচন করতে সক্ষম হয়েছি। আগে কোনো সরকার এটা পারেনি। এ সরকার ব্যাপক উন্নয়ন করে যাচ্ছে।'
টাঙ্গাইলবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে টাঙ্গাইলে মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন, ঢাকা-টাঙ্গাইল কমিউটার ট্রেন চালু ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ককে চার লেনে উন্নীত করা হবে।
কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদারের সভাপতিত্বে জনসভায় বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়ার কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য দেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। সভায় বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক ও টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান খান ফারুকও বক্তব্য দেন।
জনসভায় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, যোগাযোগ ও রেলপথমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হিরা, কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি শওকত মোমেন শাজাহান, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন প্রমুখ।
জনসভা শেষে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব রেলওয়ে স্টেশন থেকে বিশেষ ট্রেনে করে সরিষাবাড়ী অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান তালুকদার রেলওয়ে স্টেশনের উদ্দেশে যাত্রা করেন। পথে ভূঞাপুর ও হেমনগর স্টেশনে নির্ধারিত পথসভায় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন তিনি।
ভূমিহীনদের বাড়ি করে দেওয়া হবে জামালপুর প্রতিনিধি জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'নদীভাঙন ও বন্যায় কেউ গৃহহারা হলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের পুনর্বাসনের সব রকমের ব্যবস্থা করা হবে। ভূমিহীন প্রত্যেককে আমরা ঘরবাড়ি তৈরি করে দেব। নদী ভাঙন ও বন্যা থেকে মানুষের সম্পদ রক্ষায় নদীর তীর সংরক্ষণের কাজ চলছে। নদী ড্রেজিং করে পার বাঁধানোর পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। আমরা চাই দেশের জনগণ উন্নত জীবনের অধিকারী হবে, আমরা সেই সুযোগ করে দিচ্ছি। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জাতির পিতার স্বপ্ন ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত দেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে জনগণের কোনো আকাঙ্ক্ষা যাতে অপূর্ণ না থাকে সেই ওয়াদা আমরা করছি।'
গতকাল শনিবার জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলা গণময়দানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এর আগে জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলার তারাকান্দি থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত রেল সংযোগ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব রেলস্টেশনে লিংক রেললাইন উদ্বোধনের পর সেখান থেকে রেলওয়ের বিশেষ ট্রেনে করে সরিষাবাড়ীর উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। দুপুর ২টা ২০ মিনিটে তিনি সরিষাবাড়ী পৌঁছান। তিনি প্রথমে জগন্নাথগঞ্জ ঘাট পুরাতন বাজারসংলগ্ন অ্যাডভোকেট মতিয়র রহমান তালুকদার রেলস্টেশনের নামফলক উন্মোচন করেন। পরে তিনি যমুনা সার কারখানার রেস্ট হাউসে মধ্যাহ্ন ভোজ সারেন এবং বিশ্রাম নেন।
সরিষাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল মালেকের সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ভূমিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা, তথ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদ, খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের ঢাকা বিভাগীয় সম্পাদক আহমদ হোসেন, হুইপ মির্জা আজম, সংসদ সদস্য ফরিদুল হক খান দুলাল, সংসদ সদস্য ডা. মুরাদ হাসান, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মুহাম্মদ বাকী বিল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহম্মদ চৌধুরী, সরিষাবাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছানোয়ার হোসেন বাদশা, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'যমুনা নদীর পূর্ব পারের বঙ্গবন্ধু সেতু স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ে সরিষাবাড়ী এসেছি। আজ যে নতুন রেললাইন চালু করলাম, তা নির্মাণ করার ওয়াদা করেছিলাম। আজ সেই রেললাইন চালু হলো। রেল চালু হওয়ায় এলাকার মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারসহ সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটবে।' তিনি জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, 'নৌকায় ভোট দিয়ে আমাদের জয়যুক্ত করেছিলেন বলে সরকার গঠনের পর থেকে জনগণের যাতে উন্নয়ন হয়, সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।'
শেখ হাসিনা বলেন, '২০০১ সালের নির্বাচনের পর সরিষাবাড়ীসহ সারা দেশে তাদের (বিএনপির) সন্ত্রাসের রাজত্ব ছিল। ১৯৮১ সালেও আমি দেশে ফিরে দেখেছি তাদের অত্যাচার ও নির্যাতন। বিএনপির সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য মানুষ রাতে ঘুমাতে পারত না। বিএনপি ক্ষমতায় এসে হত্যা-খুন ও লাশ উপহার দিতে পারে। তাদের আমলে যেভাবে অন্যায় ও নির্যাতন হয়েছে আমরা কারো বিরুদ্ধে তার প্রতিশোধ নেইনি।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'নৌকায় ভোট দিয়েছেন, আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র মামলায় জিতেছি। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আবারও নৌকায় ভোট দিয়ে আমাদের ক্ষমতায় থাকার সুযোগ দিলে ভারতের কাছ থেকেও আমাদের সমুদ্রসীমা উদ্ধার করতে পারব।' প্রধানমন্ত্রী যমুনা নদীর তীর সংরক্ষণকাজ দ্রুত বাস্তবায়ন, জামালপুরে ১০০ মেগাওয়াট রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, জামালপুর জেনারেল হাসপাতালকে মেডিক্যাল কলেজে উন্নীতকরণসহ এলাকার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। পরে তিনি সরিষাবাড়ী থেকে হেলিকপ্টারযোগে ঢাকায় ফিরে যান।

No comments

Powered by Blogger.