চরাচর-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস by আহমেদ রিয়াজ

আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। ১৯২১ সালের ১ জুলাই যাত্রা শুরু করে দেশের সবচেয়ে প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়। ২৮ জন কলা, ১৭ জন বিজ্ঞান, ১৫ জন আইন শিক্ষক এবং ১৮টি বিভাগ নিয়ে শুরু হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা। তখন ছাত্র ছিল ৮৭৭ জন। প্রত্যেক ছাত্রকে কোনো না কোনো হলে আবাসিক হিসেবে থাকতে হতো।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শুরু হয় তিন বছরের অনার্স, তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ছিল দুই বছরের।
তখনকার ব্রিটিশ শাসকদের অন্যায্য সিদ্ধান্তে পূর্ববঙ্গের মানুষের প্রতিবাদের ফল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এমনিতেই শিক্ষাদীক্ষা আর অর্থনীতিতে এ অঞ্চল ছিল পিছিয়ে। বঙ্গভঙ্গের পর অবস্থার উন্নতি হয়েছিল খানিকটা। বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার পর ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকসহ স্থানীয় মুসলিম নেতাদের দাবি ছিল ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। ১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিশ্রুতি দেন পূর্ববঙ্গ সফররত তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ। ১৯১৩ সালে নাথান কমিটির ইতিবাচক রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়ার পর ওই বছরের ডিসেম্বরেই সেটা অনুমোদন পায়। ১৯১৭ সালে গঠিত স্যাডলার কমিশনও ইতিবাচক প্রস্তাব দেয়। ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ ভারতীয় আইন সভায় পাস হয় 'দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট (অ্যাক্ট নম্বর-১৩) ১৯২০'। ওই বছরের ২৩ মার্চ গভর্নর জেনারেল বিলে সম্মতি দেন। এ আইনের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠা পায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
শুরু থেকেই আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। ঢাকার সবচেয়ে অভিজাত ও সৌন্দর্যময় রমনা এলাকার প্রায় ৬০০ একর জমির ওপর পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের পরিত্যক্ত ভবন এবং ঢাকা কলেজের (বর্তমান কার্জন হল) ভবনগুলোর সমন্বয়ে গড়ে তোলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার দিনটি প্রতিবছর পালন করা হয় 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস' হিসেবে। শুরুতে ছিল মাত্র তিনটি হল- ঢাকা হল (পরে শহীদুল্লাহ হল), জগন্নাথ হল ও মুসলিম হল (পরে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল)। আর শিক্ষক হিসেবে ছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, এফ সি টার্নার, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, জি এইচ ল্যাংলি, হরিদাস ভট্টাচার্য, ডাবি্লউ এ জেনকিনস, রমেশচন্দ্র মজুমদার, স্যার এ এফ রহমান, সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো খ্যাতনামা ব্যক্তিরা।
আমাদের ভাষা, কৃষ্টি আর সংস্কৃতি রক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে গৌরবময় ভূমিকা। ভাষা আন্দোলনের শুরুটাই হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে এ বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়। শহীদ হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ছাত্রছাত্রীসহ অনেকেই। এরপর ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল অগ্রগণ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ১৯৬১ সালে স্বৈরাচারী আইয়ুব খান অর্ডিন্যান্স জারি করে। ষাটের দশক থেকে ওই অর্ডিন্যান্স বাতিলের দাবি শিক্ষকদের। স্বাধীনতার পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ওই অর্ডিন্যান্স বাতিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডার ১৯৭৩ জারি করে। বর্তমানেও বিশ্ববিদ্যালয় ওই অর্ডার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ১০টি অনুষদ, ৫১টি বিভাগ, ৯টি ইনস্টিটিউট এবং ৩৩টি গবেষণা কেন্দ্র। আর ছাত্রছাত্রীদের থাকার জন্য রয়েছে ২০টি আবাসিক হল ও হোস্টেল।
আহমেদ রিয়াজ

No comments

Powered by Blogger.