৩ বছরে নতুন উচ্চতায় দ্রব্যমূল্য by রাজীব আহমেদ

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাবে ২০০৯ সালে একটি গামছা কিনতে মানুষের ব্যয় হতো ৯০ টাকা। ২০১১ সালে সেই গামছার দাম হয় ১৯০ টাকা। গামছার মতো বহু পণ্য প্রয়োজন হয় মানুষের সংসারে। সেগুলোর দামও বেড়েছে প্রায় একই রকম। ফলে চালসহ কয়েকটি পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকায় অর্থমন্ত্রী সন্তুষ্ট হলেও জনগণ স্বস্তিতে নেই।


চালে খরচ না বাড়লেও অন্যান্য পণ্যে খরচ বেড়েছে অনেক বেশি। গত তিন বছরে নতুন উচ্চতায় উঠেছে পণ্য ও সেবার দাম।
পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এ ব্যয় সামাল দিতে শ্রমের ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। যার প্রভাব আবার পড়েছে পণ্যের দামে।
পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে যাওয়া, বাসাভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া ও বিভিন্ন ইউটিলিটি সেবার বিল অনেক বেড়ে যাওয়ায় ব্যাপক চাপে পড়েছে মানুষ।
পাঁচ সদস্যের একটি নিম্ন আয়ের পরিবারে প্রতিদিন অন্তত আধা কেজি চাল, ২৫০ গ্রাম আটা, ১০০ গ্রাম ডাল, আধা কেজি আলু, আধা কেজি মাছ ও কিছু পরিমাণ ভোজ্য তেলের প্রয়োজন হয়। তিন বছর আগে এক দিনের জন্য এই পণ্যগুলো কিনতে মানুষকে ব্যয় করতে হতো ১৪০ টাকা। এখন একটি পরিবারকে ওই পণ্য কিনতে ব্যয় করতে হচ্ছে ১৬১ টাকা। মাসে শুধু ছয়টি অতি প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে মানুষকে বাড়তি ব্যয় করতে হচ্ছে ৬৩০ টাকা।
জিনিসপত্রের দাম বাড়ার হার বুঝতে সারা বিশ্বে প্রচলিত ভোক্তা মূল্যসূচক বা কনজ্যুমার প্রাইস ইনডেক্স (সিপিআই) ব্যবস্থাটি প্রচলিত। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বাংলাদেশে সিপিআই সূচক ছিল ২০৬ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট। সর্বশেষ হিসাবে, গত এপ্রিল মাসে এ সূচক উঠেছে ২৭০ দশমিক ৬৮ পয়েন্ট। এর মধ্যে খাদ্যের মূল্যসূচক ৭৫ পয়েন্ট বেড়ে ১৯৭ দশমিক ৩৬ পয়েন্ট হয়েছে। আর খাদ্যবহির্ভূত মূল্যসূচক ১৮৬ দশমিক ৬৭ পয়েন্ট থেকে ৪৯ পয়েন্ট বেড়ে ২৩৫ দশমিক ৭৭ পয়েন্ট হয়েছে। অর্থনীতিবিদ ড. এম আসাদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'জিনিসপত্রের দাম সব সময় বাড়ে। এর সঙ্গে বাড়ে মানুষের আয়। দীর্ঘমেয়াদে বিবেচনা করলে দেখা যায়, মানুষের জিনিসপত্রের দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি আয়ও বেড়েছে। তবে বছর বছর আয় ও ব্যয় বাড়ার মধ্যে হয়তো সামঞ্জস্য থাকে না।'
ড. আসাদুজ্জামানের কথার সূত্র ধরে ভোক্তা অধিকারকর্মী ও ভোক্তা বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক খলিলুর রহমান বলেন, 'এখন অসামঞ্জস্যতার সময়। এক বছর ধরে জ্বালানি, পরিবহণ ও ডলারের দামের কারণে পণ্যের দাম যে হারে বেড়েছে, সে হারে মানুষের আয় বাড়েনি। ফলে সীমিত আয়ের মানুষ অনেক কষ্টে আছে।'
খলিলুর রহমান বলেন, জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও শ্রমের মজুরি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি ডলারের দাম মূল্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। এতে ইউনিটপ্রতি পণ্যের দাম বেড়েছে। সেটা কৃষি পণ্য হোক বা শিল্প পণ্য হোক। যেটার দাম বাড়ে, সেটা দাম সাধারণত আর কমে না।
দাম নিয়ন্ত্রণে চূড়ান্ত ব্যর্থতা : এক দিনের একটি মুরগির বাচ্চার দাম ২০১০ সালের জুলাই মাসে সরকার নির্ধারণ করেছিল ৩০ ও ৩২ টাকা। মাত্র এক দিন সেই দামে বিক্রি হয়। পরে হাইকোর্টের একটি স্থগিতাদেশের সুযোগ নিয়ে পরের দিনই বাচ্চার দাম বাড়িয়ে দেন হ্যাচারি মালিকরা। এখন একটি এক দিনের বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে ৭৮-৮০ টাকা দরে। এ কারণে বাজারে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিপ্রতি ১৭০-১৮০ টাকায় উঠেছে। তিন বছর ধরেই মুরগির বাচ্চা নিয়ে 'মগের মুল্লুক' চলছে। সরকার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
পরিবেশক প্রথা চালু করে সরকার ভোজ্য তেলের দাম নির্ধারণে আইনি ক্ষমতা অর্জন করেছে। কিন্তু এক দিনের জন্যও ভোজ্য তেলের নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে পারেনি। পরিবেশক প্রথাও 'অকার্যকর'। অন্যদিকে কম্পানিগুলো চোখের সামনে যে কারসাজি করছে, তা দূর করার কোনো চেষ্টাও নেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের।
মার্চ মাস শেষে ট্যারিফ কমিশনের মনিটরিং সেলের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, পাঁচ লিটারের এক বোতল তেলের দাম লেবেলিং খরচসহ ৪৫ টাকা ধরা যায়। এ হিসাবে পাঁচ লিটারের এক বোতল তেলের দাম ৬৩৫ টাকা হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে নেওয়া হচ্ছে ৬৬০ টাকা। তবু সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। সম্প্রতি ভোজ্য তেল নিয়ে মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক হলেও এ নিয়ে কোনো কথা বলা হয়নি।
এ ছাড়া সরকারের বিভিন্ন সময় আটা, ময়দা, চিনি, লবণ, মসলা, পিঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম নিয়ে ব্যবসায়ীরা বিগত দিনের মতোই কারসাজি করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য ধমক, বৈঠক করা, প্রধানমন্ত্রীর ডেকে পাঠানো, গোয়েন্দা লাগিয়ে দেওয়ার মতো পুরনো পথেই হেঁটেছে সরকার।
কম্পানির পণ্যের দাম লাগামহীন : বর্তমানে বাজারে কৃষিপণ্যের দাম মোটামুটি স্থিতিশীল। খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে কম্পানির বাজারজাত করা পণ্য। যেসব পণ্যের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, সেগুলোর অবস্থা আরো খারাপ। কিন্তু এসব পণ্যের দামে সরকারের কোনো তদারকিও নেই, নিয়ন্ত্রণও নেই। এমনকি কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠকও করা হয় না সরকারের পক্ষ থেকে।
ক্যাবের বাজার তালিকা অনুযায়ী, ২০১০ সালে একটি হুইল সাবানের দাম ছিল ১৩ টাকা। সাবানটি এখন বিক্রি হচ্ছে ১৭ টাকা দরে। কম্পানিগুলোর গরুর তরল দুধের দাম ছিল লিটারপ্রতি ৫১ টাকা। এখন তা বাজারে বিক্রি হয় ৬০ টাকা দরে। এভাবে পেস্ট, টয়লেট ক্লিনার, বাতি, ম্যাচ, কম্পানির খাবার পণ্য, গুঁড়ো দুধ, নারকেল তেল, সরিষার তেল ইত্যাদির দামও বেড়েছে।
ক্যাব কর্মকর্তা উদয় চট্টোপাধ্যায় কালের কণ্ঠকে জানান, গত বছর একটি লাক্স সাবানের দাম ছিল ১৪ টাকা। সেটি যখন বাড়িয়ে ১৭ টাকা করা হয়, তখন ওজনও বাড়িয়ে ১০০ গ্রাম করা হয়। এখন আবার ৯০ গ্রাম হয়েছে। কিন্তু দাম বেড়ে হয়েছে ১৯ টাকা। এভাবে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের চানাচুরের প্যাকেটের দাম ছিল ১৫ টাকা। ওজন ছিল ২০০ গ্রাম। এখন দাম ২৫ টাকার বেশি করা হয়েছে। কিন্তু ওজন কমে হয়েছে ১৭০ গ্রাম।
নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বাড়েনি : কম্পানির পণ্যের দাম কত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন করার ক্ষমতা বাংলাদেশ সরকারের নেই। বাজারে প্রতিযোগিতার অভাবের সুযোগে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তাদের পণ্যের দাম অনেক বাড়িয়ে দেয়, তা নিয়েও কেউ কথা বলতে পারবে না। গত কয়েক মাসে বাজারে লবণের দাম কেজিতে ১৩ টাকা বেড়েছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি সক্ষমতা অর্জন করেনি সরকার।
পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন বাড়ানো, রাষ্ট্রীয়ভাবে পণ্য সরবরাহ বাড়ানো ও তদারকি ব্যবস্থা শক্ত করা প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়গুলো ছিল। কিন্তু বাস্তবে তেমন কিছুই হয়নি। নির্বাচনী ইশতেহারের দ্রব্যমূল্য অংশে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ভোক্তাদের স্বার্থে 'ভোগ্যপণ্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গড়ে তোলা হবে'।
ক্যাবের সাবেক কর্মকর্তা এমদাদ হোসেন বলেন, প্রতিযোগিতা আইনে মূল্য নিয়ন্ত্রণ কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এখনো আইনটি পাস হয়নি। আলোচনার জন্য সংসদীয় কমিটিতে আছে।
এ সরকারের আমলে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে গুণগত পরিবর্তন আনতে পারত পরিবেশক প্রথা। এক বছর পরীক্ষার পর প্রথাটি চালু করা হয় গত বছর ২১ জুলাই। কিন্তু এক বছর না যেতেই প্রথাটিকে অকার্যকর বলে জানান সরকারি কর্মকর্তারা। যাঁদের উচ্ছেদের জন্য পরিবেশক প্রথা চালু হয়েছিল, সেই ডিও (ডেলিভারি অর্ডার) ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পরিবেশকরা এখন পণ্য কিনছেন।

No comments

Powered by Blogger.