বিশেষজ্ঞদের অভিমত-নিজস্ব অর্থায়নেই বাজেট প্রণয়ন সম্ভব by ফারজানা লাবনী

নতুন বাজেট হবে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ৩৯ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ৭৪ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সক্ষমতা বাড়িয়ে, কর প্রদান সহজ করে, করের হার কমিয়ে এবং আওতা বাড়িয়ে স্থানীয় উৎস থেকে আয় দ্বিগুণ করা সম্ভব। তখন সরকার নিজস্ব অর্থায়নেই দেশের পূর্ণাঙ্গ বাজেট প্রণয়ন করতে পারবে।


এ অভিমত ব্যক্ত করেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, পেশাজীবীসহ রাজস্ব আদায়কারী সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তারা।
নতুন বাজেটের ৫০ হাজার ৩৮০ কোটি টাকার ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যাংকসহ অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে। বৈদেশিক সূত্র থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণের প্রত্যাশা থাকবে এ বাজেটে। আগামী অর্থবছরে এনবিআর থেকে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ ১২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। বর্তমানে কর জালের আওতায় আছে ৩২ লাখ মানুষ। এর মধ্যে বার্ষিক আয়কর বিবরণীতে রিটার্ন জমা দিয়েছে ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫২ জন। আয়কর জমা দেন এরও প্রায় অর্ধেক। ১৪ কোটি মানুষের দেশে এ হিসাব আরো বেশি হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী। তিনি বলেন, আগামী বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি আসছে রাজস্ব আয় থেকে। রাজস্ব আয় আরো বাড়িয়ে পুরো বাজেটের অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব।
সে জন্য আয়কর আদায় বাড়াতে হবে। এনবিআরের পর্যাপ্ত জনবলের অভাব এবং প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতায় আয়কর আদায় বাড়ছে না।
তবে রাজস্ব বোর্ডের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামোতেও দেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে দুই লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করে অনায়াসে বাজেট প্রণয়ন সম্ভব বলে বিশ্বাস করেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান। এ জন্য এনবিআরের কর্মকর্তাদের মানসিকতা এবং কাজের ধারা পরিবর্তনের পরামর্শ দেন তিনি।
এনবিআরের সাম্প্রতিক আয়কর বিবরণীতে বলা হয়েছে, ১৫টি কর অঞ্চলের করদাতাদের মধ্যে চার হাজার ৪৪৭ জন দুই কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক। অথচ সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) প্রতিবেদনে বর্তমান জাতীয় সংসদের ৩০০ জন এমপির ১২৮ জনই কোটিপতি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে কোটি টাকার ওপরে ব্যাংক হিসাব আছে প্রায় ৩০ হাজার ব্যক্তির।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ বলেন, সারা দেশে এনবিআরের প্রায় দেড় হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এত অল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে সারা দেশের রাজস্ব আদায় অসম্ভব। সম্পূর্ণ অটোমেশন পদ্ধতিতে কাজ করলে বাংলাদেশে রাজস্ব আদায় বহু গুণ বেড়ে যাবে। ফলে নিজস্ব অর্থায়নেই সম্পূর্ণ বাজেট প্রণয়ন করা যাবে।
বিগত তিন অর্থবছরের রাজস্ব আদায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট রাজস্ব আদায়ের এক-তৃতীয়াংশেরও কম আসে আয়কর থেকে। ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ পরোক্ষ কর আদায়েই এনবিআরের বেশি আগ্রহ।
২০০৯-১০ অর্থবছরে ৬১ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে আয়কর খাতের লক্ষ্যমাত্রা ১৬ হাজার ৫৬০ কোটি টাকায় অতিরিক্ত আদায় হয় ৫২৭ কোটি টাকা। ভ্যাট থেকে ২০ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকার বিপরীতে আদায় হয় ২১ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা।
২০১০-১১ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় ৬১ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। আয়কর খাতে লক্ষ্যমাত্রা ১৬ হাজার ৫৬০ কোটি টাকায় অতিরিক্ত আদায় হয় ৫২৭ কোটি টাকা। ভ্যাট আদায়ে ২০ হাজার ৭৩৫ কোটি টাকায় ২১ হাজার ৪৩৬ কোটি টাকা পাওয়া যায়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে আয়কর ১৯ হাজার ১৬০ কোটি টাকা এবং ভ্যাট ২৬ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেন, বিগত দিনের ধারাবাহিকতায় বাজেট দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করেই তৈরি করা হয়। অথচ রাজস্ব আয় থেকে এ দেশের বাজেট প্রণয়ন অসম্ভব নয়। এ বিষয়ে নজর না দিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারকরা ঋণদাতা সংস্থার ও ব্যাংক ঋণের পেছনে ছুটছেন। পর্যাপ্ত সরকারি তহবিল না থাকায় ঋণের আশায় আইএমএফের সঙ্গে সরকার দীর্ঘদেয়াদি চুক্তি করেছে। এতে সরকার নিজস্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা হারিয়েছে। ঋণদাতা সংস্থার সুপারিশে প্রত্যক্ষ কর আদায়ের পরিবর্তে পরোক্ষ করের বোঝা বাড়িয়ে চলেছে। এ দেশে ন্যূনতম চাকরিজীবী কর পরিশোধে বাধ্য হলেও ধনী মানুষের কাছ থেকে আয়কর আদায় করতে পারছে না দীর্ঘদিনেও। রাজস্ব আদায় আইন সহজ ও সহনশীল করার সুপারিশ করেন তিনি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজস্ব বাজেট রাজস্ব আদায় থেকে ব্যয় করা সম্ভব হবে। কিন্তু উন্নয়ন বাজেট অতীতের ধারাবাহিকতায় এবারো ঋণের ওপর নির্ভরশীল এবং ব্যয়ও হবে কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণে। এতে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিবে। চলতি বাজেটে বৈদেশিক সাহায্য ১৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও ১৫ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। এসব উদ্যোগ এ দেশের অর্থনীতির জন্য সুখবর নয়। তাই আয়কর আদায় বাড়িয়ে সরকারি নিজস্ব অর্থায়নের মাধ্যমে এ দেশে বাজেট প্রণয়নের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এ জন্য এনবিআরের অটোমেশনের সুপারিশ করেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি এ কে আজাদ বলেন, উপজেলা-জেলা পর্যায়ে অনেকেই করসীমার মধ্যে রয়েছেন। অথচ তাঁদের কাছ পর্যন্ত রাজস্ব কর্মকর্তারা পৌঁছাতে পারছেন না। আবার রাজস্ব কর্মকর্তাদের হয়রানি ও করভীতি বন্ধ করা না হলে কর পরিশোধে সাধারণ মানুষ বিমুখ হবে। এনবিআর সুষ্ঠুভাবে করের জাল বিস্তারে সক্ষম হলে এ দেশের বাজেট প্রণয়নে বিদেশি সাহায্যের প্রয়োজন নেই বলে বিশ্বাস করেন এ ব্যবসায়ী নেতাও।
একই মত পোষণ করে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, রাজস্ব কর্মকর্তাদের হয়রানি বন্ধ হলে এবং কর দিতে নানাভাবে প্রণোদনা ঘোষণা করলে আয়কর আদায় বহু গুণ বৃদ্ধি পাবে। আবার আইনকানুনের জটিলতায় এ দেশে রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক বলেন, এনবিআরের ২৮ হাজার রাজস্ব আদায়-সংক্রান্ত মামলা পরিচালনায় ২০০ আইনজীবীও নেই।
সরকারি অফিসের দায়সারা ঢিলেঢালা নিয়মের পরিবর্তে করপোরেট অফিসের আদলে রাজস্ব আদায়ের সুপারিশ করেন এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়কারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সরাসরি যোগাযোগের নিয়মটি বন্ধ করতে হবে। উন্নত অনেক দেশে রাজস্ব আদায়কারী কর্মকর্তাদের টেলিফোন দিয়ে অফিসে বসিয়ে রাখা হয়। তাঁদের প্রধান কাজ সাধারণ মানুষের যেকোনো রাজস্ব-সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব দেওয়া। আধুনিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে কম্পিউটারে রাজস্ব পরিশোধের ব্যবস্থা থাকে। রাজস্ব ফাঁকি দিলেই কেবল কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা হয়। এ জন্য মোটা অঙ্কের জরিমানা গুনতে হয়।
এনবিআরের সদস্য কাদের সরকার বলেন, লোকবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। এসব জনবলের জন্য সরকারি দপ্তর দিতে দেরি হওয়ায় কাজের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে অচিরেই এ সমস্যার সমাধান হবে বলে জানান তিনি।
এনবিআরের চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, এনবিআরকে আধুনিকায়ন করা এখন সময়ের দাবি। অটোমেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষভাবে অনলাইন পদ্ধতিতে কর দেওয়ার এই প্রক্রিয়ায় রাজস্ব আদায় বহু গুণ বাড়বে, যা দিয়ে ভবিষ্যতে বাজেট প্রণয়নও সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

No comments

Powered by Blogger.