প্লাবনের পঞ্চতন্ত্র by শেখ রোকন

বন্যা কতখানি দুর্যোগ আর কতখানি আশীর্বাদ তা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কেউ কেউ মনে করেন, উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা ছাড়া বন্যার মতো দুর্যোগ ঠেকানো কঠিন। আর প্লাবন 'ব্যবস্থাপনা' মানেই যে প্রথমত বিভিন্ন স্থাপনার বন্যা বইয়ে দেওয়া সেটা কে না জানে? বন্যায় জান ও মাল পরিবহন, ত্রাণ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে সড়ক-মহাসড়ক লাগে;


বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, নদীর তীর সংরক্ষণ, স্লুইসগেট, পোল্ডার প্রয়োজন হয়, প্রয়োজন হয় আশ্রয়কেন্দ্র, কেল্লা ইত্যাদি স্থাপনা। বলাবাহুল্য, আমাদের দেশের উন্নয়ন ধারণায় এই মতই প্রবল। আবার কেউ কেউ মনে করেন, 'বন্যার সঙ্গে বসবাস' ব-দ্বীপবাসীর কেবল নিয়তিই নয়, বরং প্রাকৃতিক এই প্রবাহ এখানকার ভূমির উর্বরতা, প্রতিবেশগত ভারসাম্য টিকিয়ে রাখে। বরং এতসব বাঁধ, সড়ক, স্থাপনাই বন্যাকে দুর্যোগ হিসেবে হাজির করে। প্রকৃতির পানি পৃথিবীর গা ধুইয়ে দিয়ে নিজের মতো করে প্রকৃতিতেই বিলীন হতো। এসব স্থাপনাই প্লাবনের পানিকে জলাবদ্ধতায় রূপ দেয়, বাড়িয়ে তোলে মানুষের দুর্ভোগ। বিচ্ছিন্নভাবে উৎসারিত এসব চিন্তা-ভাবনা সাম্প্রতিককালে আরও সংহত হচ্ছে। বন্যার পরিণতি নিয়ে বিতর্ক যা-ই থাক, এটা কোনো পক্ষ অস্বীকার করে না যে, বন্যা সবকিছু একাকার করে দেয়। কেবল প্রাকৃতিক ভেদরেখা নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভেদাভেদও ঝাপসা করে তোলে। বিল ও মাঠের পার্থক্য ঘুচিয়ে দেয়; কোনটা খাল আর কোনটা সড়ক বোঝা দায় হয়ে যায়; গ্রামগুলো পরিণত হয় একেকটি দ্বীপে। আবার বন্যার সময় গরিব-ধনী প্রায় সবাইকে জীবন বাঁচাতে ছুটতে হয়। মোড়ল বা মজুরের বাড়ি বেছে বেছে ডুবিয়ে দেয় না বন্যার দেবতা। দেখা যায়, হাভাতের মতো সম্পন্ন গৃহস্থেরও তখন ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সবাই হয়তো সমান ব্যাকুলতা প্রকাশ করে না। কিন্তু পরিস্থিতি তথৈবচ। এখন চিন্তা-ভাবনা চলছে বন্যাজনিত সংঘাত নিয়ে। বলা হচ্ছে, বন্যা যেভাবে জীবন ও প্রকৃতিকে একাকার করে দেয়, তার ভেতরেই রয়েছে সংঘাতের বীজ। সাময়িক বন্যার এই সংঘাত সমাজে দীর্ঘস্থায়ী সংকটের জননী হিসেবে দেখা দিতে পারে। তা কী রকম? বন্যা উপদ্রুত অঞ্চলে যারা থেকেছেন, বিশেষ এই পরিস্থিতির নগণ্য কিছু সংঘাতের কথা তারা জানেন। যেমন, বন্যায় যখন মাঠের পর মাঠ ডুবে যায়, তখন আধা-পাকা ধান পানির নিচ থেকে কেটে আনতে গিয়ে ক্ষেতের সীমানা সবসময় রক্ষা করা সম্ভব হয় না। পাশাপাশি বসে হুঁকো-বিড়ি ভাগ করে ফসল ফলানো দুই কৃষকের মধ্যে এ নিয়ে সংঘাত দেখা দিতে পারে। বাস্তুহারা গবাদিপশু, বিশেষ করে হাঁস-মুরগি বন্যার সময় তার মালিকের ত্রিসীমানা ভুলে গিয়ে অন্যের কাছে আশ্রয় নিতেই পারে। এগুলো অপ্রাকৃতিক কারণে নিখোঁজ হলে বিবাদ তো আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আটকে থাকে না! পানীয় জলের অভাবও একদা শান্তিপ্রিয় প্রতিবেশীর মধ্যে অসন্তোষের কারণ হতে পারে। তবে এসব বিরোধ বেশিদূর গড়ায় না। বন্যা নেমে যাওয়ার পর সময়ের প্রয়োজনেই মিটে যায়। বন্যাজনিত সংঘাতের নতুন অনুসন্ধিৎসুরাও এসব বিরোধকে পাত্তা দিচ্ছেন না। তারা চিন্তিত দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত নিয়ে। সেগুলোর উৎসও হচ্ছে নীতিনির্ধারকদের চাপিয়ে দেওয়া 'উন্নয়ন'। এর একটি হচ্ছে বহুল আলোচিত বাঁধ। অনেক সময় দেখা যায় মজবুত বাঁধের এক পাশ যদিও বন্যামুক্ত, অন্য পাশের বাসিন্দারা চরম বিপাকে। তখন তারা বাঁধ কাটতে যায়। এ নিয়ে উত্তেজনা, শত্রুতা, কখনও কখনও রক্তারক্তি, হামলা, মামলাসহ নানা সামাজিক বিড়ম্বনা। ত্রাণ কর্মসূচি নিয়েও বন্যার সময় যে দুর্নীতি, অন্যায্যতা, অধিকার বঞ্চনা, বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে, তাও কিন্তু সামাজিক সংঘাতই ঘনিয়ে তোলে।
বন্যাজনিত এমন আরও সংঘাত নিয়ে যখন সারা দুনিয়ায়, পাশের দেশ ভারতেও চিন্তা-ভাবনা চলছে; বন্যার দেশ বাংলাদেশে আমরা কি পুরনো বিতর্কেই আটকে থাকব? চিন্তা-ভাবনার এখনই সময়।
skrokon@gmail.com
 

No comments

Powered by Blogger.