সিপিডির প্রতিক্রিয়া-লুকোচুরির বাজেটে অনেক অসংগতি বাড়াবে বৈষম্য

প্রস্তাবিত বাজেটে ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছে। অসংখ্য পরিকল্পনার কথা উল্লেখ থাকলেও সেগুলো বাস্তবায়নের নীতি ও অর্থায়নে অসংগতি রয়েছে। ভর্তুকির বিষয়ে স্বচ্ছতা নেই। কোনো রক্ষাকবচ নেই। নির্বাচনী চমকও নেই। নির্বাচনে যে রূপকল্পের কথা বলেছিল সরকার, এবারের প্রস্তাবিত বাজেট দেখে মনে হচ্ছে তা ওই রূপকল্প পরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।


আগামী নির্বাচিত সরকারের ওপর দায়ভার চাপিয়ে এবারের বাজেটটি করা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এসব কথা বলেন। তিনি মনে করেন, এ দেশের উন্নয়নে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিচারে যে বাজেট দেওয়া প্রয়োজন ছিল, তা প্রণয়নে সক্ষমতা হারিয়েছে সরকার।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, কোনো দায়িত্বশীল সরকার নির্বাচনের আগের বছর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চুক্তি করে না; কিন্তু বর্তমান অর্থমন্ত্রী তা করেছেন। যেখানে ব্যাংকে অর্থ পড়ে আছে, সেখানে এক বিলিয়ন ডলারের জন্য চুক্তি করেছেন অর্থমন্ত্রী- যা বর্তমান সময়ের জন্য দুঃসংবাদ। এতে আর্থিক শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়েছে। তাই প্রস্তাবিত বাজেটে দেশ ও মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি।
সিপিডির ফেলো বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম বাড়ছে। অথচ প্রস্তাবিত বাজেটে আইএমএফের সুপারিশে কৃষিতে ভর্তুকি কম দেওয়া হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে। বর্তমান অর্থবছরে কৃষিঋণের গতিও শ্লথ। তাই আগামী বছর এ খাতের ঋণ সরবরাহ বাড়ানো না হলে মানুষ কষ্টে থাকবে। প্রস্তাবিত বাজেটে যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে ধনী-দরিদ্র ও গ্রাম-শহরের বৈষম্য আরো বাড়বে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে যে বরাদ্দ আছে, তা সঠিক নয়- উল্লেখ করে ড. দেবপ্রিয় বলেন, চলতি অর্থবছরের অসংখ্য প্রকল্প আগামী অর্থবছরে জের হিসেবে রয়েছে। আবার নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে যথেষ্ট পরিমাণে। ভুল পরিকল্পনায় এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন এ গবেষক।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, কুইক রেন্টাল নিয়ে সারা বছর সমালোচনা হয়েছে। এর পরও প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাত নিয়ে গোঁজামিল দেওয়া হয়েছে। এ পদক্ষেপ থেকে বের হয়ে প্রকৃতপক্ষে করা হবে- সে বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই প্রস্তাবিত বাজেটে। আবার জ্বালানি খাতের বিষয়ে কী করা হবে- তাও বলা নেই। জ্বালানি খাতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ যোগ হয়েছে বলে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে, প্রকৃতপক্ষে তা অনেক কম। কয়লা ও গ্যাসের বিষয়ে সুস্পষ্টতা অনুপস্থিত।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। সামগ্রিকভাবে ৭.২ শতাংশ জিডিপি অর্জন করতে হলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। কিন্তু ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ আনার জন্য যে পরিমাণ ঋণপ্রবাহ থাকতে হবে, তা বর্তমান মুদ্রানীতিতে সম্ভব নয়। ব্যক্তি খাতের সঙ্গে আর্থিক খাতের কোনো সমন্বয় নেই প্রস্তাবিত বাজেটে।
বিশিষ্ট এ অর্থনীতি বিশ্লেষক আরো বলেন, খাদ্য উৎপাদন ভালো হয়েছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত খাতের খরচ বেড়েছে। জ্বালানি, বাড়ি ভাড়া ও পরিবহন ব্যয় দিন দিন বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের কাছাকাছি। এসব বিষয়ে বাজেটে দিকনির্দেশনা নেই।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, বৈদেশিক সাহায্যকে কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব খাত থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আয়ের কথা বলা হয়েছে। বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা রয়েছে, যা ইতিবাচক। তবে মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক করকে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। ন্যূনতম আয়সীমা বাড়ানো উচিত ছিল- জানিয়ে দেবপ্রিয় বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষকে হয়রানি না করে যেসব খাতের মাধ্যমে ও যেসব ধনী ব্যক্তির কাছ থেকে কর আদায় করা উচিত, সেসব জায়গায় নজর দেওয়া দরকার ছিল। তিনি আরো বলেন, কোনো সরকারের আচরণ দেখে যেন মনে না হয় ক্ষমতাবান মানুষকে তারা কৌশলে বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
পদ্মা সেতুর বিষয়ে অর্থমন্ত্রী ফলপ্রসূ পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উল্লেখ করেননি বলেও মন্তব্য করেন ড. দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী একবারও বিশ্বব্যাংকের বিষয়ে ইতিবাচক শব্দ উচ্চারণ করেননি। আবার কোনো সাহায্যকারী সহযোগী সংস্থার বিষয়েও কার্যকরী কোনো কথা উল্লেখ করেননি। ১০৪ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। এই অতি স্বল্প টাকায় হয়তো খানিকটা জমি অধিগ্রহণ করা যাবে। কিছু অফিস-আদালত বা বাড়ি-গাড়ি কেনা হবে; কিন্তু প্রকৃত কাজ কিছুই হবে না।
সিপিডির এ বিশেষজ্ঞ স্পষ্ট ভাষায় বলেন, কালো টাকা সাদা করার পক্ষে নয় সিপিডি। কালো টাকা সাদা করতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কোনো অর্থনীতির জন্য শুভ সংবাদ নয়। আবার বেআইনি উৎস থেকে পাওয়া অর্থের বিষয়ে অবশ্যই কৈফিয়তের নিয়ম থাকা উচিত ছিল বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি অভিযোগ করেন, অর্থমন্ত্রী এ বিষয়টি নিয়ে লুকোচুরি করেছেন।
দেবপ্রিয় বলেন, ভোক্তার ওপর অনেক কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বাজেটে। মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে সরাসরি অর্থ আদায়, জমি ক্রয়ের ওপর উৎসে কর কর্তন- এসবই ছিল বর্তমান সময়ের জন্য অনুপযোগী।
মার্চেন্ট ব্যাংক-সম্পর্কিত পদক্ষেপের সমালোচনা করে দেবপ্রিয় বলেন, পুঁজি বাজারের স্বার্থে আরো কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। এ ছাড়া ন্যায়পাল নিয়োগ, বেতন কমিশন গঠনের বিষয়েও কোনো উল্লেখ নেই। আবার রাষ্ট্রীয়করণের বিষয়েও তেমন কোনো পদক্ষেপের কথা বলা হয়নি। তাঁর মতে, গোঁজামিলের বাজেটে রয়েছে অনেক কালো মেঘ।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান, গবেষক গোলাম মোয়াজ্জেম, রিসার্চ হেড ফাহমিদা হকসহ সিপিডির অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

No comments

Powered by Blogger.