ধর নির্ভয় গান-ওরে সাবধানী পথিক, বারেক পথ ভোল by আলী যাকের

আমার এখনকার তরুণদের প্রতি নিবেদন এই যে, এসো আমরা একটু সচেতন হই এবং বলিষ্ঠভাবে সত্যের পথে, আলোর দিকে পা বাড়াই এখুনি। না হলে এত মানুষের আত্মনিবেদনের বিনিময়ে সৃষ্ট এ দেশ হয়তো পাপে পাপে পঙ্কিল হয়ে পড়বে।


আমাদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে পড়বে। আর সেই আলো-হাওয়াহীন ভুবনে আমরা নিঃশ্বাসও নিতে পারব না। তবে আমি সম্পূর্ণ আশাহত নই। এই অবক্ষয়ী সমাজে এমন কতিপয় তরুণও আছে, যাদের সাক্ষাৎ আমি পেয়েছি, যাদের সংস্পর্শে এসে আমরা সবাই অনুপ্রাণিত হই। সেই তরুণ এবং তারুণ্যের জয় হোক


দু'রাত আগে ঢাকার একটি চ্যানেলে রবীন্দ্রনাথের ওপর আলোচনা হচ্ছিল। এই টক শোটি 'আলোয় ভুবন ভরা', আমি চালিয়ে যাচ্ছি বেশ কিছুদিন ধরে। রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আমি রবীন্দ্রনাথের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করি। সেখানে ওই আলোচনায় আমি প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করি আমাদের তরুণ প্রজন্মকে। আমি জানি, স্বয়ং প্রত্যক্ষ করেছি যে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকরা যখন বাঙালির চিন্তা-চেতনার বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়ে ওঠে তাদের শাসনামলের শেষ দিকে, তখন তারা ঠিকই ব্যাপক অনুসন্ধান করে আবিষ্কার করে যে, বাঙালির চিন্তা-চেতনা, মনন, সৃজনশীলতা, বস্তুতপক্ষে সারাজীবন আচ্ছন্ন করে আছেন রবীন্দ্রনাথ। অতএব, রবীন্দ্রনাথকে সরাতে হবে আমাদের কাছ থেকে। বাঙালিকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে বাঙালির জড় থেকে। বস্তুতপক্ষে, তখনই রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন বাঙালির প্রতিবাদের ভাষা এবং পরে বাঙালির যুদ্ধের হাতিয়ার। এহেন রবীন্দ্রনাথ কেবল যে আমাদের স্বাধিকারের সখা ছিলেন তা নয়। রবীন্দ্রনাথের গতি ছিল অবাধ এবং সর্বব্যাপী। জীবনের এমন কোনো দিক ছিল না, যে সম্বন্ধে তাঁর নিজস্ব অবদান আমাদের জীবনকে ঋদ্ধ করেনি। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস ছাড়িয়ে তাঁর এই ব্যাপ্তি স্পর্শ করেছিল আমাদের জীবনযাত্রার নানাবিধ দিককে। এর মধ্যে সংস্কৃতি বলতে বৃহত্তর অর্থে যা বোঝায় অর্থাৎ আমাদের ভাষা, সঙ্গীত, পোশাক, আবাসন, সামাজিক আচার এবং আরও বহুবিধ বিষয়, এসব কিছুতেই রবীন্দ্রনাথের স্পষ্ট এবং সরব উপস্থিতি আমরা টের পাই।
আমার টক শো 'আলোয় ভুবন ভরা'য় সাধারণত দু'জন অতিথি থাকে। একজন বিশেষজ্ঞ অতিথি, আরেকজন তরুণ অতিথি। আমার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি যে, আমার তরুণ অতিথিরা অনেক সময় বিশেষজ্ঞদের সমকক্ষ হয়ে যান। আমি আবিষ্কার করে আনন্দিত হই যে, তারা নানবিধ বিষয়ে কত আগ্রহের সঙ্গে লেখাপড়া ও আলোচনা করেন। এবারে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর নানাবিধ দিক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমি উদ্দেশ্য হিসেবে বিশেষ করে প্রাধান্য দিয়েছি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে তরুণদের জ্ঞান এবং অভিমতকে যাচাই করে একটি সেতুবন্ধের সৃষ্টি করাকে। সেতুবন্ধটি যে কেবল রবীন্দ্রনাথ ও তরুণ প্রজন্মের মানুষের মধ্যে হবে তা নয়, সেতুবন্ধটি আমাদেরও সাহায্য করবে আমাদের তরুণ মানসকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে জানতে। আমি পরপর রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, নাটক, স্থাপত্য ও পরিবেশ এবং গান নিয়ে এ পর্যন্ত আলাপ করেছি। এর পরে ইচ্ছা আছে তাঁর দর্শন, সমাজ, ধর্ম ও রাজনীতি ইত্যাকার বিষয়ে আলোচনাটিকে আরও প্রসারিত করার।
অতি সম্প্রতি তাঁর গানের ওপর যে আলোচনাটি ধারণ করা হলো তাতে আমার বিশেষজ্ঞ অতিথি ছিলেন এ দেশের বরেণ্য রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা এবং দ্বিতীয় অতিথি ছিলেন অভিক দেব নামে এক তরুণ রবীন্দ্রভক্ত। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এই টক শোটি করার সময় আমি জানতে পারি যে, অভিক শিক্ষায় একজন স্থপতি হয়েও স্থাপত্যের চাকরি ছেড়ে দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ওপর কাজ করার জন্য নিজেকে নিবেদন করেছে। এই বিষয়টি আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমি যবনিকা তোলার চেষ্টা করি এই প্রশ্ন দ্বারা যে, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীত আমাদের তরুণদের কি আদৌ প্রভাবিত করেছে? যদি করে থাকে, তাঁর কোন গানগুলো তরুণদের প্রিয় এবং কেন। এই সম্বন্ধে আমার বিশেষজ্ঞ অতিথি ও তরুণ অতিথি দু'জনই নতুন নতুন কথা আমাদের শোনান। বন্যা বলেন যে, রবীন্দ্রনাথকে যদি আমাদের তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হয় কিংবা আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমাদের তরুণদের যদি রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে আগ্রহী করে তুলতে হয় তাহলে প্রয়োজন হবে তাঁর সেসব গানগুলোকে আরও অধিক চর্চার মধ্যে নিয়ে আসা, যেগুলো তরুণরা সাধারণত পছন্দ করে থাকে এবং দ্বিতীয়ত, তিনি বললেন যে, রবীন্দ্রনাথের গানগুলোকে বেড়াজালে আটকে না রেখে, একটু স্বাধীনতা দিয়ে, তরুণরা যেমনভাবে শুনতে ভালোবাসেন, সেভাবে পরিবেশন করতে হবে। আমার তরুণ বন্ধু বললেন যে, রবীন্দ্রনাথের বাউলাঙ্গের এবং প্রগাঢ় প্রেমের গানগুলো তরুণরা বেশি পছন্দ করে। এর পেছনে যে কারণ সেটা আমি মনে করি, ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। আমাদের লালন সাঁই কোন তরুণের না পছন্দ? যার গান গেয়ে আনুশেহ্্ আনাদিল বাংলাদেশে হৈচৈ ফেলে দিয়েছেন। আর রবীন্দ্রনাথের প্রেম বা প্রেমানুভূতি তো মানুষকে এতই উদ্বেলিত করে যে, তা আমাদের তরুণদের হৃদয়ে লগ্ন হয়ে যাবে_ এটাই স্বাভাবিক। এরকম আলাপ-আলোচনা যখন চলছিল তখন আমি আমার তরুণ বন্ধুকে এবং রেজওয়ানা চৌধুরীকে তো বটেই, জিজ্ঞেস করলাম, এটা কি সত্য যে আজকের তরুণ অনেক বেশি হিসাবী? অনেক বেশি সাবধানী? এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের গান থেকে একটি উদ্ধৃতি দিলাম, 'ওরে সাবধানী পথিক, বারেক পথ ভোল; পথ ভোল; পথ ভুলে মর ফিরে।' আর কবি হেলাল হাফিজ তো লিখেছেনই, 'এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।' এরই সূত্র ধরে আমরা যদি একটু পেছন ফিরে তাকাই তাহলে দেখব যে, আমরা যখন তরুণ ছিলাম তখন দেশমাতৃকার চরম অবমাননায় আমরা স্বতঃস্টম্ফূর্তভাবে আমাদের জাগতিক সবকিছুকে পায়ে ঠেলে দিয়ে, ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অনিশ্চিত জেনেও অন্ধকারে ঝাঁপ দিয়েছি। আমরা সাবধানী হইনি, আমাদের যুদ্ধে যাওয়ার যে শ্রেষ্ঠ সময় ছিল সেটা আমাদের কারও বলে দিতে হয়নি। এটা সত্য যে, আজকে জীবন হয়ে উঠেছে অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক। এ রকম পরিস্থিতিতে হয়তো বেপরোয়া হওয়া একটু দুঃসাধ্য। কিন্তু এরই মাঝে আমরা তো দেখতে পাই যে, আমাদের প্রবীণ কিংবা নবীন প্রত্যেকেই অল্পবিস্তর আপাতরম্যে অবগাহন করতে ভালোবাসে। তারা কোন বিষয়ে তা সে নিজের জীবনেই হোক অথবা জাতীয় জীবনে, কোনো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে রুখে দাঁড়াতে অপারগ। মাঝে মধ্যে মনে হয় তারা বুঝিবা জড় পদার্থে পরিণত হয়েছে। এমন অনেক আপাত তুচ্ছ বিষয় আছে, যে সম্বন্ধে আমাদের সমাজের তরুণ এবং প্রবীণরা যদি ঘুরে দাঁড়ায়, তাহলে আমাদের সমাজকে অনেক বেশি সভ্য করে তোলা সম্ভব।
যে বিষয়গুলো তাৎক্ষণিকভাবে আমার মনে এলো সেগুলো কোনো গভীর, গম্ভীর বিষয় নয়। অতি সাধারণ বিষয়। আমাদের জীবনযাত্রায় প্রতিনিয়ত আমরা এমন সব সমস্যায় পড়ি, আইনের প্রতি অবজ্ঞা অথবা আইন না জানার জন্য যে একটি একটি করে জমতে জমতে তা এক বিশাল আকার ধারণ করে। আমাদের দেশের মানুষ জন্মগতভাবেই আইনের প্রতি বীতরাগ। আমি সাধারণ মানুষকে দুষব না। কেননা আমাদের যারা পথপ্রদর্শক, আমাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা, তারা নিজেরাই অহরহ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে উদ্যোগী হন। এটা খুবই আপাত ক্ষুদ্র বিষয়। যেমন ট্রাফিক আইন মানা থেকে শুরু করে প্রাত্যহিক ব্যবহার্য ইলেকট্রিসিটি, গ্যাস কিংবা পানির বিল পরিশোধ হয়ে জাতীয় অথবা স্থানীয় সরকার নির্বাচন পর্যন্ত বিষয়গুলো বিস্তৃত। আমরা ধরেই নিই যে, আমরা যখন ইচ্ছা তখন ট্রাফিকের নিষেধাজ্ঞা না মেনেও রাস্তা পারাপার করতে পারি। গ্যাস, ইলেকট্রিসিটি কিংবা পানির বিল আদৌ পরিশোধযোগ্য নয় এবং নির্বাচনে ভুয়া ভোট তো একটি সিদ্ধ ব্যাপার।
এই চরিত্রটিকে ঘুরে দাঁড় করাতে হলে কেবল আইন প্রয়োগকারী প্রশাসনের দ্বারা পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। এখানে প্রয়োজন গণসচেতনতার। একজন সচেতন তরুণ তার প্রবীণ পিতাকেও সঠিক আইনটি সম্বন্ধে অবহিত করতে পারে। পিতা যদি ভুল করে, কি ইচ্ছাকৃতভাবে আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে, সেই তরুণ তার প্রতিবাদ করতে পারে। এক্ষেত্রে পাপকলঙ্কিত রাস্তায় প্রথাসিদ্ধভাবে প্রদক্ষিণ করা, যা সে এতদিন দেখে এসেছে, তার জন্য অবৈধ হবে বলেই বিবেচনা করি আমি। এখানেই রবীন্দ্রনাথ তাকে পথ ভুলতে বলেছেন। তাকে পথ ভুলে নতুন পথ নির্মাণ করতে হবে। যেখানে বলিষ্ঠভাবে চলবে সে এবং তার উত্তরাধিকারীরা। আমরা যারা আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় পেরিয়ে এসেছি, যাদের যুদ্ধে যাওয়ার সাধ্য আর নেই অথচ যারা নিজেদের তরুণ বয়সে আপসহীন একটি যুদ্ধ করে দেশকে মুক্ত করেছি, তারা আজ বড্ড ক্লান্ত। এই দেশের সৃষ্টি তো হলো, কিন্তু এই দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে কে? রবীন্দ্রনাথের তাঁর কাজ করেছেন, তাঁর গানের মধ্য দিয়ে, তাঁর কবিতার মধ্য দিয়ে, তাঁর সৃজনশীল শিল্পকলার মধ্য দিয়ে। আমার এখনকার তরুণদের প্রতি নিবেদন এই যে, এসো আমরা একটু সচেতন হই এবং বলিষ্ঠভাবে সত্যের পথে, আলোর দিকে পা বাড়াই এখুনি। না হলে এত মানুষের আত্মনিবেদনের বিনিময়ে সৃষ্ট এ দেশ হয়তো পাপে পাপে পঙ্কিল হয়ে পড়বে। আমাদের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে পড়বে। আর সেই আলো-হাওয়াহীন ভুবনে আমরা নিঃশ্বাসও নিতে পারব না। তবে আমি সম্পূর্ণ আশাহত নই। এই অবক্ষয়ী সমাজে এমন কতিপয় তরুণও আছে, যাদের সাক্ষাৎ আমি পেয়েছি, যাদের সংস্পর্শে এসে আমরা সবাই অনুপ্রাণিত হই। সেই তরুণ এবং তারুণ্যের জয় হোক।

আলী যাকের : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
 

No comments

Powered by Blogger.