পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস-আবারও মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা! by প্রণব বল

প্রতিবছর বর্ষার আগেই চট্টগ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোর পাদদেশ থেকে বসতি সরিয়ে নেওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু হয়। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় বার বার এ সম্পর্কে তাগিদ দেওয়া হয়। নেওয়া হয় নানা সিদ্ধান্ত। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো সেসব সিদ্ধান্ত আলোর মুখ দেখছে না।


তাই থামে না প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসে মানুষের মৃত্যুর মিছিল।
গত বছর ১ জুলাই নগরের বাটালি হিলের প্রতিরোধ দেয়ালসহ ভূমি ধসে ১৭ জনের মৃত্যু হয়। এর আগে প্রতি বছর বর্ষায় নগর ও জেলার কোথাও না কোথাও পাহাড় ধসে নারী ও শিশুসহ পাঁচ থেকে ১০ জন লোকের মৃত্যু হয়েছে।
সবচেয়ে বড় দুর্যোগটি নেমে এসেছিল ২০০৭ সালের ১১ জুন। সেবার অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড় ও ভূমি ধসে চট্টগ্রামে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এই ঘটনার পর গঠন করা হয় শক্তিশালী পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি। কমিটির মূল লক্ষ্য ছিল পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ বসতি সরিয়ে নেওয়া। এ জন্য কিছু স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তও নেওয়া হয় তখন।
দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপনকারীদের স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা। এর অংশ হিসেবে জায়গাও নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত আলোর মুখ দেখেনি। স্বল্প মেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাসকারী লোকজনকে বর্ষার আগে অস্থায়ীভাবে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
কমিটি প্রথম দফায় ১২টি পাহাড় চিহ্নিত করে সেখানকার বসতি সরানোর উদ্যোগ নেয়। এ বছর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের তালিকায় যুক্ত হয় নতুন করে আরও দুটি পাহাড়। ব্যবস্থাপনা কমিটির হিসাবে এই ১৪টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে অন্তত ৮০০ পরিবার বসবাস করছে। ৯ মে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির নবম সভায় বর্ষার আগে পুনরায় এদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে এই উদ্যোগের সফলতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই বিষয়টি পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায়ও আলোচনা হয়।
কমিটির আহ্বায়ক বিভাগীয় কমিশনার মো. সিরাজুল হক খান বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘নিম্ন আয়ের এসব লোকজনকে সরিয়ে দিলেও তারা চলে আসে। এটা একটা কঠিন কাজ। তবু আমাদের সবার মনিটরিং এবং কর্মতৎপরতার কারণে বর্ষা মৌসুমে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা দুর্ঘটনা এড়ানো যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এটা যাতে আরও কমে আসে সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
জানা গেছে, সাময়িকভাবে সরিয়ে দিলেও সংশ্লিষ্ট বসতি স্থাপনকারীরা সহসা ফিরে যান ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায়। বাটালি হিলে গত বছরের ঘটনার পর এখন নতুন করে সেখানে বসতি গড়ে উঠেছে। একইভাবে লালখান বাজার মতিঝরনা, টাংকির পাহাড়, বিশ্ববিদ্যালয় পাহাড়, কুসুমবাগের পুলিশ লাইন পাহাড়ের পাদদেশে এখনো বসবাস করছে হাজার হাজার নিম্ন আয়ের লোকজন।
এ প্রসঙ্গে ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সচিব অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘মানুষ নিজেদের ঝুঁকিটা বুঝতে চায় না। আমরা সরিয়ে দেওয়ার পর তারা আবার এসে মৃত্যুর মুখে পড়ে। এখন আমরা কী করতে পারি। তবু আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
কমিটির চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়গুলোর বেশির ভাগের মালিক রেলওয়ে। রেলওয়ের পাহাড়গুলোর মধ্যে রয়েছে মতিঝরনা, বাটালি পাহাড় ও টাইগার পাহাড়। এ ছাড়া ওয়াসার টাংকির পাহাড়, গণপূর্ত বিভাগ, বন বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়ও রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায়।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামে পাহাড় ধসে ২০০৩ সালে ১০ জন, ২০০৪ সালে পাঁচজন, ২০০৫ সালে তিন জন, ২০০৬ সালে দুইজন মারা যায়।

No comments

Powered by Blogger.