পবিত্র কোরআনের আলো-তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জুকে মজবুত করে ধরো পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না

১০১। ওয়া কাইফা তাক্ফুরূনা ওয়া আন্তুম তুত্লা 'আলাইকুম আ-ইয়াতুল্লাহি ওয়াফীকুম রাসূলুহূ; ওয়া মাইঁ ইয়া'তাসিম বিল্লাহি ফাক্বাদ হুদিয়া ইলা সিরাতি্বম মুস্তাকীম। ১০২। ইয়া আইয়্যুহাল্লাযীনা আমানূত তাক্বূল্লাহা হাক্কান তুক্বাতিহী ওয়ালা তামূতুন্না ইল্লা ওয়া আন্তুম মুস্লিমূন।


১০৩। ওয়া'তাসিমূ বিহাব্লিল্লাহি জামী'আওঁ ওয়ালা তাফার্রাক্বূ; ওয়ায্কুরূ নি'মাতাল্লাহি 'আলাইকুম ইয কুন্তুম আ'দাআন ফাআল্লাফা বাইনা ক্বুলূবিকুম ফাআস্বাহ্তুম বিনি'মাতিহী ইখ্ওয়ানা; ওয়া কুন্তুম আলা শাফা হুফ্রাতিম মিনান্নারি ফাআন্ক্বাযাকুম মিনহা; কাযালিকা ইউবায়্যিনুল্লাহু লাকুম আইয়াতিহী লা'আল্লাকুম তাহ্তাদূন। [সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১০১-১০৩]
অনুবাদ : ১০১। আর তোমরা কিভাবে অবাধ্য হও, যখন তোমাদের সামনে আল্লাহর আয়াতগুলো তিলাওয়াত করা হচ্ছে? তা ছাড়া আল্লাহর রাসুল (সা.) তোমাদের মাঝে উপস্থিত রয়েছেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর সত্য ও ন্যায়কে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরে, সে অবশ্যই সরল পথে পরিচালিত হয়।
১০২। হে ইমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর প্রতি দায়িত্বনিষ্ঠ হও, ঠিক যতটুকু দায়িত্বনিষ্ঠ হওয়া উচিত। আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণকারী না হয়ে তোমরা কখনো মৃত্যুবরণ করো না।
১০৩। তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জুকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো এবং কখনো পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন তোমরা পরস্পরের দুশমন ছিলে। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তোমাদের সবার মনের মধ্যে ভালোবাসা সঞ্চার করে দিলেন ধর্মের বন্ধন দিয়ে। এরপর তোমরা শত্রুতা ভুলে আল্লাহর অনুগ্রহে একে অপরের 'ভাই' হয়ে গেলে। অথচ তোমরা ছিলে অগি্নকুণ্ডের প্রান্তসীমায়। অতঃপর সেখান থেকে আল্লাহ তোমাদের উদ্ধার করলেন। আল্লাহ এভাবেই তাঁর নিদর্শনগুলো তোমাদের কাছে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা সঠিক পথ পেতে পারো।
ব্যাখ্যা : এসব আয়াতে মুসলিম সমাজের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ দেওয়া হয়েছে এবং ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়ার মাধ্যমে আমরা কিভাবে সৌভাগ্যবান হয়েছি, তার মর্মবাণী বর্ণনা করা হয়েছে। ১০১ নম্বর আয়াতে বিস্ময় প্রকাশ করে বলা হয়েছে, মানুষ কিভাবে আল্লাহর আয়াতগুলো তিলাওয়াত করার পর এবং খোদ আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে সামনে উপস্থিত পাওয়ার পর অবাধ্য হতে পারে। আল্লাহর পথ, অর্থাৎ সত্য ও ন্যায়কে আঁকড়ে ধরার জন্য সবাইকে আহ্বান জানানো হয়েছে। তাহলেই সবাই শান্তি, সমৃদ্ধি ও ন্যায়ের সরল পথ লাভ করবে।
১০২ নম্বর আয়াতে ইমানদারদেরকে তাঁদের ইমানের প্রকৃত অঙ্গীকারের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, তাঁদের দায়িত্বনিষ্ঠ হতে হবে, যেমন দায়িত্বনিষ্ঠ হওয়া উচিত। মুসলমানদের প্রকৃত মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করাটা উচিত হবে না। প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যিনি জীবন-মরণ আল্লাহর হাতে সমর্পিত বলে সর্বদা বিশ্বাস করেন।
১০৩ নম্বর আয়াতে মুসলমানদেরকে তাঁদের জীবনের মূল সাফল্যগুলোর দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রথমত বলা হয়েছে আল্লাহর রজ্জুকে সম্মিলিতভাবে আঁকড়ে ধরার এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন না হওয়ার কথা। মহৎ ধর্মের মূল কথা এটাই; এবং মানবজাতির শান্তি, সংহতি ও সমৃদ্ধির মূল কথাও এটাই। মানুষকে মহৎ লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করাই ধর্মের উদ্দেশ্য; এবং মানুষের ঐক্যই শান্তি, সংহতি ও সমৃদ্ধির প্রধান উপায়। এ আয়াতের পরবর্তী অংশে এ মর্মকথাটিই আরো বিস্তারিতভাবে বর্ণনা ও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তৎকালীন মুসলমানদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁদেরকে দান করা নিয়ামতের কথা। যে নিয়ামতের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, তা হলো সেই 'ঐক্য'। যখন তাঁরা পরস্পরের দুশমন ছিলেন, একদল আরেক দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল, এ অবস্থায় ধর্মের বন্ধন তাঁদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা সঞ্চার করেছে। তাঁরা শত্রুতা ভুলে একে অপরের 'ভাই' হয়ে গেছেন। অথচ ইসলামের আগমনের আগে সেই সমাজ ছিল একটি অগি্নগর্ভ সমাজ। সেই সমাজের সর্বত্রই অশান্তির আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল। ইসলাম এসে সেই আগুন নিভিয়ে পৃথিবীতে শান্তির সুবাতাস বয়ে এনেছে। এভাবেই আল্লাহ মানুষকে তাঁর নিদর্শনগুলো স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন।

গ্রন্থনা : মাওলানা হোসেন আলী

No comments

Powered by Blogger.