সহজিয়া কড়চা-পয়লা বৈশাখে একটি মনোরম সন্ধ্যা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

যেকোনো দেশের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে প্রেরণা ও পুষ্টি পেয়ে থাকে। পূর্ববাংলার মানুষ যখন পাকিস্তানের অবাঙালি স্বৈরাচারী কেন্দ্রীয় শাসকদের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন করছিল, তখন সমৃদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতি ছিল তার অফুরন্ত প্রেরণার উৎস।


বহুমাত্রিক বাঙালি সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটেছে বাঙালির সামগ্রিক জীবনযাত্রায়। বিশেষ করে তার বিচিত্র সৃষ্টিশীল কর্মধারায়: সাহিত্যে, সংগীতে, চিত্রকলায়, পোশাক-পরিচ্ছদে, খাদ্যাভ্যাসে এবং অন্যান্য আচারে। বাংলার অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা জাতিসত্তার মানুষের সংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির গভীর মিল রয়েছে। তাদের নববর্ষ আর বাঙালির নববর্ষ প্রায় একই। তাই চিরকাল বাংলা নববর্ষে ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর নববর্ষের উৎসবে বাঙালির ও বাংলার জনগণের আত্মপরিচয় প্রকাশ পেয়ে আসছে।
বাঙালি যে ১৪১৭ বছর ধরে নববর্ষ উদ্যাপন করছে, তা অবশ্যই নয়। তার আগে থেকেই নিশ্চয়ই করছে। তবে হাজার দুই বছরের মধ্যে পূর্ববাংলার বাঙালি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ একবার—মাত্র একটিবারই বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করেনি। তা হলো ১৩৭৮ বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখ। ১৩৭৮-এর নববর্ষে বাংলার কোনো গ্রামের কোনো হাটখোলায় বা বটতলায় কোনো বৈশাখী মেলা বসেনি। সেবার কোনো দোকানি হালখাতা করেননি। সে বছর হয়নি কোথাও যাত্রাপালা বা কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
১৩৭৮-এর বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করা হয়নি সে-কথা আমি গত পয়লা বৈশাখে এক জায়গায় কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সামনে বলছিলাম। তাঁরা বিস্ময়ে আমাকে বললেন, ১৩৭৮-এর বাংলা নববর্ষ কেন পালন করা হয়নি বলুন তো? আমি বললাম, আপনাদের বয়স ৪০-এর কম হলে বলতাম, ৬৫-এর বেশি বলেই বলব না। তাঁরা ক্ষুণ্ন হলেন। তাঁদের কেউ সকালবেলা অসময়ে ঢাকা ক্লাবের একেবারে সামনেই মওলানা ভাসানী রোডে অনভ্যস্ত পান্তা-ইলিশ খাওয়ার পর বিকেল নাগাদ বদহজমজনিত অস্বস্তি বোধ করছিলেন। টক বা ছোঁয়া ঢেঁকুর উঠছিল, পেটে বায়ু জমছিল, পেট ও বুক জ্বালা করছিল। পয়লা বৈশাখ পালনের খেসারত।
আমি নিজে বহু বছর নিউজ এডিটর ছিলাম, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ জীবনের সব ক্ষেত্রেই কিছু না কিছু অবদান রাখলেও কোনো দৈনিকের নিউজ এডিটর ছিলেন না কখনো। কিন্তু কয়েক বছর যাবৎ আমাদের কাগজগুলোর নববর্ষসংক্রান্ত রিপোর্টের শিরোনামটি তিনিই দিচ্ছেন। এবং রবীন্দ্রনাথ যখন ‘এসো হে’ বলে ডাক দেন, তখন বৈশাখের বাবারও সাধ্যি নেই না এসে। আমাদের কাগজগুলো চৈত্র মাসের অর্ধেক পার না হতেই ‘এসো হে’, ‘এসো হে’ করতে থাকায় বৈশাখের আর না এসে উপায় থাকে না। তবে রবির ওপরে রবগারি হচ্ছে। এবার দেখলাম, কোনো কোনো কাগজ শিরোনাম দিয়েছে; ‘এলো রে বৈশাখ’। কথাটার মানে আমি বুঝতে পারিনি। তবে এটুকু বুঝতে পেরেছি যে বাঙালির সৃষ্টিশীলতা আজ শূন্যের কোঠার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এখন রবীন্দ্রনাথ আর নজরুল ইসলামের কবিতার পঙিক্ত নিংড়ে রস বের করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।
খুব বেশি সৃজনশীলতা না থাকলে একটি জাতি মরে না; কিন্তু বিচার-বিবেচনা ও কাণ্ডজ্ঞান না থাকলে একটি জাতির ধ্বংস অনিবার্য। আমাদের স্বদেশ কখনো উদ্ভট উটের পিঠে লাফ দিয়ে উঠে বসে, কখনো গিয়ে গাধার পিঠে সওয়ার হয়, কখনো একটি খচ্চর পেলেও তার পিঠে বসার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে চায় না। বাহন হিসেবে হাতি বা ঘোড়ার চেয়ে বাঙালি আজ উট, গাধা ও খচ্চরকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।
সত্তরের দশক পর্যন্ত বাংলা নববর্ষ স্বাভাবিকভাবে উদ্যাপন করা হতো। আশির দশক থেকে যোগ হয় তাতে নতুন মাত্রা। আমার শৈশবে দেখা নববর্ষ উদ্যাপনের সঙ্গে হালের নববর্ষ উদ্যাপনের কোনো মিলই নেই। সত্তরের দশকে আমি ফ্রিজ কিনি। তার আগে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ হিসেবে পান্তাভাত ঢের খেয়েছি। কিন্তু পয়লা বৈশাখের সকালে গরিবি পান্তাভাত খাওয়ার প্রশ্নই আসে না। নববর্ষের সকালে বাড়িতে একটু ভালো নাশতা হতো। লুচি বা পরোটা, মাংসের তরকারি, খেজুর গুড়ের ক্ষীর, দোকানের মিষ্টি, দই, মোহনভোগ, মৌসুমি ফলমূল প্রভৃতি। বড়লোকেরা আরও ভালো খেতে পারতেন, কিন্তু নববর্ষ বড়লোকদের ব্যাপার নয়, তাদের প্রতিদিনই নববর্ষ।
বাঙালি মুসলমান চিরকালই বিভ্রান্ত। তার মস্তিষ্ক বিশৃঙ্খল, গোলমেলে। সে প্রতিক্রিয়াশীলতা ও প্রগতিশীলতার পার্থক্য বোঝে না। বছরখানেকের মধ্যেই কীভাবে সেক্যুলার প্রগতিশীল হওয়া যায় একশ্রেণীর বাঙালি মুসলমান সেই তালে থাকে। বাংলা নববর্ষ কোনো হিন্দুত্বের ব্যাপার নয়, কোনো মুসলমানত্ব নয়, কোনো বৌদ্ধত্ব নয়, খ্রিষ্টানত্ব তো নয়ই। বাংলা নববর্ষ বাঙালিত্বের ব্যাপার। বাঙালি জাতির সবচেয়ে নির্মল ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব।
অনাদিকাল থেকে মানুষ উৎসব করে যৌথ আনন্দ প্রকাশের জন্য। স্বতঃস্ফূর্ত ও অকৃত্রিম আনন্দ আর সুপরিকল্পিত উন্মত্ততা এক জিনিস নয়। নববর্ষের মেলায় গ্রামে গ্রামে মানুষের অংশগ্রহণ চিরকালই ছিল সর্বোচ্চ। ছোটবেলায় দেখেছি, মেলায় গিয়ে দূষিত খাদ্য ও পানি খেয়ে কলেরায় মারা গেছে অনেকে। কিন্তু আট মাস কোল্ড স্টোরেজে রাখা মিসরীয় মমির মতো ইলিশ-পান্তা খেয়ে এখনকার মতো বিপদ ডেকে আনত না কেউ।
বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন বাঙালির শুধু সাংস্কৃতিক ব্যাপার নয়, অর্থনৈতিক ব্যাপারও বটে। নববর্ষে হালখাতার অনুষ্ঠানটি ছিল বাংলার শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতির একটি বাণিজ্যিক উপাদান। বাংলার কৃষক আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে শস্য উৎপাদন ও বাজারজাত করতেন। চৈত্রসংক্রান্তিতে হিসাব মেলাতেন গত বছরের এবং পয়লা বৈশাখে পরিকল্পনা করতেন অনাগত বছরের।
হালখাতা উপলক্ষে বাজারের দোকানদারেরা আমাদের চিঠি দিতেন। আমরা সেজেগুজে যেতাম পয়লা বৈশাখে। যেতাম, কিন্তু খালি হাতে নয়। প্রতিটি দোকানের জন্য দু-চারটি টাকা নিয়ে যেতাম। নাম লিখে দোকানি টাকাটা জমা করে নিতেন। পরে যেকোনো সময় ওই টাকার বিনিময়ে পণ্য কিনতাম। প্রতিটি দোকানে মিষ্টিমুখ করানো হতো। ডায়াবেটিসের রোগীর জন্য হালখাতা ছিল বিপজ্জনক। আমার মতো রোগা-পটকাকেও এক-দেড় কেজি মিষ্টি খেতে হতো।
বাংলা নববর্ষ একটি বাণিজ্যিক ব্যাপার ছিল তা আগেও জানতাম, তবে এবার নতুন করে বুঝতে পারি। সেকালে কামার, কুমার, তাঁতি, কুটিরশিল্পী প্রমুখ বৈশাখী মেলার জন্য অনেক দিন আগে থেকে তাঁদের পণ্য তৈরি করতেন। দুটো পয়সা আসত গ্রামের মানুষের হাতে নববর্ষে। এবার নববর্ষে বাণিজ্য হয়ে গেল নীলক্ষেত এলাকায়। বহু লাখ টাকার বাণিজ্য। কে বলবে ওটা জ্ঞানচর্চার জন্য দেশের সর্বোচ্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস। বাঙালি নববর্ষে যাত্রা-নাচ-গান-সার্কাস দেখেছে। এবার বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হলো ডিজিটাল আনন্দ-ফুর্তি। অবশ্য কনসার্টে কোনো কোনো শিল্পীর পরিবেশিত সংগীত অসামান্য।
শুভ নববর্ষে শিক্ষকের গায়ে হাত তুলেছে তাঁর ছাত্ররা। মেয়েদের শাড়ি নিয়ে হয়েছে টানাটানি। দেখেছে পুলিশ, করেনি কিছুই। অভিযোগ নাকি করা হয়নি। হাজার হাজার মানুষের সামনে রাজু ভাস্কর্যের অদূরে হামলা হয়েছে মেয়েদের ওপর। ভাস্কর্যগুলোর যদি চেতনা থাকত, তাহলে ওই দৃশ্য দেখে তারা অচেতন হয়ে যেত।
সরকারের লোকেরা এখন কিরো-র চেয়ে বড় ভবিষ্যৎবক্তা। তাঁরা বলছিলেন, সাবধান, এবার পয়লা বৈশাখে জঙ্গি হামলা হবে। সারা শহরে পুলিশ গিজগিজ করছিল। মেয়েদের ওপর যে হামলা হয়েছে তা জঙ্গি হামলার চেয়ে কম কি? আমি যদি জঙ্গিদের বাড়ি চিনতাম, তাহলে গিয়ে বলতাম: আপনাদের কাছে যে বোমা আছে তা থেকে একটি আনুন। আমার মাথায় ফেলুন। তবে এই প্রাণহীন বর্বর সমাজে যে দুটি যুবক মেয়ে দুটিকে শার্ট খুলে দিয়েছে, নিশ্চয়ই তারা আমার ছেলের বয়সী। ওদের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে বলতাম: বাবা, তোমরা চৌদ্দ কোটি মানুষের ইজ্জত বাঁচিয়েছ।
আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ নিয়েই আমাদের সংসার। এবারই প্রথম বঙ্গভবনে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপিত হলো। ধানমন্ডি থেকে বঙ্গভবনে পৌঁছাতে সময় লেগেছে পৌনে দুই ঘণ্টা। শুধু ফুটপাতে নয়, রাস্তার মধ্যে অগণিত মানুষ হাঁটছে। এত মানুষ জীবনে কখনো দেখিনি।
বঙ্গভবনে ঢুকে দিনের ক্লান্তি মুছে গেল। ঢোকার সময়ই রাষ্ট্রপতির অফিসের মহিলা কর্মকর্তারা বেলি ফুলের মালা দিয়ে অভ্যর্থনা করলেন। আমার স্ত্রীও একটি পেলেন। আমি বললাম, পুরুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করায় আজ আমি বঞ্চিত হলাম বেলি ফুলের মালা থেকে।
দরবার হলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অতিথিদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কুশল বিনিময় করলেন। সংস্কৃতি জগতের মানুষ ছাড়াও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীও নববর্ষের অনুষ্ঠানে ছিলেন। অল্প অতিথির ছিমছাম অনুষ্ঠান, বিদেশি কেউ ছিলেন না।
সংক্ষিপ্ত সংগীত, আবৃত্তি ও নৃত্যের অনুষ্ঠান। রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা মাত্র একটি গান গাইলেন, তাতে অতৃপ্তি রয়ে গেল। কিন্তু তা পুষিয়ে দিল আপ্যায়নের অঢেল আয়োজন। চিতই পিঠা, লুচি, সম্ভবত খাসির মাংসের কালিয়া বা রেজালা, সবজির তরকারি, আলুর দম, সন্দেশ, জিলাপি, পাটিসাপটা পিঠা, দই, বিন্নি ধানের খই, নানা রকম ফলমূল, চা-কফি, শীতল পানীয় প্রভৃতি। খাওয়াদাওয়ার সময়টিতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আন্তরিকতার সঙ্গে অতিথিদের সঙ্গে সহাস্যে কথাবার্তা বলেন।
বয়সের কারণে রাষ্ট্রপতির পক্ষে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না। তিনি একটি চেয়ারে বসে রইলেন। আমি ও আমার স্ত্রী তাঁর কাছে এগিয়ে গেলে তিনি উঠে দাঁড়িয়ে আমার হাত ধরলেন। আমি অভিভূত হলাম। আগে থেকেই তিনি আমাদের মুরব্বি, এখন রাষ্ট্রপ্রধান। তাঁর উঠে না দাঁড়ালেও হতো। কিন্তু তাঁর অসামান্য সৌজন্যবোধ।
অনেকটা সময় তাঁর সঙ্গে কথা হলো। আজ তিনি রাষ্ট্রপতি, কিন্তু আমরা যাঁরা অধ্যক্ষ জালাল উদ্দিন আহমদের ছাত্র, তাঁদের তিনি ভগ্নিপতির মতো। আইভি আপা ছিলেন আমাদের বোনের মতো। তাঁর ছোট ভাই ছিল আমার সহপাঠী। আইভি আপাকে নিয়েও কথা হলো। দেশদ্রোহী চক্রের গ্রেনেড হামলায় বীভৎসভাবে আহত হলে পরদিনই আমি আমার এই কলামে আবেগী একটি লেখা লিখেছিলাম। পত্নীশোকে কাতর ও বার্ধক্যজনিত দুর্বল শরীর নিয়েও পৌষ-পরবর্তী তিনোদ্দীনের সরকারের সময় তিনি শেখ হাসিনার সপক্ষে বলিষ্ঠভাবে কাজ করেন।
রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান রাজনীতিতে নবাগত নন, শৌখিন রাজনীতিক নন, আল-টপকানো নন। ছাত্রজীবনে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। তার পর থেকে প্রতিটি জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা প্রশংসনীয়। দেশের সমস্যা নিয়েও কথাবার্তা হলো। রাষ্ট্রপতি সরলভাবে বললেন, ‘এই বয়সে কতটুকু কী করতে পারি। আমার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যেন আমাকে দেশের ভালো করার তৌফিক দেন।’ বললাম, আপনি তো এখন কোনো দলের নন, সারা দেশের। আপনার জন্য দোয়া করা সব মানুষের কর্তব্য। তিনিও আমাকে আশীর্বাদ করলেন। আইভি আপাকে ছাড়া বঙ্গভবনে সেদিন অপরাহ্নে রাষ্ট্রপতিকে শুধু নিঃসঙ্গ নন, অসম্পূর্ণ মনে হলো।
লনেও কিছু চেয়ার ছিল। সেখানে বসে নারীদের কেউ কেউ চা-কফি খাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে বারান্দা থেকে নেমে শেখ হাসিনা তাঁদের সঙ্গে গিয়ে যোগ দিলেন। আন্তরিকভাবে তাঁদের সঙ্গে তিনি মেশেন।
একটু দূরে উপদেষ্টা তৌফিক ইমাম, বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান ও ভাবি এবং খাদ্যমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে কথা বলছিলাম। প্রধানমন্ত্রী আমাদের কাছে এসে দাঁড়ালেন। তাঁকে আবদুর রাজ্জাক বললেন, মুকসুদ সাহেব, শক্ত শক্ত লেখা লেখেন। শেখ হাসিনা হেসে মাথা নাড়লেন। আমি সবিনয়ে বললাম, সরকারের অমঙ্গল চাই না। সমালোচনা করি সরকারের ভালোর জন্য। আমরা যাঁরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কাজ করেছি, তাঁরা আপনার সাফল্যই দেখতে চাই।
এ সমাজে কেউ কারও প্রশংসা করে না। পাছে লোকটা লাভবান হয়। আবদুর রাজ্জাক প্রধানমন্ত্রীকে আমার সম্পর্কে বললেন, গত কয়েক বছর সুশাসন ও গণতন্ত্রের জন্য আমরা একসঙ্গে অনেক মিটিং, গোলটেবিল আলোচনা করেছি। দুই নেত্রীর মুক্তির ব্যাপারে, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য, রাজনীতিকদের হাতেই রাজনীতি থাকবে—এসব ব্যাপারে উনি সব সময় বলেছেন। শেখ হাসিনা শুনলেন। আমি মুগ্ধ হলাম।
কিছুক্ষণ বিভিন্ন বিষয়ে অন্তরঙ্গ পরিবেশে কথা হলো। প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘যদি বেঁচে থাকি দেশের জন্য কিছু করব।’ আমি বললাম, ‘জন্ম-মৃত্যু আল্লাহর হাতে। কেন বেঁচে থাকবেন না? দেশের সেবার জন্যই বেঁচে থাকতে হবে। বেঁচে থাকবেন।’
অতি ছোট কয়েকটি সান্ধ্য-পাখি আমাদের মাথার ওপর দিয়ে ওড়াউড়ি করছিল। কাক ও অন্যান্য পাখি বঙ্গভবনের উত্তর দিকের পাঁচিলঘেঁষা গাছগাছালিতে আশ্রয়ের জন্য জড়ো হচ্ছিল। মাগরিবের আজানের সময় হয়ে এল। শেখ হাসিনা আমাদের থেকে বিদায় নিলেন।
দেশে পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীরা স্বার্থ ছাড়া কিছুই বোঝেন না, অধিকাংশ মধ্যবিত্ত চরম সুবিধাবাদী, স্বার্থপর ও ফাঁকিবাজ। খুব কম লোক ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করেন। সেই জনগোষ্ঠীকে নেতৃত্বে দেওয়া কঠিন কাজ। সদিচ্ছা থাকলেও প্রধানমন্ত্রী একা অনেক কিছু করতে পারেন না।
আমি নগণ্য মানুষ। আমার কথা কে শোনে? তবু শুভ নববর্ষে সেদিন নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সবাইকে সবিনয়ে যে কথাগুলো বলেছি তা হলো: হুট করে কোনো ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন না। খুব ভেবে কাজ করুন। বিদেশিদের বুদ্ধি না নিয়ে দেশের মানুষের অনুভূতি জেনে নিজেদের বিবেকমতো কাজ করুন। মানুষ আপনাদের পেছনে থাকবে। তেল-গ্যাস ইজারা নিয়ে খুব সাবধানে এগোবেন। উর্বর ফসলের মাঠ ধ্বংস করে, মানুষের শত শত বছরের বসতভিটা ধ্বংস করে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা তোলার সিদ্ধান্ত নেবেন না। আর যে কথাটি বলেছি তা হলো—দলের দুজন আইনজীবীকে বিচারক পদে নিয়োগ না দিলে কী এমন ক্ষতি?
আমি যখন বঙ্গভবন থেকে বের হই, আকাশে তখন অনেক নক্ষত্র। মোটামুটি আকাশ নীলাভ ও পরিষ্কার। তবে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে দু-এক টুকরো কালো মেঘ। বৈশাখী ঝড়ের আলামত।
সৈয়দ আবুল মুকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

No comments

Powered by Blogger.