সদরে অন্দরে-'ওস্তাদের কদর' মুখে নয় কাজেও দেখতে চাই by মোস্তফা হোসেইন

বছর কয়েক আগের কথা। একটি পত্রিকা অফিসে সম্পাদকের কক্ষের দরজায় অপেক্ষমাণ বাংলাদেশের বিখ্যাত এক লেখক। অনুমতি চাইলেন ভেতরে প্রবেশ করার। ধরন দেখে মনে হলো, কোনো শিক্ষার্থী যেন শিক্ষকের কক্ষে প্রবেশের অনুমতি চাইছেন।


বাংলা একাডেমী পুরস্কারসহ বেশ কিছু পুরস্কার অর্জনকারী সেই লেখক কক্ষে ঢুকেই সম্পাদককে কদমবুছি করলেন। কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়ালেন সম্পাদকের সামনে। সম্পাদক লেখকের ব্যক্তিগত কিছু বিষয় জানতে চাইলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি সেই অভ্যাসটা এখনো ধরে রেখেছ? লেখক কাঁচুমাচু করতে থাকলেন। এত বড় লেখক তিনি, কেমন বাচ্চার মতো হয়ে গেছেন সম্পাদকের সামনে।
খুব জানার ইচ্ছা হলো লেখক আর সম্পাদকের সম্পর্কের বিষয়টি। লেখক জানালেন, 'সম্পাদক সাহেব সরাসরি আমার শিক্ষক। তিনি জগন্নাথ কলেজের শিক্ষক ছিলেন, আমি সেই কলেজে লেখাপড়া করেছি।'
অতি সাম্প্রতিক আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করা যাক। এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রের ঘটনা। পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে কেন্দ্রে গেছেন একটি কলেজের অধ্যক্ষ। পরীক্ষা শেষ হতেই দেখা গেল, কলেজের অফিসকক্ষের সামনে ওই কলেজের ছেলেমেয়েরা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে শিক্ষার্থীরা কক্ষে ঢুকছে, আবার বেরিয়ে আসছে। ওরা ঢুকছে অধ্যক্ষকে কদমবুছি করে দোয়া নেওয়ার জন্য। প্রত্যেকেরই তৃপ্তিমাখা মুখ।
সামাজিক অবক্ষয়ের এই যুগে দুটি ঘটনা আপ্লুত আমাদের করতে পারে। শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীর শ্রদ্ধাবোধ দেখে মনে হতে পারে 'আবার তোরা মানুষ হ' চলচ্চিত্রের কথা। মনে হতে পারে, কাজী কাদের নেওয়াজের লেখা বাদশাহ আলমগীরের ছেলের ওস্তাদের প্রতি আচরণের দৃশ্য। আমরা অনেকেই পড়েছি সেই কবিতা। বাদশাহ আলমগীর দেখছিলেন, তাঁর ছেলে ওস্তাদকে পানির পাত্র থেকে পানি ঢেলে দিচ্ছে। বাদশাহ খুব রেগে গেলেন এতে। ওস্তাদ মৌলভি সাহেব মনে করলেন, বাদশাহজাদাকে দিয়ে পানি ঢালানোটা না জানি কত বড় অন্যায় হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা কবিতায় বিবৃত হতে দেখলাম অন্যভাবে। বাদশাহ আলমগীর রেগে গেছেন নিজ ছেলের প্রতি। তাঁর কথা, ওস্তাদের পায়ে হাত লাগিয়ে ধুয়ে দিচ্ছে না কেন তাঁর সন্তান। রাজা-বাদশাহদের কাছেও শিক্ষক কতটা ওপরের আসনে আসীন, সেটাই প্রমাণিত হয় এই কবিতা থেকে। আর সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সেই কবিতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। আমরা আশান্বিত হই, আমরা দেখতে পাই, মানুষ এখনো শিক্ষার প্রতি, শিক্ষকের প্রতি সম্মান জানানোর রীতি ভোলেনি। এই রীতি আমাদের শিক্ষায়তনের তৃণমূল থেকে রাষ্ট্রনায়কদেরও অনেককে লালন করতে দেখা যায়। দার্শনিক সাইদুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কাহিনী, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি সম্মান জানানোর ঘটনা আমাদের সামনে উদাহরণ হয়ে আছে। সর্বশেষ একটি ঘটনা শিক্ষককে সম্মান জানানোর আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে গণ্য করা যায়। এটা রাষ্ট্রীয় সম্মান এবং সরকারপ্রধান মাধ্যমে প্রদত্ত। গত সপ্তাহে ঢাকার মোহাম্মদপুর রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের এক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন, এখন থেকে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা তৃতীয় শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদাপ্রাপ্ত হলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার মাধ্যমে শিক্ষকদের অনেক দিনের দাবির প্রতি সম্মান জানানো হলো। সরকারি শিক্ষকদের পদমর্যাদা প্রদান করে তিনি বর্তমান প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করলেন শিক্ষকদের সম্মান জানানোর জন্য। হয়তো শিগগিরই টাইমস্কেল পাওয়া শিক্ষকদের সিনিয়র হিসেবে পদায়ন করার মাধ্যমে আরেক দফা মূল্যায়ন করে দেওয়া হবে- এটা শিক্ষকদের মতো আমরাও প্রত্যাশা করতে পারি।
এই সম্মান জানানোর সঙ্গে প্রথমোক্ত সম্মানের কিছুটা পার্থক্য হয়তো আছে, কিন্তু ব্যক্তির সম্মানবোধ না থাকলে এভাবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্মান জানানোর মানসিকতা তৈরি হয় না। তাই বলা যায়, এই সম্মান জানানোর মাধ্যমে তিনি গোটা জাতিকে সম্মান জানিয়েছেন। অন্তত আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে নিশ্চয়ই প্রাপ্তির তৃপ্তি আসতে পারে। কিন্তু তার পরও প্রশ্ন থেকে যায়, বাংলাদেশে মাত্র ৩১৭টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে। আর সহকারী শিক্ষকের সংখ্যা ৯ হাজার ৭৩২ জন। এর বাইরেও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক আছেন। তাঁদের পদমর্যাদা ও প্রাপ্তিগুলো এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় আনা হয়েছে কি না। বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকরা প্রথম কিংবা দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদা পেতে পারেন না নীতিগত কারণেই। কিন্তু তাঁরাও সম্মানিত হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে আমরা শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধাদির কথা স্মরণ করতে পারি। দেশের শিক্ষার উন্নয়নে এসব শিক্ষকের অবদানের কথা স্বীকার করেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত হওয়া সত্ত্বেও তাঁদের মূল বেতনের শতভাগই সরকার বহন করছে।
কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠে অন্য চিত্রও দেখতে হচ্ছে আমাদের। কিছু ঘটনা শিক্ষকদের প্রতি সম্মানবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমরা দেখেছি, যে মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদপুরে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর পদমর্যাদা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন, ঠিক তখনই ঢাকার শাহবাগে বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের লাঠিপেটা করছে পুলিশ। কাঠফাটা রোদে শত শত শিক্ষক সেদিন অপেক্ষা করছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁদের স্মারকলিপি পেশ করার জন্য। তাঁরা স্মারকলিপি দিতে পারেননি, বরং পুলিশের বেধড়ক পিটুনি আর জলকামানের গরম পানি পেয়েছিলেন। যেসব পুলিশ সদস্য ওই সময় শিক্ষকদের পেটালেন, তাঁরাও এসব শিক্ষকের কাছ থেকেই দুই কলম শিক্ষা নিয়ে এসেছেন। দুর্ভাগ্য, সেসব শিক্ষককেই তাঁরা নাজেহাল করলেন। শিক্ষককে সম্মান জানানোর ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর মানসিকতার সঙ্গে এই নির্যাতনকে মিলিয়ে নেওয়া যায় না। দেশের ২৪ হাজার বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্পর্কে আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে। তার পরও ২৪ হাজার শিক্ষায়তনের ৯৬ হাজার শিক্ষার্থীও এই আচরণকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেবে- এমনটা ভাবা যায় না। পুলিশের পক্ষ থেকে হয়তো বলা হবে, শিক্ষকরা সেদিন স্বাভাবিক নিয়ম-রীতি মানছিলেন না। স্মারকলিপি প্রদানের জন্য প্রতিনিধি পাঠানোর সুযোগ তাঁরা গ্রহণ করেননি। শত শত মানুষকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া যায় না বিধায় তারা প্রতিরোধ করেছিল।
পুলিশের এই আচরণের পর শিক্ষকদের ভুল সিদ্ধান্তটি আর আমলে আসছে না। স্মারকলিপি প্রদানের জন্য তাঁদের প্রতিনিধি পাঠানোর প্রস্তাবটি ছিল যৌক্তিক। তাঁরা কোন কারণে সেই প্রস্তাব না মেনে কর্তৃপক্ষকে বললেন, তাঁরা সবাই স্মারকলিপি নিয়ে যেতে চান, তা বোঝা যাচ্ছে না।
বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেসব শিক্ষকের মর্যাদার প্রতি আমরা কি নজর দিয়েছি? আমাদের দেশের সুশীল সমাজ রাজনৈতিক কারণে যতটা উত্তেজিত হয়ে পড়েন, ক্ষমতার রদবদল নিয়ে তাঁরা যেমন অন্যদেরও উসকানি দিতে কসুর করেন না, সেই সুশীল সমাজের মানুষজন কি এগিয়ে এসেছেন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এসব শিক্ষকের দুঃখের কথা শোনার জন্য? এসব শিক্ষক শহীদ মিনারে অবস্থান করে দিনের পর দিন অপেক্ষা করছিলেন, কেউ হয়তো তাঁদের দাবির প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করতে যাবে। সরকারের পক্ষ থেকেও হয়তো কেউ তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করবে। কিন্তু কোনো সহানুভূতি তাঁরা পাননি। বাধ্য হয়ে তাঁরা আবারও ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী মাসে একযোগে ২৪ হাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁরা তালা ঝুলিয়ে দেবেন।
আগে আরেকবার তাঁরা শিক্ষায়তনগুলো বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সামনে যদি স্কুলগুলো আবারও বন্ধ হয়, তাহলে প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থীর অবস্থা কী হবে? এই এক লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষার সুযোগ বন্ধ করে দিয়ে কিংবা সুযোগ হ্রাস করে দিয়ে কি ২০১৪ সালের মধ্যে নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে? সুতরাং শুধু শিক্ষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যই নয়, বরং শিক্ষা সম্প্রসারণের জন্যও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতি সুদৃষ্টি দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে শিক্ষকদের এভাবে নাজেহাল করার বিষয়টিও তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। মুখে নয়, কাজেও মর্যাদা দিতে হবে শিক্ষকদের।
mhussain_71@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.