পার্বত্য চট্টগ্রাম-সাজেকের ঘটনার পুনরাবৃত্তি চাই না by তানভীর মোকাম্মেল

নয়টা গ্রাম পুড়েছে। ৩০০ আদিবাসী পরিবারের দেড় হাজার নারী-পুরুষ-শিশু ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। দুটি মৃতদেহ পাওয়া গেছে (এর মধ্যে নারীও রয়েছেন), তবে নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা সাত বলে আক্রান্ত গ্রামের লোকজন দাবি করেছেন।


একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুসহ ছয়জন নিখোঁজ! আরও ভয়াবহ সংবাদ হলো, বেতকাপা থেকে ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব বটতলী পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের সব বাড়িই পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মেরুদণ্ড দিয়ে এক শিরশিরে অনুভূতি বয়ে যায়। আমরা কি ১৯৭১-এর কোনো ঘটনা শুনছি?
না, এটা ১৯৭১-এর নয়, ২০১০ সালের স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের অত্যন্ত দুঃখজনক এক ঘটনা। ১৯৭১-এ রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানি সৈনিকেরা শান্ত বাঙালি গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে সবকিছু ছারখার করে দিত। সেটেলার বাঙালিদের সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যেভাবে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে আক্রমণ করে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে, মানুষ মেরেছে, তাতে একাত্তরের প্রতিচ্ছায়াই সেখানে ফিরে এসেছিল বলে যদি কেউ মনে করেন, তাহলে সেটা কি খুব ভুল হবে?
আর এই ফেব্রুয়ারি মাসে? যখন একটা নিপীড়িত জাতি হিসেবে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে রক্ষার জন্য একদিন আন্দোলন করেছিলাম এবং তার জন্য গর্ববোধ করি। অথচ আজ যখন আমাদের নিজেদের রাষ্ট্র হয়েছে তখন সে রাষ্ট্রশক্তির সবল হাতকে কোনো দুর্বল জাতিসত্তার বিরুদ্ধে এভাবে ব্যবহার করা, এ কী রকম ন্যায়বিচার?
পার্বত্য চট্টগ্রামের সহজ-সরল পাহাড়ি মানুষের প্রতি আমাদের আচরণ কখনোই গর্ব করার মতো ছিল না। ষাটের দশকে কৃত্রিমভাবে কাপ্তাই হ্রদ তৈরি করে প্রায় এক লাখ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে আমরা ভিটেমাটিছাড়া করে সর্বস্বান্ত করেছিলাম। তারপর সমত্তলের প্রায় চার-পাঁচ লাখ বুভুক্ষু বাঙালিকে এনে পাহাড়-জঙ্গলে কৃত্রিমভাবে বসিয়ে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের কেবল জনসংখ্যাগত ভারসাম্য নয়, জঙ্গল ও প্রকৃতির সব বৈষয়িক ও নান্দনিক সম্পদও আমরা ধ্বংস করেছি। অনেক রক্তক্ষয়ের পর জাতি যখন আশা করেছিল যে শান্তিচুক্তির একটি সফল বাস্তবায়ন হতে চলেছে, তখন কার প্ররোচনায় এ রকম একটা নৃশংস ও দুঃখজনক ঘটনা ঘটতে পারল তা গভীরভাবে তদন্ত হওয়ার দরকার। বাঙালি-পাহাড়িদের এই দ্বন্দ্বে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিরপেক্ষ ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে। পত্রপত্রিকায় যে খবর প্রকাশিত হয়েছে এবং ঘটনার যে বাস্তবতা, তাতে এমন ধারণা হওয়া স্বাভাবিক। এ ঘটনার শিকার হয়েছে সেখানকার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলে এমন হওয়ার কথা নয়। মেজার ফর মেজার নাটকে শেক্সপিয়র একটা কথা বলেছিলেন, এর অর্থ এ রকম যে, শক্তি থাকা ভালো, কিন্তু এর ব্যবহারটা মঙ্গলজনক নয়। শক্তি থাকলেই কি তা ব্যবহার করতে হবে? শক্তির যথেচ্ছা ব্যবহারের অনুমতি কাউকে দেওয়া হয়নি, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকেও না। সেনাবাহিনী বাংলাদেশের জনগণের করের অর্থে চলে, সেনাবাহিনীর এমন কিছু করা কাম্য নয় যে তাদের কোনো কার্যকলাপ এ দেশের জনগণকে বিব্রত করে।
পাহাড়ি-বাঙালি সমস্যা নিয়ে ‘কর্ণফুলীর কান্না’ নামে একটা ছবি বানাতে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমাকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল। অনেক সহূদয় পাহাড়ি মানুষের ঘরে আমাকে আশ্রয় নিতে হয়েছে। আজ তাঁদের বিষণ্ন ও করুণ মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আমি গভীরভাবে মর্মাহত হচ্ছি, আমার মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে। আমরা বাঙালিরা, যারা আমাদের শিক্ষা-সংস্কৃতি, পরমতসহিষ্ণুতা ও নিপীড়িত জাতিগুলোর প্রতি আমাদের সহমর্মিতার জন্য গর্ববোধ করি, সেই আমাদের এ কী মধ্যযুগীয় আচরণ? সংখ্যাধিক্যের বর্বরতার জোরে আমরা কি সংখ্যালঘুদের প্রতি সব ধরনের সংবেদনশীলতাকেই হারিয়ে ফেলছি?
বাঘাইছড়ির পাহাড়ে পাহাড়ে যেসব নৃশংস ঘটনা ঘটল, তা আমাদের জন্য এক জাতীয় লজ্জা হয়ে রইল। অতীতকে ঈশ্বরও পাল্টাতে পারেন না। তবে প্রকৃত দোষীদের উপযুক্ত শাস্তিটা অবশ্যই হওয়া কাম্য। আর ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর কখনোই ঘটতে না পারে সে ব্যাপারে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন, বাঙালি বসতি স্থাপনকারী, উগ্রপন্থী পাহাড়ি, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও সামরিক কমান্ডারসহ সবার কাছ থেকে আমরা আরও অনেক, অনেক বেশি দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল আচরণ প্রত্যাশা করি। কারণ, এ ধরনের বর্বর ও দুঃখজনক ঘটনার কোনো ধরনের পুনরাবৃত্তি এ দেশবাসী আর কখনোই দেখতে চায় না। আমাদের যেন কখনোই আর বলতে না হয়—‘এ তোমার, এ আমার পাপ!’
তানভীর মোকাম্মেল: চলচ্চিত্র নির্মাতা, প্রাবন্ধিক।

No comments

Powered by Blogger.