উদ্বিগ্ন জাপান পরমাণু বিদ্যুৎবিহীন জীবনের দিকে ঝুঁকছে by জাস্টিন ম্যাককার্থি

ফুকুশিমা ডাইচি পাওয়ার প্লান্টের তিনটি রিঅ্যাক্টরে দুর্ঘটনার এক বছর পর এ সপ্তাহেই, অর্থাৎ গত শনিবার, জাপান জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক কঠিন পরীক্ষার সামনে নিজেকে ঠেলে দিচ্ছে, যাকে অনেকেই অসম্ভব বলে মনে করেছেন।


শনিবার ইলেকট্রিক পাওয়ার কম্পানি হোক্কাইডো তিন নম্বর টোমারি রিঅ্যাক্টরটি বন্ধ করে দেওয়ার পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশ জাপান বিগত ৫০ বছরের মধ্যে এই প্রথম কোনো পরমাণু রিঅ্যাক্টর ছাড়া জ্বালানি সরবরাহের মাধ্যমে চলতে যাচ্ছে। ৫৪টি রিঅ্যাক্টরের সর্বশেষ এই রিঅ্যাক্টর বন্ধের মধ্য দিয়ে জাপান নাটকীয় এক জ্বালানি নীতির পথ বেছে নিল। কিন্তু পরিবেশবাদীরা যখন এ আনন্দ উদ্‌যাপন করতে প্রস্তুত, তখন সারা দেশে পরমাণু বিদ্যুৎ বন্ধের সঙ্গে অর্থনীতি এবং পরিবেশের ঝুঁকি প্রশ্নটিও যুক্ত হলো।
গত বছর জাপানে ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে যে সুনামি হয় তাতে ফুকুশিমায় ভয়ানক সংকট দেখা দেয়। যার ফলে পরমাণু প্রশ্নে জাপানকে পুনর্বিবেচনা করে দেখতে হচ্ছে।
টোমারি রিঅ্যাক্টর বন্ধ করে দেওয়ার অর্থ হলো, ভাপসা গরমে লাখ লাখ মানুষকে তাদের এয়ারকন্ডিশন ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিজেদের সাশ্রয়ী হতে হবে। এই বন্ধের ফলে দেশ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঝুঁকিতে পড়বে এবং দেশের মুমূর্ষু ম্যানুফ্যাকচারিং কম্পানিগুলোর জন্য উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটতে দেখা যেতে পারে। এ-সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট এ সপ্তাহেই প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সরকারের জাতীয় নীতিমালা ইউনিটের পরিকল্পনা অনুসারে টোকিও শহরে ৫ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দেবে। আর বিদ্যুৎ কম্পানিগুলোর মতে, অন্যতম শিল্পশহর ওসাকাসহ শুধু পশ্চিম জাপানেই ১৬ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দেবে। শিল্প, বাণিজ্য ও অর্থমন্ত্রী ইউকিয়ো এদানো বলেছেন, 'আমাকে বলতেই হচ্ছে যে আমরা মারাত্মক বিদ্যুৎ ঘাটতির মধ্যে পড়ছি।' তিনি বলেছেন, ব্যবহারের জন্য জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে ব্যক্তিগ্রাহকদের ওপর চাপ পড়বে, বিদ্যুতের মূল্য বাড়বে।
গত বছর মার্চ মাসের এই ভয়ানক ঘটনার আগে জাপানের মোট বিদ্যুতের ৩০ শতাংশ আসত পরমাণু শক্তির মাধ্যমে। জাপানের পরিকল্পনা ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে তা বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা।
সমুদ্র ও বাতাসে বিশাল পরিমাণ রেডিয়েশন নির্গমনের পর খাদ্য ও পানিতে যে দূষণ হয়েছে, হাজার হাজার মানুষকে সরিয়ে নিতে হয়েছে, তার অর্থ হলো, পরমাণু শক্তির ওপর নির্ভরশীলতার দিকে ঝুঁকে থাকা মানেই ভবিষ্যতে ধ্বংস ডেকে আনা। গত ১৪ মাসে সুনামির কারণে যেসব রিঅ্যাক্টর সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং সেগুলো নিয়মিত তদারকি ও নিরাপত্তার জন্য পরীক্ষা করা হচ্ছে। ফলে শিল্প ও বাড়িঘরের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে কয়লা, তেল ও গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছে। আমদানি করতে গিয়ে গত ৩০ বছরে প্রথমবারের মতো জাপানে গত বছর বাণিজ্য ঘাটতি দেখা গেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরলায়িত প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানিকারক জাপান গত বছর পরমাণুর বিকল্প হিসেবে রেকর্ড পরিমাণ এলএনজি আমদানি করেছে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির হিসাব মতে, সব পরমাণু প্লান্ট বন্ধ করে দেওয়ার ফলে জাপানের তেলের চাহিদা বাড়বে প্রতিদিন ৪.৫ মিলিয়ন ব্যারেল। যার অতিরিক্ত মূল্য হিসেবে গুনতে হবে প্রতিদিন ১০০ মিলিয়ন ডলার। পশ্চিম জাপানে ওআই পাওয়ার প্লান্টে সর্বশেষ দুটি রিঅ্যাক্টর পুনরায় চালু করার জন্য জাপানি প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিকো নোদার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে জাপানের জনগণের তুমুল বিরোধিতার কারণে। এখন জাপানের কোনো অচলাবস্থায় থাকা রিঅ্যাক্টরকেই অনুমতি দেওয়া হবে না যে পর্যন্ত কোনো সুদৃঢ় ও সুনিশ্চিত পদ্ধতিতে পরীক্ষা করা না হবে। এমন পরীক্ষা, যাতে সুনিশ্চিত হওয়া যাবে যে এই রিঅ্যাক্টর গত বছরের সুনামির সমপরিমাণ ধ্বংসের বিরুদ্ধে যথেষ্ট টেকসই। গত বছরের ১৪ মিটার উচ্চতার সুনামিতে ফুকুশিমা ডাইচিতে যে আঘাত হেনেছিল, তা চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত। কয়েকজন বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন, দুই স্তরের চাপ পরীক্ষার উপকরণের অপর্যাপ্ততার কারণে এখনই পরমাণু বিদ্যুৎ চালু সম্ভব নয়।
পুনরায় চালু করার জন্য স্থানীয়দের দ্বারা আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নোদা রাজনৈতিক কারণেই স্থানীয়দের মতামত উপেক্ষা করার ঝুঁকি নেবেন না। সম্প্রতি কিয়োদো নিউজের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৫৯.৫ শতাংশ লোক চায় না ওআই পরমাণু বিদ্যুৎ চালু করা হোক। মাত্র ২৬ শতাংশ লোক এই পরমাণু বিদ্যুৎ চালুর পক্ষে রায় দিয়েছে। জাপানের সবচেয়ে বড় লবি কিদানরেন এই রিঅ্যাক্টর চালুর জন্য চাপ দিচ্ছে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান মতে, ৭১ শতাংশ ম্যানুফ্যাকচারার বলছে, বিদ্যুতের ঘাটতি তাদের উৎপাদন কমাতে বাধ্য করতে পারে। ৯৬ শতাংশ লোক বলছে, বিদ্যুৎ বিলের অতিরিক্ত যন্ত্রণা আয়ের ওপর প্রভাব ফেলবে।
জাপানের ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস সতর্ক করে দিয়েছে যে পরমাণু রিঅ্যাক্টর বন্ধ করে রাখার ফলে এ বছর জিডিপিতে প্রবৃদ্ধির হার ০.১ শতাংশ কমবে, যদি শিল্প উৎপাদনকারীরা অপরিশোধিত তেলের উচ্চমূল্য দিতে গিয়ে উৎপাদন কমিয়ে আনে।
পরমাণু রিঅ্যাক্টর বন্ধ করার ব্যাপারে সমালোচকরা বলছেন, অধিক পরিমাণ জৈব জ্বালানি ব্যবহার জাপানের জলবায়ু পরিবর্তনে যে প্রতিশ্রুতি, তাতে প্রভাব ফেলতে পারে। এদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগকারী সফট ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী মাসায়োসি সন স্বীকার করেছেন, দেশের জ্বালানির ওপর প্রভাব পড়তে সময় নেবে। তাঁরা জাপানের নতুন পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে আশান্বিত যে পরমাণু ছাড়া বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং দ্রুত নবায়নযোগ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে জাপান ১৯৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকে ১৯৯০ সালের স্তরের চেয়ে ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে পারবে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি ডিরেক্টর চেই কাতো বলেছেন, 'জাপানের যদি লক্ষ থাকে তাহলে অবশ্যই তা করতে পারবে। আমাদের কৌশলগত সুবিধা আছে। পরিবেশ গ্রুপগুলো বলছে স্বল্প সময়ের ঝুঁকির বাইরে শনিবারের রিঅ্যাক্টর বন্ধ করাটা জাপানের জন্য একটি অভূতপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছে পরমাণু বন্ধ করে বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবহারের।'
গ্রিনপিস বলেছে, 'এটি জাপানের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট। এটি একটি বিশাল সুযোগ জনগণের জন্য সাসটেইনেবল জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়ার। নবায়নযোগ্য জ্বালানির এত সুযোগ এবং উচ্চমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাপান সহজেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির জগতে নেতৃস্থানীয় হতে পারে। এর ফলে একই সঙ্গে ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতাও থাকবে না। ১ মে এক মাস আগেই জ্বালানি কুল বিজ (সাশ্রয় অভিযান) চালু করে অবদান রেখেছে। সাধারণত এক মাস পর এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু স্যুট-টাই পাল্টে পাতলা কাপড় পরা এবং এয়ারকন্ডিশনার বন্ধ রাখাটা জাপানিরা বসন্তের হালকা আবহাওয়ায় মানিয়ে নিতে পারে। ফুকুশিমার দুর্ঘটনার পর বড় পরীক্ষাটি তাদের সামনে গরমের দিনের জন্য অপেক্ষা করছে।

লেখক : লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার টোকিও প্রতিনিধি। গার্ডিয়ান ও দ্য হিন্দুতে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন মহসীন হাবিব

No comments

Powered by Blogger.