ভারতের সেরা রফতানি by মাহবুব মোর্শেদ

ভারতের সেরা রফতানি পণ্য কী? অনেকেই অনেক পণ্যের কথা বলতে পারেন, কিন্তু 'টাইম' ম্যাগাজিনের একটি লেখায় কার্লা পাওয়ার বলছেন 'সিইও'। সুলিখিত ও সাবলীল এ রচনায় কার্লা যে পণ্যের কথা বলছেন তা মোটেও পণ্য নয়, বরং পণ্য বিক্রির কারিগর_ সিইও বা চিফ মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ।


বিশ্বজুড়ে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোতে ভারতীয় সিইওদের একচ্ছত্র দাপট এখন। এই সিইওদের দু'জন বঙ্গ ব্রাদার্স। বিন্দি বঙ্গ ছিলেন ইউনিলিভারের শীর্ষ কর্মকর্তা, পরে হয়েছেন ক্লেটন, ডাবিলিয়ার অ্যান্ড রাইসের অংশীদার। আর তার ছোট ভাই ছিলেন সিটি গ্রুপের এশীয় প্রধান, পরে হয়েছেন মাস্টারকার্ডের সিইও। এই বাঘা সিইওদ্বয়ের জন্ম এক মায়ের পেটে। টাইম ম্যাগাজিন প্রশ্ন করেছে, বঙ্গভ্রাতাদের মা তাদের কোন দোকানের চাল খাওয়াতেন যে, তারা কোনো পশ্চিমা ডিগ্রি ছাড়াই এমন অবস্থানে যেতে পারলেন? বঙ্গ ভাইরা বলেন, তাদের মা ছিলেন বাঙালি বাঘিনী। আর বাবা ছিলেন ভারতীয় আর্মিতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল। বাবার বদলির চাকরিবলে নতুন জায়গায় নতুন বল্পুব্দ, নতুন পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বড় হয়েছেন তারা। শুধু বঙ্গ ভাইরাই নন, সিটি গ্রুপের বিক্রম পণ্ডিত, পেপসিকোর ইন্দ্র নুয়ি, মটোরোলার সঞ্জয় ঝাঁ, হাথাওয়ের অজিৎ জৈন, ইনসিডের ডিন দীপক জৈনসহ বহু নামই এখন বিশ্ববাজারে সমীহেরু সঙ্গে উচ্চারিত হয়। দিন দিন বিশ্ববাজারে ভারতীয়দের দাপট বাড়ছে। কিন্তু এর পেছনের কাহিনীটা কী? চীন থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এমনকি আমেরিকায়ও প্রশ্নটা ওঠে অহরহ। ভারতীয়রা কেন এ কাজগুলো পাচ্ছে?
প্রথমত, এ এক্সিকিউটিভরা এমন এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন যে, আজকের বিশ্ববাজারের জন্য তারা উপযুক্ত। দ্বিতীয়ত, ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা একজন এক্সিকিউটিভের জন্য বাইরের বাজার-সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে ওঠা সহজ। তৃতীয়ত, জটিল প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতির সঙ্গে তাদের পরিচিতি। চতৃর্থত, কম সম্পদের উন্নয়নশীল দেশের নাগরিকবলে ভারতীয়রা এখানকার পরিস্থিতি বোঝেন। পঞ্চমত, বিশ্ববাজারের ভাষা ইংরেজিতে কথা বলেন তারা। ষষ্ঠত, এশিয়ার ক্রমবর্ধমান বাজারের সঙ্গে ভারতীয়দের সুপরিচিতি। সপ্তমত, চীন ও ভারত মাল্টিন্যাশনালদের কাছে মুনাফার অভয়ারণ্য। ফলে, আগামী দিনের গ্গ্নোবাল লিডাররা তাদের মধ্য থেকে আসবে, সেটাই স্বাভাবিক।
ভারতীয়দের আরও নানা গুণের কথা কার্লাকে বলেছেন জিল অ্যাডের নামে এক সিইও। যেমন ভারতীয়রা এশিয়ায় সবচেয়ে পরিচিত মুখ। তারা ইংরেজিতে চিন্তা করে। নিজ দেশের বহুজাতীয় সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত। মানিয়ে নিতে পারদর্শী এবং ভীষণ আত্মবিশ্বাসী। মোগল থেকে ব্রিটিশ_ সব ঔপনিবেশিক শক্তির সংস্কৃতি আত্মস্থ করে ভারত এক মহাশক্তি হয়ে উঠেছে। ভারতীয়রা গুণী, কিন্তু ভারতীয় সিইওদের তৈরি গুণকে সম্পদে পরিণত করছে কারা? সিগনে স্পেনসার নামে এক লেখক বলছেন, ভারতের লোকজন হার্ভার্ড বা এমআইটির চেয়ে তাদের আইআইটি বা আইআইএম বেশি পছন্দ করে। ছোটবেলা থেকেই ছাত্রদের মধ্যে শক্ত প্রস্তুতি ও প্রতিযোগিতা চলে এগুলোতে ভর্তি হওয়ার জন্য। আইআইটি হলো ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি। আর আইআইএম হলো ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট। দেশের নানা জায়গায় ছড়ানো এ প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলে। ছাতাধরা ভবনে ক্লাস হয়, চিপা রুমে ঘুমাতে হয়। তবু ছাত্ররা গ্গ্নোবাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকে; বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় নাম লেখায়। নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়াও তাদের চমৎকার। ৬০ বছর বয়সেও কোন ক্লাসে কে কত নম্বর পেয়েছিল তা তাদের মনে থাকে।
মজার ব্যাপার হলো, ভারত এই বিজনেস এক্সপার্টদের তৈরি করছে। কিন্তু তারা দেশের বদলে দেশের বাইরেই বেশি কাজ করতে পছন্দ করছেন। একজন চীনা এক্সিকিউটিভকে যদি প্রশ্ন করা হয়, তিনি যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রিটেনে কাজ করতে যাবেন কি-না। তখন পার্টির মারফত নিয়োগ পাওয়া এক্সিকিউটিভ প্রশ্ন করবেন, কেন যাব? কিন্তু ভারতীয়রা একপায়ে খাড়া। ভারতে একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিতে বা একটি কারখানা তৈরি করতে একজন সিইওকে ৮০ জায়গায় পারমিশন নিতে হয়। সেখানে চীনে একটি কারখানা বসাতে দুই বা তিন জায়গায় অনুমতি নিলেই চলে। নতুন উদ্যোগের জন্য চীনারা লাল গালিচা পেতে দেয়, আর ভারতীয়রা উদ্যোগটাকে লালফিতায় আটকে ফেলে। দেশের এ পরিস্থিতি ভারতীয় এক্সিকিউটিভদের বিদেশমুখী করছে। বিশ্বজুড়ে গড়ে উঠছে ভারতীয় সিইওদের স্বর্গরাজ্য।
 

No comments

Powered by Blogger.