বিলেতের কথা-বিলেতের স্বপ্নফুল: বিজয়ফুল by শামীম আজাদ

প্রয়াত তসাদ্দুক আহমদ এমবিই ছিলেন বিলেতে বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রাণপুরুষ। তাঁর পিঠে ছিল আগামীর ঝোলা আর পূর্ব প্রজন্মের পাওয়া না-পাওয়ার দাগ। তাঁর সঙ্গে হেঁটে হেঁটে কত গল্প শুনেছি। শুনেছি মুক্তিযুদ্ধের সময়ে লন্ডনের লেগুনে কী হয়েছিল।


বিজয়ফুলকে একটি কার্যক্রম হিসেবে নিয়ে বিলেতের বাঙালিরা তাঁরও আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করে তুলেছে। আজ বিলেতের ৩৯টি নগর, বহির্বিশ্বে পাঁচটি দেশ আর লন্ডনের স্কুলে স্কুলে হচ্ছে বিজয়ফুল।
এত দিনে এই প্রবাস জমে উঠেছে তিন প্রজন্মের প্রভায়। ছোটরা এসে মুক্তির গল্প শুনছে ফুল বানাতে বানাতে।
বিলেতে একসময় ছোট্ট পরিসরে ’বিজয়ফুল’-এর যাত্রা শুরু হলেও এখন নানা দেশে বাংলাদেশিদের বুকে শোভা পাচ্ছে এ ফুল। প্রবাসের নতুন প্রজন্ম পতাকার রঙে রাঙা বিজয়ফুলের মাধ্যমে জানছে স্বাধীন বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠাগুলো ‘বিজয়ফুল’কে বেছে নিয়েছে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে। আঁকার ছলে কিংবা কেটে কেটে তৈরির সুবাদে খুব সহজেই শিশু-কিশোরদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাস। প্রবাসে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ফুলকে বেছে নিয়েছেন স্মৃতিচারণার সূত্র হিসেবে।
বছর দশেক আগে কোনো এক শীতার্ত সন্ধ্যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধাহত এক সৈনিকের কাছ থেকে কিনেছিলাম টুকটুকে লাল একটি কাগজের কপি। তখনই বলা যায় বিজয়ফুলের স্বপ্নবীজ আমার মনে রোপিত হয়েছিল। সুপার মার্কেটের সামনে হুইলচেয়ারে বসে তিনি কাগজের কপি বিক্রি করছিলেন। তাঁর কাছে অল্প কথায়ই এ থেকে অর্জিত অর্থে কীভাবে এ দেশের সব যুদ্ধে আহত ও মৃত সৈনিক এবং তাঁদের পরিবারের কল্যাণে ব্যয় হয়, তা আঁচ করতে পারি। পুরোটা বুঝতে টেডের সঙ্গে আরেক দিন পাবে বসি। আরও জানতে খোঁজখবর করি। রাজনীতির কৌশলে ও করাতে সব সৃষ্টিই আজ খণ্ড খণ্ড। মনে হলো, আমরা তো পারি সামান্য খরচাপাতি দিয়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের তত্ত্বাবধানে কোনো কাপড়ের ফুল বানিয়ে তার অর্থ তাঁদের হাতে তুলে দিতে! সে রকম ধারণা থেকে বাড়ি এসে লিখলাম ‘পলাশ নয়তো কৃষ্ণচূড়ার নামে’। দেশে তা ছাপা হওয়ার পর ব্যাপক সাড়া পাই। আমি তখন টমাস বাক্সটন প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করি, এখানে-সেখানে গল্প বলি (স্টোরিটেলিং) আর কবিতা লিখি।
মানুষ তো যেখানে যায় সেখানেই তার জ্ঞাতি খুঁজে বেড়ায়। বাংলাদেশের এ বিলেতি প্রজন্ম দেখি কিছুই জানে না। জানে ক্রিকেটকথা! কী করি? জাতিই চেনে না তার আবার জাতীয় ফুল, তারপর তার আবার নামের অনুবাদ—সে এক বিশাল ব্যাপার। আমি ভূগোল সেশনে ম্যাপ নিয়ে ক্রস কারিকুলামের নামে জাতীয় ফুল শাপলা নিয়ে বসি। আর গল্প করি। তাদের ছোট ছোট হাত কোনোক্রমে কেবল বৃত্ত আঁকতে পারে। আর লাল-সবুজের পতাকাটা কিন্তু চেনে। আমি বলি, বলো তো লাল কী? ওরা একনাগাড়ে বলে যায় রক্ত, সূর্য, প্রাণ আরও কত কী। বলো তো বাচ্চারা, বাংলাদেশের পতাকায় সবুজ কেন?—‘আমি জানি, আমি জানি’! রীতিমতো প্রতিযোগিতা লেগে যায়। সিলেটে গ্রামে গিয়ে নদীর ধারে কত সবুজ দেখেছে। নিচের দাদার খেতে কীভাবে মাটি কুপিয়েছে। সবুজ নারকেল পাতা চিরে সাপ, পাখি আর চশমা বানিয়েছে। আমার মনে হয়, মন্দ কী, পতাকা ধরেই তো দেশ চেনানো যায়। শুরু হলো সবুজ আর লাল বৃত্তের খেলা। সেই ’৯৯ সালে।
এখন এত বছর পর মনে হয়, ওই একটি বিমূর্ত ফুলে কত কথা বলা যায়। যা কিনা এত বছর ধরে আমরা কত ধাতব ব্যাজ বানিয়েও বলতে পারিনি। এখন কাগজের এই ‘বিজয়ফুল‘ আমাদের লাখো শহীদের এক অনন্য স্মারক। এক অমূল্য প্রতীক। আমার মায়ের মুখ। আর ডিসেম্বরেই বিজয় এসেছে বলে তার নাম ‘বিজয়ফুল’। প্রবাসে এ ফুল স্বাধীনতাবিরোধী ছাড়া সব মানুষের দাঁড়াবার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দল-মতনির্বিশেষে সবাই পরছেন।
ব্রিটেনের বাংলা কাগজ আর টিভি চ্যানেলের কল্যাণে অর্ধশতাধিক স্থানে এবার বিজয়ফুল কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ওয়েব আর ফেসবুকের বদৌলতে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকা, ইতালি, স্পেন, দুবাই, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে হয়েছে বিচ্ছিন্নভাবে। বাংলাদেশের ফ্যাশন ডিজাইনার এমদাদ হক কাপড়ে এনেছেন এ ফুল। নর্থ কোরিয়ার এক নারী ফেসবুক থেকে তাঁর ডিজাইনে করেছেন শাড়ি। লন্ডনের চলচ্চিত্রনির্মাতা সালেকিন লিয়াকত এবারের বিলেতের তুষার কাজে লাগিয়ে দেড় মিনিটের ছবিতে এনেছেন বরফের বিজয়ফুল। দুবাইতে দেশ নিয়ে বিজয়ের গল্প বলে এ ফুলের ওয়েবপেজ থেকে ফুলের ইমেজ সরাসরি কেটে বুকে ধারণ করেছেন সবাই। রাতদুপুরে রেস্টুরেন্টের কাজ সেরে কভেন্ট্রি কার্ডিফে তুষারের তমসা চিরে মুক্তিযুদ্ধের গল্পের আগুনে হাত সেঁকেছেন ইংল্যান্ডের মানুষ। কী যে কাণ্ড! যেন শুকনো কুটোতে পড়েছে ফুলকি। ছড়িয়ে পড়েছে সবখানে।
তার আগে নভেম্বরের শেষ রাতে লন্ডনের আলতাব আলী পার্কে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের চার ডিগ্রি নিচে ছিল, কিন্তু তা উপেক্ষা করে দলে দলে এসেছেন মুক্তিযোদ্ধারা, এসেছে নতুন প্রজন্ম। বিলেতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাঈদুর রহমান খান যখন প্রদীপ জ্বেলে এর উদ্বোধন করেন, সবাই গেয়ে ওঠেন আমার সোনার বাংলা...। তুষার উড়ছে। উড়ছে নবীন কিশোরের কেশর। শীতের কামড় উপেক্ষা করে বয়োজ্যেষ্ঠরা বিজয়ফুল পরিয়ে দিচ্ছেন পাশে দাঁড়ানো বয়োকনিষ্ঠকে। এভাবে বিজয়ফুলের দায়িত্ব বর্তাল নতুন প্রজন্মে।
আমরা ধরেছি ভবিষ্যতের হাত। সেও একদিন হবে হয়তো বা।
লন্ডন
শামীম আজাদ: কবি, কথাসাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ।
shetuli@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.