শনিবারের সুসংবাদ-শীতলপাটির বিদেশযাত্রা by রফিকুল ইসলাম ও কে এম সবুজ

গরমে স্বস্তিদায়ক বলে গ্রামবাংলায় শীতলপাটির কদর যুগ যুগ ধরে। বিদ্যুতের দুর্ভোগের কারণে শুয়ে-বসে একটু শান্তি পেতে শহরেও অনেকে শীতলপাটি ব্যবহার করে। গায়ে হলুদসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আভিজাত্য ও মর্যাদা বাড়ায় এই লোকজ ঐতিহ্য।


সময়ের পরিক্রমায় বহুল ব্যবহারের তকমা হারিয়ে ফেলেছে শীতলপাটি। আশাজাগানিয়া খবর হলো, বাংলাদেশের নিভৃত পল্লীর নারী-পুরুষ ও শিশুদের পরম যত্নে বোনা এই শীতলপাটি দেশ ছাড়িয়ে সমাদৃত হচ্ছে বিদেশেও। প্রতিবেশী ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে শীতলপাটির বাজারের সম্ভাবনা জেগে উঠছে। বিশেষ করে ভারতে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সরকারিভাবে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের স্বীকৃতি না পাওয়ায় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শীতলপাটি রপ্তানি শুরু হয়নি। ব্যক্তিবিশেষের মাধ্যমে এগুলো বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। দরকার সরকারের উদ্যোগ।
বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও পিতৃপুরুষের পেশা আর নাড়ির টানের কিছু মানুষ আজো ধরে রেখেছে শীতলপাটি বোনার পেশা। বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের পাটিকরপাড়া বা কাঁঠালিয়া গ্রামে গেলে দেখা মেলে এই পেশাজীবীদের। আজো ওই গ্রামের শতাধিক পরিবারের জীবিকার একমাত্র মাধ্যম শীতলপাটি বুনন।
ভোরের আলো ফুটতেই পাটিকরপাড়ায় সাড়া পড়ে যায়। পাটি বোনার ছন্দময় (পাইরাকাটা) শব্দে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। ধুম পড়ে যায় শীতলপাটি বোনার। দিনভর চলে এই কাজ। পাটি বুনেই গ্রামের মানুষের মেলে খেয়ে-পরে দিন গুজরানের নিশ্চয়তা। বংশানুক্রমে তাঁরা এই পেশার সঙ্গে জড়িত। তা কত আগে? সময়সীমা কল্পনার চার দেয়ালের বাইরে। এখন কাঁঠালিয়া গ্রাম নয়, এটি পাটিকরপাড়া হিসেবেই পরিচিত। গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাটির চাহিদা বাড়ে, কিন্তু বাড়ে না তাঁদের মজুরি।
বাকেরগঞ্জ উপজেলার কাঁঠালিয়া, উত্তমপুর, কাজলাকাঠি, নীলগঞ্জ, হেলেঞ্চা, ঝালকাঠির বদরপুর, তালতলা, সরই, আইলাকাঠি, সাংগর, চিরাপাড়া ও রামনগর গ্রামে পাটি তৈরির কাঁচামাল পাইতরা বা বেত (ঘাস জাতীয় উদ্ভিদ) চাষ হয়। কঞ্চির মতো দেখতে এই গাছ সাধারণত নদী, খাল ও পুকুরপাড় এবং পরিত্যক্ত জমিতে জন্মে থাকে। এক পণ (৮০টি) পাইতরার দাম পড়ে ১২০ থেকে ২৫০ টাকা। এক পণ বেতগাছে পাঁচ হাত লম্বা ও সাড়ে চার হাত প্রশস্ত নকশা করা একটি পাটি তৈরি করা সম্ভব।
পাইতরা গাছের বাকলের ওপরের অংশ দিয়ে দামি পাটি তৈরি হয়। গাছ চিকন করে কেটে বেতি তৈরি করা হয়। বাড়িতে এনে কাঁচা গাছ দা দিয়ে পাতলা করে ফালি করতে হয়। একেকটি গাছ তিন ফালি করে কাটা হয়। ফালির প্রথম অংশ 'নেল' বলে পরিচিত। এটি দিয়ে পাটি বোনা হয়। শেষ অংশ 'বুকা' ব্যবহার হয় ছটা ও জ্বালানি হিসেবে। নেল পাতলা করে কেটে গরম পানিতে সেদ্ধ করে তাতে রং লাগিয়ে, কখনোবা রং ছাড়াই শীতলপাটি বোনা হয়।
কাঁঠালিয়া গ্রামের পাটিশিল্পী নান্টু লাল দত্ত বলেন, ভালোমানের পাঁচ হাত দীর্ঘ ও চার হাত প্রস্থ একটি পাটি বুনতে একজন কারিগরের সাত থেকে আট দিন সময় লাগে। একটি পাটির বাজারমূল্য দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। আর সাধারণ মানের একটি পাটি বুনতে লাগে পাঁচ-ছয় দিন- যা তৈরিতে সব মিলিয়ে খরচ হয় প্রায় ৪০০ টাকা। বাজারে বিক্রি হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। সেই হিসেবে এক দিন কাজ করে ২৫ টাকা মজুরি পাওয়া যায়। তিনি জানান, নিজের জমিতে পাইতরা চাষ করে যাঁরা এ ব্যবসা করেন তাঁদের অবস্থা মোটামুটি ভালো। কিন্তু পাইতরা কিনে পাটি বুনে মূলত তেমন কিছুই থাকে না।
সত্তরোর্ধ্ব কারুশিল্পী শেফালী রানী পাটিকর জানান, প্রায় ৫০ বছর ধরে তিনি পাটি তৈরি ও বিক্রি করে আসছেন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শেফালী পাটি বোনার কাজ শিখিয়েছেন তিন মেয়ে ও পাঁচ ছেলের বউকে। তাঁরাও সাংসারিক কাজের পর ব্যস্ত থাকেন পাটি বোনার কাজে।
গ্রামের শংকর দত্ত ১৪ বছর আগে বিয়ে করেন একই উপজেলার হেলেঞ্চা গ্রামের বকুল রানীকে। বকুল পাটি বুনতে জানেন বলেই এ বিয়ে হয়েছে বলে জানান সুকেন।
উপজেলার শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জিতেন্দ্রনাথ দত্ত কালের কণ্ঠকে বলেন, 'কাঁঠালিয়া গ্রামের হিন্দু-অধ্যুষিত প্রায় পরিবারেই পাটি বোনার কাজ হয়। নিজেদের বোনা পাটি বিক্রি করেই তাঁরা জীবিকা চালান। এখানে বোনা শীতলপাটি বিভিন্ন দেশে যাওয়ার খবর আমরা পাই। কিন্তু সেই অনুপাতে প্রান্তিক পাটিশিল্পীরা দাম পান না।'
হৃদয় পাটিকর বলেন, 'একসময় নিজেই পাটি বুনতাম। টানাপড়েনের কারণে মূলধন নেই যে পাইতরা কিনে পাটি বুনব। এখন অন্যের বাড়িতে পাটি বোনার মজুরি খাটি।' কারিগর অমূল্য রতন, কানাইলাল, তপন দত্ত, নেপাল দত্ত, সুরেশ দেবনাথ ও অনিল দেবনাথ অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই এলাকায় আরো বেশি পাটি বোনা সম্ভব। সেই সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থাও উন্নত হওয়া দরকার। কেননা, এখান থেকে অতি কম দামে পাটি কিনে নিয়ে অধিক মুনাফা করছেন মধ্যস্বত্বভোগী এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা।
ঝালকাঠি জেলায় তিন শয়ের বেশি পরিবার আজো পাটি বুনন শিল্পের সঙ্গে জড়িত। রাজাপুর উপজেলার হাইলাকাঠি ও ডহরশংকর গ্রামের দুই শতাধিক পরিবার পাটি বুনে জীবিকা নির্বাহ করছে। পুরাতন ঐতিহ্যের কারুহাতে গড়া শীতলপাটির জন্য গ্রাম দুটিকে 'শীতলপাটির' গ্রামও বলা হয়। এ গ্রামের শত শত হেক্টর জমিজুড়ে রয়েছে বিশাল নজরকাড়া পাটিগাছের বাগান। এখানে শীতলপাটি, নামাজের পাটি ও আসন পাটি নামে তিন ধরনের পাটি তৈরি হয়।
মহাজনরা প্রতি পাটিতে ১০০ থেকে ৫০০ টাকা লাভ করেন। পাইত্তা চাষ ও কেনার জন্য প্রচুর মূলধন প্রয়োজন। এ জন্য শিল্পীরা মহাজন ও এনজিওর কাছে থেকে ঋণ নিতে বাধ্য। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি হচ্ছে না। ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা না থাকায় পুঁজির জন্য শিল্পীরা দাদন ব্যবসায়ী, সুদখোর মহাজনদের কাছে জিম্মি। তা ছাড়া বিদেশে ব্যাপক চাহিদা সত্ত্বেও শীতলপাটি আজও রপ্তানিযোগ্য পণ্যের স্বীকৃতি পায়নি, যা এই শিল্পের অগ্রতির ক্ষেত্রে বড় একটা প্রতিবন্ধক।
স্থানীয় পাটিশিল্পী সমিতির সভাপতি বলাই চন্দ্র পাটিকর বলেন, সরকার হাইলাকাঠি গ্রামের পাটিশিল্পীদের কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে এসএমই খাতের আওতায় ঋণ সহায়তা দিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ২৫ জন পাটিশিল্পীকে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঋণ দেওয়া হয়। তবে বিনা সুদে ঋণ দিলে পাটি শিল্প নতুন উদ্দীপনায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।
ঝালকাঠির জেলা প্রশাসক অশোক কুমার বিশ্বাস বলেন, 'চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পাটি বিপণনে ত্রুটি থাকায় বছরের একটা সময় শীতলপাটির শিল্পীদের বসে থাকতে হয়। আমরা সরকারের অতিদরিদ্র্য কর্মসৃজন কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র্য পাটিশিল্পীদের কাজের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। আশা করছি, শিগগির এই উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখবে।'
বরিশাল বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক মনির আহমেদ এ ব্যাপারে কালের কণ্ঠকে বলেন, জাতিসংঘের অর্থায়নে ১৯৮৩-৮৪ অর্থবছরে কুটির শিল্প প্রসারে বিশেষত শীতলপাটি বানানোর দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ শুরু হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটি শেষ হওয়ার পর আর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিনি আরো বলেন, এখানকার পাটি শিল্প সম্পর্কে তাঁর কাছে তেমন কোনো তথ্য নেই।

No comments

Powered by Blogger.