ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নিন-লিবিয়ায় আটকে পড়া বাংলাদেশি

মুয়াম্মার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহের জের ধরে লিবিয়ার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি ঘটায় সে দেশে বসবাসরত প্রায় ৬০ হাজার বাংলাদেশি নাগরিকের জীবনে বেশ অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। অনিশ্চয়তার দিকগুলো সাধারণভাবে এমন: প্রথমত, বিক্ষোভ-সহিংসতায় তাঁদের জীবনের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন।


দ্বিতীয়ত, অস্থিরতা-সংঘাত শুরু হওয়ার পর ত্রিপোলি, বেনগাজিসহ অন্যান্য শহরে কর্মরত বাংলাদেশিদের অনেকেরই কর্মচ্যুতি ঘটেছে। ইতিমধ্যে অনেক লিবিয়া-প্রবাসী বাংলাদেশি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করে তাঁদের দুর্দশার কথা জানিয়েছেন। তাঁদের অনেকের হাতেই অর্থ নেই, নিরাপদ আশ্রয় নেই; এমনকি খাদ্য ও খাওয়ার পানির সংকট সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ সহিংসতার শিকার হওয়ার পাশাপাশি, আশ্রয়-খাদ্য-পানীয়র অভাবেও তাঁদের জীবনে বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এমন গুরুতর পরিস্থিতিতে এত মানুষের নিরাপদে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা সত্যিই কঠিন, কিন্তু দ্রুত কিছু কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া অত্যন্ত জরুরিও বটে। সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তেমন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি অভিযোগ করে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের আত্মীয়স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলে সংবাদ বেরিয়েছে। পররাষ্ট্রসচিব মিজারুল কায়েস শনিবার সাংবাদিকদের বলেছেন, লিবিয়ায় আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনার সময় এখনো আসেনি। আমরা তাঁর এই মন্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। সে দেশের সেনাবাহিনীর অস্ত্রশস্ত্র এখন রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষের হাতে; আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু আর অবশিষ্ট নেই। গৃহযুদ্ধ বা ব্যাপক নৈরাজ্য শুরু হওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই প্রবলতর হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের স্বদেশি ভাইদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার সময় এখনো আসেনি বলে মন্তব্য করা সংবেদনশীলতার পরিচায়ক নয়। দেশটির সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন, আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের অপ্রতুলতা আছে—পররাষ্ট্রসচিবের এসব বক্তব্য বোধগম্য, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাঁদের ফিরিয়ে আনার সময় এখনো আসেনি। আমরা বরং বলি, সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব জাফর আহমেদ খান লিবিয়া থেকে বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনতে সরকার প্রবাসীকল্যাণ তহবিলের অর্থ ব্যবহারে কার্পণ্য করবে না বলে জানিয়েছেন। তাহলে পররাষ্ট্রসচিব কেন সম্পদের অপ্রতুলতার কথা বলছেন, তা বোধগম্য নয়। প্রয়োজন হলে সেই তহবিলে আরও অর্থ বরাদ্দ করা হোক।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা পেতে সরকারের পক্ষ থেকে জোর কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। লিবিয়া থেকে বাংলাদেশিরা যাতে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে নিরাপদে সরে যেতে পারেন, সে লক্ষ্যে ওই দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে আমাদের সরকারের যোগাযোগ করা উচিত, যেমনটি করা হয়েছে তিউনিসিয়ার সঙ্গে। এ ছাড়া চীন, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের যেসব প্রতিষ্ঠানে লিবিয়া-প্রবাসী বাংলাদেশিরা কর্মরত আছেন, তাঁরা যেন তাঁদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং স্বদেশে ফেরার ব্যবস্থা করেন, সে লক্ষ্যেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তৎপরতা চালানো উচিত।
বিষয়টি যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কালক্ষেপণের কোনো সুযোগই যে আর নেই, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর এই উপলব্ধি একান্ত প্রয়োজন। এবং সেই উপলব্ধি থেকেই অতি দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.