সোহেল তাজের খোলা চিঠি-এমন মার্জিত রুচির রাজনীতিকই চাই

মহাজোটের মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। পেয়েছিলেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব। সে পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন মাত্র পাঁচ মাসের মাথায়। এবার ছেড়ে দিলেন সংসদ সদস্য পদ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঠিয়ে দিয়েছেন পদত্যাগপত্র। পদত্যাগপত্রে তিনি সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিধির কথা উল্লেখ করেছেন।


পদত্যাগের কারণ উল্লেখ করে সোহেল তাজ একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। সে চিঠিতে তাঁর পদত্যাগের পক্ষে কথা বলেছেন তিনি।
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সোহেল তাজের পদত্যাগ নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান অনেকের চেয়ে আলাদা। সোহেল তাজের শরীরে আওয়ামী রাজনীতির উত্তরাধিকার। জাতীয় চার নেতার একজন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শীর্ষ সংগঠক তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে তিনি। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক ডামাডোলে নিজেকে বিক্রি করেননি তাজউদ্দীন আহমদ। বিকৃত রাজনীতির ধিকৃত পথ বেছে নেননি তিনি। নিজের জীবন দিয়ে আদর্শের প্রতি অবিচল থেকেছেন। পিতার রাজনৈতিক ও আদর্শিক উত্তরাধিকার বহন করছেন যিনি, তাঁর এমন পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জাতিকে কিছুটা হলেও নাড়া দেয়। তা ছাড়া যখন নানা কারণে রাজনীতিকদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা বদ্ধমূল হচ্ছে, তখন অনেকটাই আশার আলো জ্বালিয়েছিলেন সোহেল তাজ। যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষা লাভ করা এই তরুণ রাজনীতিক নিজের যে স্বচ্ছ ইমেজ সৃষ্টি করেছিলেন তাতে রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সময় আসছে, এমন ধারণাটি অমূলক ছিল না। খোলা চিঠিতে সোহেল তাজ সে কথা উল্লেখও করেছেন। তিনি লিখেছেন মানুষকে নিয়ে তাঁর স্বপ্নের কথা। ক্ষমতা, অর্থ-সম্পদ, প্রতিপত্তির লোভে যে তিনি রাজনীতিতে আসেননি- সেটা উল্লেখ করেছেন তিনি। রাজনীতি করতে গিয়ে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করতে হয়েছে তাঁকে। বিদেশে বসবাস ও শিক্ষা লাভ করলেও দেশে ফিরে আসার পর সাদামাটা জীবন যাপন করেছেন। সাধারণ মানুষের পাশে থেকেছেন। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন দূর করতে চেয়েছেন। স্বপ্ন দেখেছেন একটি সুন্দর দেশের। কিন্তু নানা কারণে আশাহত হতে হয়েছে তাঁকে। তাঁর খোলা চিঠিতে সে কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটের নির্বাচনী ইশতেহার তাঁকে আশাবাদী করেছিল। একটি সুন্দর রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। খোলা চিঠিতে সোহেল তাজ উল্লেখ করেছেন, 'ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতি পরিহার করতে হবে। ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির রাজনীতি বাদ দিয়ে বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীনের মতো আদর্শের রাজনীতি করতে হবে।' একই সঙ্গে ব্যক্ত হয়েছে তাঁর আশাবাদ। খোলা চিঠিতে তিনি বলেছেন, 'আপনাদের সবার মতো আমিও তাকিয়ে আছি ভবিষ্যতের দিকে। হয়তো একদিন সুস্থ একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির মাধ্যমে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ হবে সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী একটি দেশ।'
সোহেল তাজ আওয়ামী পরিবারের সন্তান। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর নিজের ও তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠতার কথাও কারো কাছে অজানা নয়। ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের স্বচ্ছ ইমেজের কারণে দলে বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে এসেছেন তিনি। তাঁর মাধ্যমে আওয়ামী লীগে নতুন প্রজন্মের ইতিবাচক রাজনীতি শুরু হচ্ছে, এমনটি মনে করতেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল। কিন্তু প্রথমে মন্ত্রিসভা থেকে তাঁর পদত্যাগে অনেকেই হতাশ হয়েছিলেন। এখন সংসদ সদস্য পদ থেকে সরে দাঁড়ানোয় অনেকের শঙ্কা নেতিবাচক রাজনীতি নিয়ে। সোহেল তাজের খোলা চিঠিতে নেতিবাচক রাজনীতির কথা যেমন আছে, তেমনি আছে হতাশার কথা। প্রত্যাশিত পরিবর্তন সূচিত না হওয়াতেই এই হতাশা।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন করতে হলে সোহেল তাজের মতো মার্জিত রুচির প্রতিশ্রুতিশীল রাজনীতিকদের প্রয়োজন। দল ও সংসদ তাঁর ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। আমরা আশা করব সোহেল তাজ দেশের রাজনীতিতে ভূমিকা রাখবেন।

No comments

Powered by Blogger.