আন্তর্জাতিক-মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র শক্তির ডেমোক্রেসি এজেন্ডা by এম আবদুল হাফিজ

সিরীয় ইস্যুতে রাশিয়া ভেটো প্রয়োগ করলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন নিরাপত্তা পরিষদকে Neutered(নপুংসক) আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী বসতি স্থাপন করলে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবিত রেজ্যুলেশন (২০১১), যা নাকি ইসরায়েলিদের বসতিকে গুটিয়ে নিতে বলেছিল_ ভেটো দিয়েছিল।


যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদের ওই প্রস্তাবটিতেও ভেটো দিয়েছিল, যা ২০০৬ সালের গাজা সংঘর্ষে এবং লেবানন যুদ্ধে ইসরায়েলকে মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিল

জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সুজান রাইস মস্কো ও বেইজিংয়ের সিরিয়া সম্পর্কিত নিরাপত্তা পরিষদে মার্কিন প্রস্তাবে অসহযোগিতার জন্য তার সরকারের বিরাগ প্রকাশ করেছেন। উলি্লখিত প্রস্তাবে বাশার আল আসাদের উচ্ছেদ এবং সিরীয় সরকারের চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘন অবসানের কথা বলা হয়েছিল। পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ নিরাপত্তা পরিষদের অন্য ১৩টি অস্থায়ী সদস্যও প্রস্তাবটির পক্ষে রায় দিয়েছিল।
রাষ্ট্রদূত রাইস রাশিয়া ও চীনকে জাতিসংঘের প্রতি সবার নূ্যনতম এবং একমাত্র দায়িত্ব পালন, যা নাকি মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার তা বাধাগ্রস্ত করার জন্য উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ জানান। এ প্রসঙ্গে তিনি সিরিয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সমগ্র অঞ্চলের জন্য তার বিজড়িতকরণের (Implication) কথাও তুলে ধরেন। তিনি দুই স্থায়ী সদস্যের ভয়াবহ আপসহীনতা বা জেদের কড়া সমালোচনা করেন এবং সিরিয়ার ব্যাপারে তাদের অবস্থানকে লজ্জাকর অভিহিত করেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন, তাদের অন্যতম স্থায়ী সদস্য রাশিয়া বাশার আল আসাদকে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে।
রাশিয়া ও চীনের ভেটো প্রদানের পর রাষ্ট্রদূত রাইসের বক্তৃতা ও কথাবার্তায় জাতিসংঘের বৈধতা অবক্ষয়ে স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং অনেক ক্ষেত্রে তার মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে অনাগ্রহ, মধ্যপ্রাচ্যের স্বৈরশাসকদের জন্য মার্কিন নীতি এর যুক্তরাষ্ট্র প্রদত্ত ভেটোর খতিয়ান ইত্যাদির পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রদূতের সমালোচনা এবং মানবাধিকার দরদি সাজার কোনো নৈতিক অধিকারই নেই। তবু মার্কিনিদের দু\'মুখো নীতি সমানে অব্যাহত আছে। যদিও তা মানবিকতার মুখোশে এক প্রকার ভণ্ডামি।
রাষ্ট্রদূত রাইস চৌকস ভঙ্গিতে কী অবলীলায় বললেন আসাদের জন্য রুশ অস্ত্র সরবরাহের লজ্জাকরতার কথা। কিন্তু বিনা দ্বিধায় চেপে গেলেন বাহরাইনের কাছে ৫৩ মিলিয়ন ডলার মূল্যের অস্ত্র সরবরাহে ওবামা প্রশাসনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের কথা মার্কিন কংগ্রেসে এবং সুশীল সমাজে এই অস্ত্র সরবরাহের অটল বিরোধিতা সত্ত্বেও। এর আগে আল-খলিফা শাসনের প্রজাদের ওপর চড়াও হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্রের অনুরোধ ওবামার ভীতু প্রত্যুত্তরে সাফল্য পায়নি। ভূরাজনৈতিক গুরুত্ববিহীন বাহরাইনে গণতন্ত্রের স্বার্থেও কোনো বিনিয়োগে প্রস্তুত ছিলেন না ওবামা। অথচ এই বাহরাইনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নৌ সদর দফতর এবং এখান থেকেই হতে পারে মার্কিনিদের ইরানকে দমনের সূচনা।
একইভাবে এখন অবহেলিত মধ্যপ্রাচ্যের শাসকরা_ মিসরের হোসনি মোবারক, তিউনিসিয়ার বেন আলি, লিবিয়ার গাদ্দাফি এবং সিরিয়ার দুই পুরুষ ধরে আসাদরা, এরা সবাই কিন্তু নিয়মমাফিক পাশ্চাত্যেরই স্তাবক ছিলেন। এরা কেউ পশ্চিমের কিছু বৃহৎ শক্তির সমর্থন ছাড়া টিকতে পারতেন না। দৃষ্টান্তস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্র মোবারকের শক্ত সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষক ছিল এ কথা অবহিত থাকা সত্ত্বেও যে মোবারক একজন স্বৈরশাসক এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী। একইভাবে তার জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র তিউনিসিয়া এবং ইয়েমেনে অপশাসনকে সমর্থন দিয়েছিল। তাদের মনে করা হয়েছিল মার্কিন স্বার্থের কাঠামোতে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ। বিশেষ করে মার্কিনিদের মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাস দমন তৎপরতায় এই অপশাসকদের প্রয়োজন পড়েছিল। এই দেশগুলোয় গণতন্ত্রের লালন মার্কিনিদের জন্য ছিল অত্যন্ত গৌণ।
রাইসের সরকারও নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো কম প্রয়োগ করেনি। যে কোনো ইস্যু তাতে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য থাকা সত্ত্বেও তা ইসরায়েলের জন্য আপত্তিজনক হলে যুক্তরাষ্ট্র অনিবার্যভাবে ভেটো প্রয়োগ করেছে।
সিরীয় ইস্যুতে রাশিয়া ভেটো প্রয়োগ করলে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন নিরাপত্তা পরিষদকে Neutered(নপুংসক) আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী বসতি স্থাপন করলে যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবিত রেজ্যুলেশন (২০১১), যা নাকি ইসরায়েলিদের বসতিকে গুটিয়ে নিতে বলেছিল_ ভেটো দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদের ওই প্রস্তাবটিতেও ভেটো দিয়েছিল, যা ২০০৬ সালের গাজা সংঘর্ষে এবং লেবানন যুদ্ধে ইসরায়েলকে মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিল। উভয় ক্ষেত্রেই মার্কিন ক্রেডিবিলিটি দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, যখন তারা ইসরায়েলি অভিযানের নৃশংসতা, যাতে বেসামরিক ব্যক্তিরাই নিহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল দেখেও না দেখার ভান করেছিল।
এ ঘটনাগুলোই প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা পরিষদকে শুধু Neutered নয়, Theatre of absurd-এ পরিণত করেছে। রাষ্ট্রদূত রাইস বক্তৃতা মঞ্চ থেকে তার গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ে কথামালাকে যতই শ্রুতিমধুর করার চেষ্টা করুন না কেন, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে কবেই মার্কিনিদের গণতন্ত্রের আবেদন নিঃশেষিত হয়েছে। গণতন্ত্র বা মানবাধিকার সমুন্নত রাখার মার্কিন প্রয়াসে যত দিন না আন্তরিকতা ও দৃঢ়তার আভাস পাওয়া যাবে, এতদঞ্চলে সব মার্কিন প্রয়াস প্রতারণা ও ভণ্ডামিরূপেই প্রতীয়মান হবে।

ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম আবদুল হাফিজ : সাবেক মহাপরিচালক বিআইআইএসএস ও কলাম লেখক

No comments

Powered by Blogger.