যুক্তি তর্ক গল্প-আমরা কি হারিয়ে ফেলছি রসবোধ? by আবুল মোমেন

রাজনীতিতে সহনশীলতার অভাব নিয়ে সমাজের সব মানুষই সোচ্চার। সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা নেই—এমন সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয় বিশেষভাবে শেখ হাসিনাকে। এর কারণ খালেদা জিয়া রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হলেও কেবল দলের ও নিজের বক্তব্যেই অটল থাকেন। অনেকটা ভদ্রলোকের এককথার মতো।


কিন্তু শেখ হাসিনা যেকোনো রাজনৈতিক ইস্যুতে যেমন বক্তব্য দেন, তেমনি যেকোনো সমালোচনার জবাব দিয়ে থাকেন। সম্প্রতি লিখিতভাবেও দিয়েছেন। বাংলার ছাত্রী ছিলেন হাসিনা, ফলে রসিকতা তিনি বোঝেন, প্রয়োজনে ব্যঙ্গের হুল ফোটাতেও সক্ষম।
সাধারণত বলা হয় যাঁর মধ্যে রসবোধ আছে, তিনি সমালোচনা সহ্য করতে পারেন। তবে মানতেই হবে ইদানীং বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে রসবোধ হ্রাস পাচ্ছে। নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা করার মতো মানুষ একেবারেই কমে যাচ্ছে। একটু প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বলতে হয়, মানুষ জীবনকে ভোগ করতে গিয়ে জীবন উপভোগের সামর্থ্য হারিয়ে ফেলছে। ভোগের জন্য সব সময় জ্বালানি চাই, রিপুর ক্ষুধার জ্বালা মেটানো সহজ কথা নয়। উপভোগের ক্ষেত্রে কিন্তু উপচার নিজের আয়ত্তে থাকার কোনো শর্ত নেই। আকাশ, সমুদ্র, বৃষ্টি, গাছ কিংবা সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত-পূর্ণিমা অথবা রবীন্দ্র-নজরুল-লালনের গান, নয়তো জীবনানন্দ-জসীম-শামসুর রাহমানের কবিতা হলেই চলে যায়। ভোগীর চাহিদার যেমন শেষ নেই, তেমনি অভাব-অভিযোগেরও অন্ত নেই। উপভোগ যে করতে জানে, সে-ই পায় আনন্দের সন্ধান, নির্মল আনন্দের স্বাদ।
ভোগী মানুষ স্বার্থপর ও নিষ্ঠুর হয়, তুলনায় উপভোগ করতে জানা মানুষের মধ্যে উদারতা ও পরার্থপরতা থাকে। আমাদের সমাজে স্বার্থপরতা ও নিষ্ঠুরতা উভয়ই বাড়ছে। তার অর্থ ভোগসর্বস্বতা বেড়ে চলেছে। যারা ভোগের উপচার জোগাতে পারছে না, তারা মরিয়া হয়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। সমাজে অপরাধ বাড়ছে, ভোগের সঙ্গে যুক্ত অপরাধ।
সমাজকে ত্যাগের পথে নেওয়া কঠিন। একসময়, বিশেষ করে, স্বদেশি যুগে, বাঙালি সমাজে ত্যাগের মন্ত্রে বহু মানুষ উজ্জীবিত হয়েছিল। ষাটের দশকে এ দেশে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত মানুষ একাত্তরে এসে ত্যাগ ও বীরত্বের এক অনন্য গাথা রচনা করছে। সে আমাদের ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়।
তবু আমি বলব, ত্যাগও নয়, অধিকাংশ মানুষের জন্য প্রয়োজন জীবনকে উপভোগ করতে শেখা, জীবন উপভোগের আয়োজন করতে জানা চাই।
রবীন্দ্রনাথ একবার লিখেছিলেন, সব পশুর দৃষ্টি থাকে খাবারের দিকে। কোন সুদূর আকাশে ওড়ে চিল, কিন্তু সে আকাশ দেখে না, তার দৃষ্টি থাকে নিচের দিকে, খাবারের খোঁজে। তার জীবনের সব কাজ, সব শ্রম প্রধানত এই একটি কাজেই ব্যয় হয়। আজকে মানুষ খাদ্য আর আরাম-আয়েশের উপকরণ সংগ্রহে ও তা ভোগেই জীবনের সিংহভাগ সময় ব্যয় করছে। ধর্মকেও পরকালের জীবনে ভোগবিলাসে কাটানোর জন্য পুণ্যার্জনে বিনিয়োগ করছে। এভাবে ধর্মের মূল চেতনা যে ক্ষুণ্ন হচ্ছে, সেটা তারা খেয়ালই করে না।
ভয়ে ভয়ে বলি, এভাবে আমরা সমাজকে মানবের সমাজের স্তর থেকে কি নামিয়ে আনছি না? নরপশুর সমাজ সাধারণ পশুর সমাজের চেয়ে নিকৃষ্ট। কারণ পশু তার ধর্ম রক্ষা করেই চলে, মানুষ ব্যক্তিস্বার্থে ঘৃণ্য জঘন্য সব অপরাধ করতে সক্ষম। বাংলাদেশে যেভাবে ধর্ষণ, ধর্ষণের পরে হত্যা, মায়ের হাতে সন্তান, সন্তানের হাতে মা-বাবা, ভাইয়ের হাতে ভাই, বাবার হাতে পুত্র, স্বামীর হাতে বধূ খুন হচ্ছে, যেভাবে জমি, নদী, বন, পাহাড় দখল ও ধ্বংস করা হচ্ছে, যেভাবে দরিদ্রের সম্পদ লুণ্ঠন করা হচ্ছে, তাতে সমাজে মনুষ্যত্বের সংকট যে কত গভীর, তা সহজেই বোঝা যায়। এই সংকটের ভুক্তভোগী আমরা সবাই। সবাই জানি অনাবিল আনন্দে জীবন কাটানোর কোনো উপায় নেই। কিশোরীর জীবন হওয়ার কথা আনন্দের অফুরন্ত উৎস, কৈশোরকাল নিজেই তা সৃষ্টি করে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে বহু কিশোরী সবচেয়ে ভয়ংকর নিকষ কালো অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছে। এ দেশে কোনো কিশোরীই বোধহয় পায় না অনাবিল আনন্দের স্বাদ। নারীকে কেবল বন্দিজীবন নয়, ভয়ার্ত জীবন কাটাতে হচ্ছে। এই বাস্তবতা পুরুষদের জন্য লজ্জার, অপমানের। কিন্তু পুরুষের লজ্জা ও অপমানবোধ যেন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বেপরোয়া ভোগবাদী পুরুষ উন্মত্ত পশুর আচরণ করছে।
বেপরোয়া আচরণ মানেই হলো সীমা লঙ্ঘন। চতুর্দিকে সীমা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে চলেছে। যারা শক্তিমান, যাদের নীতিবোধ কাজ করে না, যারা কেবল স্বার্থবুদ্ধি দিয়ে চালিত হচ্ছে, তারা তাদের জীবন যাপন দিয়েই সমাজে টেনশন, অন্যায় ও সংকট সৃষ্টি করছে। এ রকম বাস্তবতায় সমাজের ঐতিহ্যগত অন্তর্নিহিত যে শুভবোধ ও সামর্থ্য থাকে, তা নষ্ট হয়ে যায়।
আর এ ধরনের জীবনে সবাই ব্যস্ত থাকে নিজের বিত্ত ও শক্তি বাড়ানোর কাজে। মানুষ এমন ব্যস্ত জীবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, যা আর মানবিক জীবন থাকে না। কেননা, কেবল বস্তুগত সম্পদ ও দেহজ ভোগে তো মানবজীবন পূর্ণতা পেতে পারে না। বাংলার এক অগ্রণী শিল্পী বলেছিলেন, ‘মানুষের সৃজনশীলতার চর্চার জন্য চাই ছুটির অবকাশ ও ছুটির দৃষ্টি।’ পৃথিবীকে ছুটির দৃষ্টিতে দেখার কথা বলেছিলেন তিনি। কিন্তু আমরা হয় ছুটিছাটা অবকাশ রাখছি না, নয়তো ছুটির নামে আবারও কেনাকাটা-খাওয়াদাওয়ার ব্যস্ততা ও ভোগে সময়টা কাটাচ্ছি। এভাবে ভোগে ও ব্যস্ততায় আচ্ছন্ন মন ক্রমেই সংবেদনশীলতা হারিয়ে ফেলতে থাকে। সুর, রং এবং জীবনের নানা রসদ ও রসের প্রতি মানব মনের যে সহজাত দুর্বলতা থাকার কথা, তা তথাকথিত সবলতার প্রবল অভিঘাতে হারিয়ে যায়, হারিয়ে যাচ্ছে। সংবেদনশীল মানুষ এ সমাজে কষ্টে আছে।
শুরু করেছিলাম রসবোধ ও সহিষ্ণুতার কথা দিয়ে। এই দুটো একটি সুস্থ পরিণত সমাজের দুই স্তম্ভ। শুরুতে রাজনীতিবিদদের কথা তুলেছি, শেখ হাসিনার কথা বলেছি। কিন্তু সমাজবাস্তবতার দিকে তাকাতে গিয়ে দেখছি আসলে সব ধরনের মানুষই রসবোধ হারিয়ে ফেলছে, বাঙালির বিখ্যাত সব আড্ডা, যার প্রধান উপচার হাস্যরস তা-ও তো বিলুপ্তির পথে। আমাদের শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনে সুস্থ সমালোচনার ধারা তৈরি হয়নি, হতে পারছে না। তার পেছনে এসব সৃষ্টিশীল মানুষের সমালোচনা ও বিতর্ক গ্রহণ করার মতো মনের অভাবই মূল কারণ। রসবোধের অভাবের কথাও বলব। এখানে বরং চলচ্চিত্র, নাটক, সাহিত্য, সংগীত—সব ক্ষেত্রেই একধরনের অসুস্থ সমঝোতার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। ফলে এ অঙ্গনেও জনসংযোগের দক্ষতাই খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার পথে মূল্যবান হয়ে উঠেছে।
মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমরা যেন সবকিছু নিয়েই ছেলেখেলা করছি। এর মধ্যে কেউ কেউ ছেলেমানুষের মতো তাদের শখ পূরণ করছেন। বাংলাদেশ যেন শখের দেশ, নানা জনের নানা রকম সাধ পূরণের দেশ। তাই খুব সহজে এখানে সেলিব্রেটি হওয়া যায়, যেকোনো ক্ষেত্র থেকে। যেহেতু প্রশ্ন নেই, যুক্তির বাণ নেই, প্রকৃত তর্ক-বিতর্ক হয় না, তাই গুছিয়ে কথা বলতে পারলেই নিজেকে প্রমোট করা সম্ভব। একটি অপক্ব শৌখিন সমাজেই কথায় চিড়ে ভেজে, কথা দিয়ে কাঁচা কাঁঠাল পাকানো যায়। কথায় ভুলিয়ে শিক্ষিত মানুষ, আধুনিক তরুণ, পুলিশ কর্তা, সেনাসদস্য—সবাইকে অজ্ঞান করে লুটপাটও করা যায়।
মুশকিল হচ্ছে এই ব্যবস্থায় যোগ্য মানুষেরাও লোক-ঠকানোর এই খেলায় নিজের অজান্তে অংশ নিয়ে ফেলেন। সারা দেশে সবখানে লোক-ভোলানো আর লোক-ঠকানোর এই যে খেলা চলছে, তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য সচেতন চেষ্টা না থাকলে এ চোরাবালিতে ডুবতে হবে সবাইকে। এ হবে স্বখাত সলিলে ডুবে মরা।
আমার একজন প্রিয় কবি ইয়েটস একবার রবীন্দ্রকবিতার আপাতসারল্য ও রোমান্টিকতায় বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। বন্ধুর ড্রয়িংরুমের দেয়ালে শোভা হিসেবে ঝোলানো হিস্পানি তরবারি কোষমুক্ত করে চিৎকার দিয়ে বলেছিলেন—‘চাই দ্বন্দ্ব, আরও দ্বন্দ্ব।’
দ্বন্দ্ব ছাড়া মানুষ এগোয় না, সমাজও না। ডায়ালেকটিকসের কথাটা মার্ক্স তুলেছিলেন। সমাজতন্ত্রের ভরাডুবির দিনেও বলি, সমাজে স্বার্থের দলাদলি নয়—বুদ্ধির ও যুক্তির লড়াই লাগবে। প্রশ্ন-করা মনের দ্বন্দ্ব চাই। প্রশ্ন, দ্বন্দ্ব, তর্ক এবং সুস্থ সমালোচনার শরনিক্ষেপের জন্য জায়গা চাই। ‘স্বার্থবুদ্ধি অথবা নির্বুদ্ধিতা মানুষকেও পালের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলে। এভাবে মানুষ ভেড়ার পালের মতো হয়ে ওঠে।’ বলেছিলেন জার্মান দার্শনিক স্পেংলার। এ রকম বাস্তবতায় ব্যক্তির কোনো সত্তা থাকে না, ভূমিকাও থাকতে পারে না। মানুষকে সমাজ গড়তে সহযোগিতা যেমন শিখতে হবে, তেমনি ব্যক্তি হিসেবে বড় হতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রও বুঝতে হবে। পরিমাণগত অগ্রগতির পাশাপাশি গুণগত অগ্রগতির হিসাব রাখতে হবে। নতুবা পরিসরে-পরিমাণে বড় হয়েও অকার্যকর হয়ে পড়তে হবে, পিছিয়ে থাকতে হবে। সুস্থ পরিণত সমাজের জন্য তৃতীয় স্তম্ভ এই প্রশ্ন-তর্ক-দ্বন্দ্বে তৈরি জঙ্গমতা।
সুস্থ, পরিণত মানুষের সমাজ গড়ে তোলার জন্য সহিষ্ণুতা, জীবনকে উপভোগ করার মতো রসবোধ এবং প্রশ্ন ও তর্ক-তোলা সক্রিয় সজীব মন চাই। রাজনীতিবিদসহ সমাজের সবখানেই এমন প্রাণশক্তির সঞ্জীবনী প্রয়োজন। যিনি রাজনীতিক, তিনি কাজটা পারবেন, তিনিই বর্তমান কালের বন্ধ্যাত্ব ঘুচাতে সক্ষম হবেন। তার জন্য অপেক্ষায় থাকে না সমাজ, অন্যান্য ক্ষেত্র থেকেও প্রাণবন্ততা ও উপভোগ্যতার প্রণোদনা তৈরি হতে পারে, যার পুঞ্জীভূত অভিঘাত রাজনীতি ও রাষ্ট্রেও এসে পড়বে।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.