বাংলাদেশে পরিবর্তনের চালচিত্র by মামুন রশীদ

আমরা আজকাল পরিবর্তনের পথেই হেঁটে চলেছি এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সেভাবেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। কিন্তু কিভাবে পরিবর্তনটা ঘটেছে কিংবা এরই মধ্যে কতটা পরিবর্তন সাধিত হয়েছে তা নিয়ে ভাবা কিংবা পেছন ফিরে তাকানোর মতো সময় যেন অনেকের হাতেই নেই।


তবুও চলুন, আমরা না হয় আজ 'মেমোরি লেন' বা 'স্মৃতির সড়ক' ধরে ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালের উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তন সম্পর্কে খানিকটা পর্যালোচনার চেষ্টা করি।
আলোচ্য সময়ে দেশে সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনটা হয়েছে টেলিযোগাযোগ খাতে। মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে গোটা বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ২১তম। বর্তমানে (এপ্রিল, ২০১১ পর্যন্ত) এ দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী গ্রাহকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাত কোটি ৪১ লাখ ৮৮ হাজার, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। শহর-গ্রাম, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ ও ছোট-বড় নির্বিশেষে এখন সমাজের সব শ্রেণীপেশার মানুষের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে এবং দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে মোবাইল ফোনের ব্যবহার। সিটিসেলখ্যাত প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড (পিবিটিএল) দেশের প্রথম অপারেটর হিসেবে লাইসেন্স পেয়ে ১৯৯২ সালের শেষ দিকে বাজারে মোবাইল ফোন ছাড়ে। এরপর গ্রামীণফোনসহ আরো কয়েকটি মোবাইল ফোন অপারেটর যাত্রা শুরু করে এবং এই খাতের দ্রুত বিকাশ ঘটতে থাকে। এতে অবশ্য ল্যান্ডফোনের বিকাশ থেমে যায়। ২০০৮ সালে ল্যান্ড টেলিফোনের গ্রাহকসংখ্যায় বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের ৬৭তম অবস্থানে। তখন টিঅ্যান্ডটির মোট গ্রাহক ছিল ১৪ লাখ। পরবর্তী দুই বছরেও টিঅ্যান্ডটির গ্রাহক বাড়েনি। মোবাইল ফোনের পাশাপাশি দেশে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের ব্যবহারও দিন দিন বাড়ছে।
দেশে বিনোদনের নতুন মাধ্যম হিসেবে বর্তমানে পাঁচটি এফএম রেডিও স্টেশনের কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া কেব্ল্ সংযোগ বা ডিশলাইনে রঙিন টিভির মাধ্যমে ১২টি বেসরকারি বাংলা স্যাটেলাইটসহ অসংখ্য বিদেশি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলের নানা ধরনের অনুষ্ঠান উপভোগের সুযোগ আছে। সেই সঙ্গে স্কাই ও ডিশ টিভি এখন মানুষের হাতের নাগালে, এমনকি পাড়ায়-মহল্লায়, হাটে-বাজারে এবং রাস্তার পাশে কিংবা গলিপথের ছোট্ট মুদি বা চা দোকানেও সারা দিনমান টিভি চলতে দেখা যায়। বিশেষ করে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর তরুণ ও যুব সম্প্রদায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে ফেসবুকের মতো বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের নেটওয়ার্কে ব্যস্ত এবং ভিডিও চ্যাটিং ও ইউটিউব ব্যবহারে মগ্ন থাকে।
২০ বছর আগে একজন সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীর দৈনন্দিন রুটিন ছিল অফিসে গিয়ে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করা। এরপর সোজাসুজি কিংবা টুকটাক বাজার করে ঘরে ফিরে যাওয়া, হালকা নাশতা-পানি বা জলখাবার খাওয়া এবং স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের অন্যদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো। আর গোটা সন্ধ্যা ও রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগের সময়টা ছিল একেবারে ফাঁকা বা কাজবিহীন। তখন কেউ গান শোনে, কেউবা বই পড়ে, আবার কেউ আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের বাসায় গিয়ে কাটাতেন। কিন্তু সেই চিত্র এত দিনে অনেকটাই বদলে গেছে। অনেক বহুজাতিক কম্পানির আগমনের পাশাপাশি স্থানীয় বেসরকারি কম্পানিগুলোর বিকাশ ঘটায় ও প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় গোটা পরিস্থিতিই যেন এখন নতুন রূপে আবির্ভূত, যেটাকে বলা হয় করপোরেট সংস্কৃতি। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটেছে। বদৌলতে কাজের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। অফিসে গিয়ে যেমন নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হয়, তেমনি বাসায় বসে কিংবা ট্রাফিক জ্যামে দীর্ঘ সময় আটকা পড়লে গাড়িতে বসে ল্যাপটপের সাহায্যেও অনেক কাজ শেষ করে ইন্টারনেট তথা ই-মেইলে তা পাঠিয়ে দেওয়া যায়। আর বিকেল-সন্ধ্যায় ইন্টারনেটে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক নেটওয়ার্কিংয়ে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডায় মেতে ওঠাটাও এখন চাকুরেদের কাছে নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে উঠেছে।
দেশের নারীরা এখন আর তথাকথিত ধর্মীয় ও সামাজিক রক্ষণশীলতার দেয়ালে আটকে নেই। তাঁরাও এখন ক্ষমতায়নের সুযোগ পেয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছেন। একদিকে গ্রামীণ নারীদের একটি বড় অংশ ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে উপার্জনমুখী আর্থিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়াচ্ছেন এবং পরিবারে সচ্ছলতা আনয়নে কমবেশি অবদান রাখছেন। অন্যদিকে শহরে দিন দিন অধিকসংখ্যক মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত লেখাপড়া করছেন, কেউ কেউ পড়াশোনা করতে বিদেশেও যান এবং অতঃপর করপোরেট জগতে যোগ দেন। সব মিলিয়ে তরুণ প্রজন্মের নারী তথা মেয়েদের মধ্যে গতানুগতিকতার হাত ধরে নিছক গৃহবধূ হয়ে থাকার চেয়ে নিজেদেরও কিছু একটা করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। নারীরা এভাবে কর্মমুখী হয়ে ওঠায় অফিস সময়ে তাঁদের শিশু-সন্তানদের যত্ন নেওয়া ও পরিপালনের জন্য গড়ে উঠছে 'ডে কেয়ার সেন্টার'। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন অলাভজনক সংগঠন (এনপিও) আর বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গার্মেন্ট থেকে শুরু করে উচ্চপদে আসীন কর্মজীবী মায়ের শিশুদের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে। যাঁরা স্বামী-স্ত্রী দুজনেই চাকরিজীবী তাঁদের মধ্যে মাঝেমধ্যে বাইরে অর্থাৎ হোটেল-রেস্তোরাঁ কিংবা ফাস্টফুডের দোকানে গিয়ে খাওয়ার প্রবণতাও তৈরি হচ্ছে। এদিকে নারীদের কেউ কেউ অনেক সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জেনেশুনে কিংবা অজ্ঞতাবশত তাঁদের স্বামী বা পরিবারের পরিবর্তে কোনো সহকর্মী বা বসদের পরামর্শকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন বলে শোনা যায়!
পরিবহনের ক্ষেত্রে রিকশার জায়গাটি দখল করে নিয়েছে মোটরযানগুলো। ২০১০ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএতে এক লাখ ৯৮ হাজার ৪৩৯টি মোটরগাড়ির রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৬০ শতাংশ মোটরগাড়ির রেজিস্ট্রেশন হয় ২০০৩ সাল পর্যন্ত। আর বাকি ৪০ শতাংশ গাড়ির রেজিস্ট্রেশন হয় ২০০৪-১০ সালের মধ্যে। দেশের ভেতরে ও বাইরে বিমানে চড়ে ভ্রমণের প্রবণতাও বেশ কয়েকগুণ বেড়েছে। ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে এ দেশে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি ও বেসরকারি তিনটি ছাড়াও ১৫টি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা বিমান পরিচালনা করছে।
দেশের কমপক্ষে ২৭ শতাংশ মানুষ এখন শহরে বাস করে। সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ ছুটছে রাজধানী শহর ঢাকায়। বিশ্বব্যাংক তো রীতিমতো ঢাকাকে 'বিশ্বের সর্বোচ্চ হারে জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধির শহর' হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে প্রতিবছর নতুন করে পাঁচ লাখ মানুষ যোগ হয়। তবে এই শহরের মানুষ তাঁদের ব্যস্ততম জীবনে মুক্ত বাতাসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে বাংলা নববর্ষ তথা পহেলা বৈশাখ ও পহেলা ফাল্গুনের উৎসবে, অনুষ্ঠানে ছুটে যায়। সামাজিক পরিবর্তনের সুবাদে এখন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে মাশরুমের চাষ হচ্ছে, নারী ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি হচ্ছে হোস্টেল, গড়ে উঠছে কমিউনিটি সেন্টার, বিনোদনকেন্দ্র ও পার্ক, বিউটি পার্লার, রিসোর্ট, জিমনেসিয়াম প্রভৃতি (যদিও এর বেশির ভাগের গুণ ও মান নিয়ে প্রশ্ন আছে)। এ ছাড়া শেয়ারবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ এবং ব্যাংকগুলোতে অ্যাকাউন্ট বা হিসাবের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
বলে রাখা ভালো, গত দুই দশকে বাংলাদেশের সব কিছুতে কিন্তু পরিবর্তন হয়নি। যেমন_জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি এখনো আগের মতোই রয়ে গেছে। শিক্ষার মানও তেমন বাড়েনি। পরিবহন খাতে যানবাহনের সংখ্যা বাড়লেও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তথা যাত্রীদের ভোগান্তির অবসান ঘটেনি। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালা গ্রহণ করা হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোও এখনো হরতালের মতো ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি পরিত্যাগ করতে পারেনি, যা গোটা জনজীবনসহ ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ক্ষতিকর। গত ২০ বছর দুটি প্রধান দলের দুই নেত্রী জাতীয় ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে 'মুখোমুখি' বসেননি। সরকারি প্রশাসনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও লালফিতার দৌরাত্ম্য এখনো প্রায় আগের মতোই রয়ে গেছে। যা-ই হোক, দেশে এখনো এত নেতিবাচক দিক থাকলেও আমরা আশা করি একদিন না একদিন পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। ইতিবাচক পরিবর্তনে আমাদের প্রিয় দেশটা হয়ে উঠবে প্রভূত সম্ভাবনাময়। কারণ পরিবর্তন হলো বিশ্বজুড়ে নিত্যপ্রত্যাশিত একটি চলমান প্রক্রিয়া, দেশের উন্নয়ন ও সমাজ প্রগতির জন্য যেটির কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : ব্যাংকার ও অর্থনীতির বিশ্লেষক

No comments

Powered by Blogger.