দেনায় ডুবে যাচ্ছে বিমান-আবার বড় হোক তার পৃথিবী

আকাশে শান্তির নীড়' রচনা ছিল বিমানের লক্ষ্য। পৃথিবীকে ছোট করে আনার চেষ্টা ছিল। সে চেষ্টায় কখনো সাফল্য আসেনি তা নয়। কিন্তু এখন সে শান্তির নীড় গুটিয়ে গেছে। ছোট হয়ে গেছে বিমানের পৃথিবী। জাতীয় পতাকাবাহী রাষ্ট্রীয় এ সংস্থাটি এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে। বিমানকে লাভজনক একটি প্রতিষ্ঠান করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে কম্পানি করা


হয়েছিল। ছাঁটাই করা হয়েছিল বিমানের লোকবল। প্রশাসনিক অদক্ষতা আর দুর্নীতি বিমানকে আকাশ থেকে নামিয়ে এনেছে মাটিতে। গুটিয়ে গেছে বিমানের পৃথিবী। আর সাম্প্রতিক খবরটি হচ্ছে বিমান এখন দেনার দায়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে। দিনে দিনে দেনার পরিমাণ বেড়েছে। অথচ বিমান যে লাভ করতে পারে তার উদাহরণ আছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে বিমান লাভ করেছিল ১৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এই লাভ বেড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল ৬৫ কোটি ২৫ লাখ টাকায়। পরের বছরই আবার লোকসান। এখন সে প্রতিষ্ঠান দেনার দায়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে।
মানতে হবে, বিমানে কখনো কোনো শৃঙ্খলা কাজ করেনি। উড়োজাহাজ কেনা বা ভাড়া নেওয়া থেকে শুরু করে উড়োজাহাজের খুচরা যন্ত্রাংশ কেনা-সব কিছুতেই দুর্নীতি হয়েছে। দুর্নীতি করতে গিয়েই গুটিয়ে নেওয়া হয়েছে একের পর এক বিমানের রুট। একসময় প্রায় ৩০টির মতো আন্তর্জাতিক রুটে চলাচল করত বিমান। বন্ধ হয়ে গেছে নিউ ইয়র্ক, নারিতা, নাগোয়া, এথেন্স, ত্রিপোলি, ব্রাসেলস, ম্যানচেস্টার, ইয়াঙ্গুন, মুম্বাই, প্যারিস, ফ্রাংকফুর্ট ও আমস্টারডাম ফ্লাইট। ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিউ ইয়র্ক, নারিতা, প্যারিস রুটের অনুমতি বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে। স্থগিত আছে ব্যাংকক ও দিলি্ল ফ্লাইট। একের পর এক ফ্লাইট বন্ধ করতে করতে বিমানের ব্যবসা এখন প্রায় সবই চলে গেছে অন্য ফ্লাইট অপারেটরদের দখলে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা থেকে পাবলিক লিমিটেড কম্পানিতে রূপান্তরিত হওয়া বাংলাদেশে এয়ারলাইনস যেখানে ছিল, এখনো সেখানেই রয়ে গেছে।
অনেকটা গোত্তা খেয়ে মাটিতে পড়ার দশা বিমানের। একসময় বিমানের বিজ্ঞাপনের স্লোগান ছিল, 'ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী'। এখন আক্ষরিক অর্থেই বিমানের পৃথিবী ছোট হয়ে গেছে। আর বিমানের সেই গুটিয়ে নেওয়া পৃথিবীতে প্রবেশ করছে অন্য ফ্লাইট অপারেটররা। আর তা হচ্ছে শুধু দক্ষতার অভাবে। অদক্ষতার পাশাপাশি দুর্নীতি যে বিমানকে খেয়ে ফেলেছে, এটাও নতুন কোনো তথ্য নয়। অদক্ষতার পাশাপাশি দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতি-এসবের ভেতর দিয়ে একসময়ের সম্ভাবনাময় বিমানকে একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হচ্ছে।
সারা বিশ্বে যখন সব এয়ারলাইনসের ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়েছে, বিমান কম্পানিগুলো যখন বিভিন্ন রুটে তাদের ফ্লাইট বাড়িয়েছে, সেখানে ফ্লাইট অপারেশন বন্ধ করে দিতে অনেকটাই বাধ্য হয়েছে বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বা বিমান। দুর্নীতিবাজদের চাতুর্য, অদক্ষ প্রশাসন, সিদ্ধান্তহীনতা আর উড়োজাহাজ সংকট বিমানকে ঠেলে দেয় লোকসানের মুখে। ঢাকার জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশ ফ্লাইট অপারেটরদের ফ্লাইট আগের চেয়ে বেড়েছে। অন্যদিকে কমেছে বিমানের ফ্লাইট। শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে যাত্রী হয়রানি বেড়েছে। আর ব্যবসা চলে গেছে অন্য ফ্লাইট অপারেটরদের কাছে। ১৯৯৭ সালে যেখানে ঢাকা থেকে যাতায়াতকারী যাত্রীদের ৯৭ শতাংশ বিমানে যাতায়াত করত, সেখানে ২০০৮ সালে এসে সেটা ৩০ শতাংশে দাঁড়ায়।
এভাবে চলতে দেওয়া যায় না। একটি সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। বিমানকে আবার উড়তে দিতে হবে আকাশে। প্রয়োজন আন্তরিকতা ও দেশাত্মবোধ। দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করলে বিমান আবার আকাশে উড়বে সগৌরবে।

No comments

Powered by Blogger.