অমর একুশে-কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জাদুঘর ও লাইব্রেরি by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাবগম্ভীর পরিবেশ বজায় রাখা ও মিনারের পাশে একটি জাদুঘর ও লাইব্রেরি স্থাপনের জন্য হাইকোর্ট আবার সংস্কৃতি ও পূর্ত মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। (১৩ ফেব্রুয়ারি) হাইকোর্ট এর আগেই এসব কাজ সম্পন্ন করার জন্য পূর্ত ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু দুটি মন্ত্রণালয়ই তা বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।


ফলে হাইকোর্ট সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে কোর্টে তলব করেছেন। হাইকোর্ট আরও নির্দেশ দিয়েছেন: শহীদ মিনারের মূল বেদিতে যেন কোনো অনুষ্ঠান বা সভার আয়োজন করা না হয়। (ডেইলি স্টার, ১৪ ফেব্রুয়ারি)
হাইকোর্টের এই নির্দেশ পূর্ত ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কীভাবে ও কখন বাস্তবায়ন করে, তা দেখার জন্য আমরা অপেক্ষায় রইলাম।
কিন্তু এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য হাইকোর্টের নির্দেশের অপেক্ষা করতে হলো কেন? সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমী ইত্যাদি কর্তৃপক্ষ কেউ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নিয়ে তেমন ভাবেনি। বহুল সমালোচিত স্বৈরাচারী এরশাদই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের কিছু সংস্কার করেছিলেন। তা-ও অসম্পূর্ণ সংস্কার। তবু এক ধরনের সংস্কার হয়েছিল।
শহীদ মিনারের মূল বেদিতে অনুষ্ঠান বা সভা নিষিদ্ধ করার হাইকোর্টের আদেশ অনেককে ক্ষুব্ধ করতে পারে। কারণ আমাদের অনেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারকে প্রায় নিজের ঘরবাড়ি বানিয়ে ফেলেছেন। এই বেদির যে একটা বিরাট গুরুত্ব ও পবিত্রতা রয়েছে, তা অনেকেই বিস্মৃত হয়েছেন। শহীদ মিনারের পটভূমিতে বেদির নিচে অনায়াসে অনুষ্ঠান বা সভার আয়োজন করা যায়। এতে সভা বা অনুষ্ঠানের গুরুত্বের কোনো তারতম্য হবে না।
আমরা বিষয়টি আরও বিস্তৃত করার পক্ষপাতি। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আমাদের আবেগ, চেতনা, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের প্রতীক। এর চত্বরটা খুব ছোট নয়। পাশেও বিস্তৃত জায়গা। এই চত্বরটি ঘিরে আরও কিছু কাজ করার সুযোগ রয়েছে। যেমন, রাজধানী ঢাকার যত পথসভা, মানববন্ধন, অনশন ধর্মঘট হয়ে থাকে সব জাতীয় প্রেসক্লাবের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে করা যেতে পারে। জাতীয় প্রেসক্লাব একটি যানবহুল রাস্তার পাশে অবস্থিত। সেখানে পথসভা ও মানববন্ধন করলে যান ও মানুষের চলাচলে অসুবিধা হয়। তার প্রভাব পড়ে ঢাকার বহু রাস্তায়। এমনিতে যানজটে রাজধানীর মানুষ নাকাল হয়ে পড়েছেন। তার ওপর অত মিছিল, পথসভা ও মানববন্ধনে যানজট আরও বেড়ে যায়। অথচ এসব কর্মসূচি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে করলেও হয়। নানা ধরনের কর্মসূচি হতে থাকলে শহীদ মিনার এলাকাটি প্রায় সারা দিন প্রাণবন্ত থাকবে। শহীদ মিনার চত্বরকে আমরা ঢাকার ‘হাইড পার্ক’ হিসেবেও গড়ে তুলতে পারি।
শহীদ মিনারের পাশে একটি লাইব্রেরি ও জাদুঘর করার জন্য হাইকোর্টের নির্দেশটিও প্রশংসাযোগ্য। যেটা প্রশংসাযোগ্য নয়, সেটা হলো—এই স্থাপনা তৈরির জন্য আদালতকে নির্দেশ দিতে হয়েছে। আমাদের এত ভাষাপ্রেমী প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয় কেউ এ পদক্ষেপ স্বউদ্যোগে এত বছরে নিতে পারেনি। অনুষ্ঠান করা ও বক্তৃতা দেওয়ার ব্যাপারে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা কেউ পিছিয়ে নেই। কিন্তু দুটি গঠনমূলক কাজের উদ্যোগ নিতে তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন।
‘না হওয়ার চেয়ে বিলম্বে হওয়াও ভালো।’ এখন হাইকোর্টের নির্দেশে যদি পূর্ত ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় শেষ পর্যন্ত লাইব্রেরি ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়, তাহলে দেশবাসী তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।
কিন্তু হাইকোর্ট তো শুধু কাজটি সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন। লাইব্রেরি বা জাদুঘরটি কেমন হবে, তা তো বলেননি। এটাও একটা সমস্যা। শুধু মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ওপর ভরসা করলে লাইব্রেরি বা জাদুঘর যথার্থ হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট’ নামে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে কয়েক বছর আগে। এখনো এ প্রতিষ্ঠানের কাজ কী হবে—তা সরকার ঠিক করতে পারেনি। কিন্তু সুন্দর বিল্ডিং তৈরি হয়েছে। উদ্বোধনও হয়েছে। কিন্তু কাজ ঠিক হয়নি। এটাই হচ্ছে সরকারি কাজের নমুনা।
দেখা যাবে পূর্ত মন্ত্রণালয় লাইব্রেরি ও জাদুঘরের বিল্ডিং তৈরি করে দিয়েছে। কিন্তু সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বই দিতে পারেনি বা জাদুঘরের উপাদান দিতে পারেনি। বই বা জাদুঘরের উপাদান তো টেন্ডার দিয়ে পাওয়া যায় না।
আমাদের প্রস্তাব: এখনই জাদুঘর ও লাইব্রেরির জন্য দুটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হোক। যারা জাদুঘর ও লাইব্রেরি কেমন হবে, সে ব্যাপারে মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেবে। আমরা মনে করি, লাইব্রেরিটি শুধু বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলন (১৯৪৯, ১৯৫২) সংক্রান্ত বইপত্র, প্রামাণ্যচিত্র, (সিডি) ও আলোকচিত্রে সমৃদ্ধ থাকুক। লাইব্রেরি বা জাদুঘরে একটি বিক্রয়কেন্দ্র থাকাও জরুরি। যেখানে ভাষা আন্দোলনবিষয়ক বইপত্র, পোস্টার, সিডি, শহীদ মিনারের মিনি রেপ্লিকা, ভিউকার্ড, স্মরণিকা ইত্যাদি বিক্রির জন্য পাওয়া যাবে। বিক্রয়কেন্দ্রকে বাদ দিয়ে যেন জাদুঘর ও লাইব্রেরি করা না হয়।
বিদেশিদের কাছে ঢাকার স্মারক পরিচিতি হিসেবে ‘রিকশার’ মডেলটি খুব আদৃত হয়েছে। রিকশা নিঃসন্দেহে একটি ভালো প্রতীক। কিন্তু আমাদের মনে হয়, ঢাকার জন্য রিকশার চেয়ে আকর্ষণীয় প্রতীক হতে পারত শহীদ মিনারের মডেল। ‘আড়ং’ বা কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এত বছরেও সেই চেষ্টা করেনি। কোনো প্রতিষ্ঠান সেই চেষ্টা করে দেখতে পারে।
ভাষা আন্দোলনবিষয়ক জাদুঘরে কী কী থাকতে পারে, তা মোটামুটি অনেকেই ধারণা করতে পারেন। জাদুঘর বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে উপযুক্ত পরামর্শও দিতে পারবেন। আমাদের সৌভাগ্য, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী অনেক নেতা ও নেতৃস্থানীয় কর্মী এখনো আমাদের মধ্যে রয়েছেন। জাদুঘরের জন্য তাঁরা হয়তো অনেক কিছু দিতে পারবেন।
এই প্রজন্মের অনেকে হয়তো জানেন না, বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি শিল্পী হামিদুর রহমানের মূল পরিকল্পনার পুরোপুরি বাস্তবায়ন নয়। শিল্পীর পরিকল্পনায় আরও অনেক কিছু ছিল। এখন যা দেখা যায় তা শুধু মূল কাঠামো। মূল পরিকল্পনায় মিনারের সামনে একটি চোখের আদলে ফোয়ারা (সারাক্ষণ অশ্রু নির্গত হবে), দেয়ালচিত্র, লাইব্রেরি, শিল্পী নভেরা আহমদের ভাস্কর্য ইত্যাদি অনেক কিছুই থাকার কথা, যা কখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শহীদ মিনার বিষয়ে শিল্পী হামিদুর রহমানের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেওয়ার। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বিস্তারিত পরিকল্পনার কথা আমাকে জানান। সঙ্গে দিয়েছিলেন শহীদ মিনারের মূল মডেলের ও দেয়ালচিত্রের ফটোগ্রাফ। মূল মডেলটি তার পেঁচিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। তাঁর এ দুর্লভ সাক্ষাৎকার ১৯৭১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক পাকিস্তান (পরে দৈনিক বাংলা)-এর বিশেষ শহীদ দিবস সংখ্যার শেষ পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিল। কবি আহসান হাবীব (বিশেষ সংখ্যার সম্পাদক) এই সাক্ষাৎকারের শিরোনাম দিয়েছিলেন: ‘শিল্পীর কল্পলোকে মহান মিনার।’ এই সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ পরে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ও মোস্তফা জব্বার তাঁদের বইয়ে উদ্ধৃত করেছিলেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় শহীদ মিনার নিয়ে কিছু করার চিন্তা করলে ওই সাক্ষাৎকার থেকে অনেক তথ্য জানতে পারবে।
স্বাধীনতার ৪০ বছরেও আমরা আমাদের প্রিয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারকে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনায় বাস্তবায়ন করতে পারিনি। এটা আমাদের সবার ব্যর্থতা। বিশেষ করে ’৯০-পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর ব্যর্থতা। কারণ গণতন্ত্র, মাতৃভাষা, সংস্কৃতি, আত্মত্যাগ, দেশপ্রেম সবকিছুর প্রতীক শহীদ মিনার। সেই শহীদ মিনার এত অবহেলায় থাকতে পারে না।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে একটি লাইব্রেরি ও জাদুঘর স্থাপনের জন্য হাইকোর্টের নির্দেশ এবার বাস্তবায়িত হবে আশা করি।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: উন্নয়ন ও মিডিয়াকর্মী।

No comments

Powered by Blogger.