চারদিক-হাওরের জল-জলসায়

মেঘলা আকাশ। চারদিকে আবছা অন্ধকার। অন্ধকারেও হাওরের জলে মৃদুমন্দ ঢেউয়ের খেলা দেখছি। কখনো চোখে ভাসছে দূরের গ্রাম। মনে হয় এগুলো গ্রাম নয়, জলের বুকে হিজল-করচার ছোট ছোট বাগ। হাওর কখনো শান্ত, আবার কখনো বাতাসে ঢেউ বাড়ে। ছোট-বড় ঢেউ ছাপিয়ে চলছে আমাদের নৌকা।


নৌকার ছাদ থেকে সুর তুলছেন বাউল বশির উদ্দিন। তাঁকে ঘিরে জনা বিশেক তরুণ। সবাই নাচে-গানে মশগুল। গভীর রাতের নীরবতা ভেঙে মনমাতানো সুর আছড়ে পড়ছে হাওরের জলে-ঢেউয়ে।
হাওরের জলে রাতের এই জলসার আয়োজন করেছেন একদল তরুণ। তরুণদলে আছেন স্কুল-কলেজের শিক্ষক, কবি, সংবাদকর্মী। তবে জলসার মূল উদ্যোক্তা জগন্নাথপুর উপজেলার শাহজালাল মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষক এনামুল কবীর। খবরটি আমাকে দিয়েছিলেন কবি শামস শামীম। আমরা সুনামগঞ্জ শহর থেকে মোটরবাইকে যাব দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ডুংরিয়া বাজারে। সেখান থেকে সারা রাতের জন্য নৌকা ভাসবে হাওরে। সেই অনুযায়ী গত বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা সাতটার দিকে জেলা শহর থেকে আমি, শামস শামীম, সাংবাদিক এমরানুল হক চৌধুরী আর কবি রাজীব চৌধুরী শান্তিগঞ্জ বাজারে পৌঁছাই। সেখান থেকে আবার টেম্পোতে করে ২০ মিনিট সময় লাগে ডুংরিয়া বাজারে যেতে। গিয়ে দেখি, সিলেট থেকে এসেছেন কবি মালেকুল হক, আহমদ জুনায়েদ ও আবু তাহের তারেক। দিরাই উপজেলা থেকে আগেই এসে হাজির হয়েছেন বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের অন্যতম ভাব-শিষ্য বাউল বশির উদ্দিন সরকার ও তাঁর সঙ্গী আরেক বাউল নজরুল ইসলাম রানা। রাত সাড়ে আটটায় নৌকা ভাসে সাংহাই হাওরে। তবে আমাদের মূল গন্তব্য দেখার হাওর। সুনামগঞ্জে যে কয়টি বড় হাওর আছে, তার একটি এই দেখার হাওর। জেলার অন্যতম ধানি হাওর এটি। চারটি উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত এই হাওরে ২৪ হাজার হেক্টর জমি রয়েছে। আফসোস, তখনো রাতের আকাশে চাঁদের দেখা নেই। মেঘের ফাঁকে ফাঁকে তারার লুকোচুরি দেখা যাচ্ছে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরছে থেমে থেমে। নৌকায় পরিচয় হলো, কবি আলফ্রেড আমেন, শিক্ষক সঞ্জয় তালুকদার, বেণু মজুমদার, নাড়ু দাস, সুধা মজুমদার, ব্যাংকার মাহবুব, এনজিওতে কর্মরত মোস্তফাসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে। নৌকা চলছে। নিজের মতো করে গান গাইছেন একজন। কেউ কবিতা আবৃত্তি করছেন। আবার হাওরবিলাসের এই মুগ্ধতা প্রিয়জনকে জানাতে একটু আড়ালে গিয়ে মুঠোফোনে কথা বলছেন কেউ কেউ। আমি ভাবি, এই জল-জলসা থেকে রাতে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। পেটে দারুণ ক্ষুধা। ভোজনের কোনো বন্দোবস্ত আছে কি না খোঁজ করতে নৌকার ভেতর তাকাই। আহ্! নিশ্চিন্ত। বিশাল আয়োজন। মোরগ-পোলাওয়ের সঙ্গে একটি কলার কাঁদি আর গাছের ফালির মতো বড় বড় কয়েকটি ব্রেডও চোখে পড়ল।
আমাদের নৌকাটি যখন সাংহাই হাওর থেকে বিশাল দেখার হাওরে পড়ে, তখন সাড়ে রাত ১১টা। চারদিক কিছুটা ফরসা হয়ে উঠেছে। দেখার হাওরের রূপ দেখতে সবাই নৌকার ছাদে উঠলাম। চারদিকে শুধু জল আর জল। পুবালি বাতাসে মন-প্রাণ জুড়িয়ে যাচ্ছে। কোথাও কেউ নেই। নৌকার পেছন দিক থেকে গলা ছেড়ে কেউ একজন গেয়ে উঠল, ‘বন্ধু রে, কই পাবো সখী গো/ সখী আমারে বলো না...।’ আরেকজনের আহাজারি শুনি, ‘তুমি বিনে আকুল পরান/ থাকতে চায় না ঘরে রে/ সোনা বন্ধু ভুইল না আমারে রে...’। এরপর বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বসেন বাউল বশির উদ্দিন সরকার। তিনি শুরু করেন তাঁর গুরু শাহ আবদুল করিমের ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম...’ গান দিয়ে। শাহ আবদুল করিমের গান ছাড়াও শুনলাম বাউল কামাল উদ্দিন, কফিল উদ্দিন সরকার, আমির উদ্দিন ও মসরু পাগলের গান। রাত বাড়ছে। দেখার হাওরের রূপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর ফাঁকে সিলেট থেকে কবি মোস্তাক আহমাদ দীন এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষক কবি জফির সেতু মুঠোফোনের খুদেবার্তা পাঠান সবার উদ্দেশে। একসময় নৌকার ইঞ্জিন থেমে যায়। নেচে-গেয়ে হাওর দেখে মনের ক্ষুধা মিটল, এবার পেঠের ক্ষুধা নিবারণের পালা। সবাই একসঙ্গে রাতের খাবার সেরে নিলাম। গান-কবিতা আর গালগল্প আবার শুরু হলো। কারও চোখে ঘুম নেই। নেই বাড়ি ফেরার তাড়া।
রাত তিনটায় এনামুল কবীর ঘোষণা করলেন, আলোচনা হবে। বাউলদের প্রতি নানা অবহেলা আর বঞ্চনার কথা খানিকটা অনুযোগের সুরে বললেন বশির উদ্দিন সরকার। এরপর আলোচনার গতি চলে সেদিকেই। আলোচনায় উঠে আসে সাহিত্য-সংস্কৃতি আর রাজনীতিও। মোস্তফা বললেন, ‘আমি সাগরপারের মানুষ। সাগরের রূপ আমার চেনা, কিন্তু হাওরে এই প্রথম। আমি হাওরের রূপ দেখে মুগ্ধ।’ রাজীব চৌধুরী স্মরণ করলেন সুনামগঞ্জের জ্যোৎ স্নাপ্রিয় কবি প্রয়াত মমিনুল মউজদীনকে। কবি জুনায়েদ বললেন, ‘সবাই যখন ঘুমের রাজ্যে, তখন আমরা একদল তরুণ হাওরে। আমরা রাতের নির্জনতায় শুদ্ধতা আর ভালোবাসা খুঁজলাম। হয়তো নিজেদের খুঁজেছি।’ রাতের বয়স আর বেশি নেই। এবার আমরা জল থেকে মাটিতে পা দিলাম। বাড়ি ফেরার পালা। বাড়ি ফিরে ঘরের দরজায় যখন কড়া নাড়ি, তখন রাত সাড়ে চারটা। মুঠোফোনে একটি খুদেবার্তা প্রবেশের শব্দ শুনি। পাঠিয়েছেন এনামুল কবীর। তাতে লেখা, ‘জীবনটা ভালোবাসা দিয়ে তৈরি। সেটাই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায়।’
খলিল রহমান
প্রথম আলোর সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

No comments

Powered by Blogger.