কালের পুরাণ-গণতন্ত্র, বাংলাদেশি স্টাইল! by সোহরাব হাসান

বহু মত ও পথের সম্মিলনে গণতন্ত্র পরিপূর্ণতা লাভ করে। এখানে একক সিদ্ধান্তের কোনো স্থান নেই।’১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল হামিদের বাণী।পাঠক, মাননীয় স্পিকারের বক্তব্যের সঙ্গে আমাদের দেশের প্রায়োগিক গণতন্ত্রের মিল খুঁজতে গেলে প্রথমেই হোঁচট


খাবেন। কেননা বাংলাদেশি (এই একটি ব্যাপারে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে কোনো ফারাক নেই) গণতন্ত্রের সংজ্ঞা হলো, দ্বিমত বা ভিন্ন মত থাকা চলবে না। নেতা-নেত্রীরা যা বলবেন, সেটাই বিনা প্রশ্নে, বিনা বাক্যব্যয়ে মানতে হবে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নয়, সিদ্ধান্তও হতে হবে একক। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর যে এই পরিণতি হবে, সে কথা কি কমিটির সদস্যরা দলীয় নেত্রীর সঙ্গে পরামর্শের আগে ভাবতে পেরেছিলেন? পারেননি। তাঁরা কিল হজম করেছেন।
বাংলাদেশের তথাকথিত গণতন্ত্র পূর্ণতা পেয়ে আসছে বহু পথ ও মতের সম্মিলনে নয়, একক সিদ্ধান্ত ও নির্দেশে। এরপর অনুগামীরা ‘আহ্, বেশ বেশ’ বলে জয়ধ্বনি দেন, প্রতিপক্ষ ‘সব গেল, সব গেল’ বলে মাতম তোলে। এবং প্রতি পাঁচ বছর পর একবার ভোট হয়, নেতা-নেত্রীদের ভূমিকা ও আসন বদল হয়। সংসদে বাঁয়ের নেত্রী ডানে গিয়ে বসেন, ডানের নেত্রী বাঁয়ে। এরই নাম গণতন্ত্র, বাংলাদেশি স্টাইল।
জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০০৭ সাল থেকে সারা বিশ্ব ১৫ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস পালন করে আসছে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল, ‘নাগরিকেরা তাঁদের সংসদ থেকে কী প্রত্যাশা করেন?’ এ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনে আয়োজিত সেমিনার শেষ হয় দুই পক্ষের সাংসদদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মাধ্যমে। স্পিকার বলেছেন, জাতীয় স্বার্থে অন্যের মতকে গুরুত্ব দিন। কিন্তু সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা অন্যের মত শুনতেই রাজি নন। সরকারি দল বলেছে, বিরোধী দল সংসদে না এসে বেতন-ভাতা নিচ্ছেন, এটি ভারি অন্যায়। বিরোধী দল বলছে, একই কাজ আপনারাও করেছেন।
ধারণা করি, বাংলাদেশকে লক্ষ্য করেই এবারের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে। দেশের মানুষ গণতন্ত্রের ভবিষ্য ৎ নিয়ে চিন্তিত হলেও নেতা-নেত্রীরা ঘোরের মধ্যে আছেন। কে কাকে কীভাবে ঠেকাবেন, সেই কৌশল আঁটছেন। একটি দেশের সংসদ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারছে কি না, তা নির্ভর করে সেই সংসদে জনগণের অভাব-অভিযোগ, সমস্যা-সংকট বা সম্ভাবনা নিয়ে কতটা আলোচনা হয়, তার ওপর। ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে শুরু হওয়া এ সংসদের অধিকাংশ অধিবেশনে বিরোধী দল অনুপস্থিত ছিল। সরকারি দল নিশ্চয়ই বলবে, সংসদকে অকার্যকর করতেই তারা এ পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সংসদে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, এর দৃষ্টান্ত নেই। সংসদে সর্বাধিক আলোচিত ও আলোড়িত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়েছে মাত্র কয়েক ঘণ্টার আলোচনায়। সরকারি দলের সুবিধামতো আইন পাস করা এবং বিরোধী দলের সুবিধামতো সংসদ বর্জন করা এখন দেশের দ্বিদলীয় গণতন্ত্রের অলিখিত রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

২.
‘রাজনীতিতে শেষ কথা নেই’ বলে একটি কথা চালু আছে। এর অর্থ এই নয় যে একটি দল ক্ষমতায় যাওয়া এবং থাকার জন্য তার সব নীতি ও আদর্শ বুড়িগঙ্গার ময়লা পানিতে বিসর্জন দিতে হবে। আমরা এক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আরেক রাজনৈতিক দলের পার্থক্য করি কিসের ভিত্তিতে? নিশ্চয়ই নেতা-নেত্রী-কর্মী ও ক্যাডারদের চেহারা দেখে নয়। আলাদা করি, দলের গঠনতন্ত্র, ঘোষণাপত্র, নীতি-আদর্শ ও কর্মসূচির ভিত্তিতে। আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপির পার্থক্যটিও দেখা হয় নীতি ও আদর্শের আলোকেই। কিংবা ধরুন, কমিউনিস্ট পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে কীভাবে আমরা পার্থক্য করব? নিশ্চয়ই নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে। কমিউনিস্ট পার্টি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিশ্বাসী আর জামায়াতে ইসলামী বিশ্বাস করে, ইসলামি হুকুমতে।
আওয়ামী লীগ বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে, মুখে হলেও নিজেদের অসাম্প্রদায়িক দল বলে দাবি করে। বিএনপির আস্থা সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে তৈরি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে। আওয়ামী লীগ সংবিধানের সর্বশেষ যে সংশোধনী এনেছে, তাতে জিয়ার বিসমিল্লাহ এবং এরশাদের রাষ্ট্রধর্ম বহাল রেখেও ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র শব্দটি পুনঃস্থাপন করেছে। দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন, আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে তাঁরা বাহাত্তরের সংবিধান অবিকল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন। আওয়ামী লীগ নিজেকে বিএনপি থেকে আধুনিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে দাবি করে। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের নিয়ে মহাজোট করেছে (বিষফোড়ার মতো এরশাদের জাতীয় পার্টিও তার অন্তর্ভুক্ত)। নেতারা বলবেন, বিএনপি ঐক্য করেছে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোটের সঙ্গে। আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে, বিএনপি বিচার ঠেকিয়ে রাখতে ত ৎপর। তাঁদের দাবি, আওয়ামী লীগ জনতার মধ্য থেকে উঠে এসেছে এবং বিএনপির জন্ম সেনা ছাউনিতে। আওয়ামী লীগ জঙ্গিদের দমনে বদ্ধপরিকর, আর বিএনপি জঙ্গিদের সঙ্গে আঁতাত করে দেশকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এসব দাবি ও অভিযোগ অনেকাংশেই সত্য।
কিন্তু গত বুধবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত ‘বিএনপি ভাঙতে ত ৎপরতা’ শিরোনামের খবরটি বিএনপির সমর্থকদের চেয়ে আওয়ামী লীগের সমর্থক-কর্মীদেরই বেশি লজ্জায় ফেলেছে। সরকারে যে মন্ত্রীরা পত্রিকায় খবর দেখলেই উষ্মা প্রকাশ করেন, তাঁরাও চুপ। তাহলে রহস্যটা কী?
আলাপ প্রসঙ্গে একজন প্রবীণ সাংবাদিক বললেন, বিএনপি তো ভেঙেই আছে। সেটি আর ভাঙবে কী? যে দল গত এক বছরে একজন মহাসচিব নিয়োগ দিতে পারেনি, সেই দল অটুট আছে, বলা যায় না। বিএনপির প্রতিবাদ মিছিল বা মানববন্ধনে প্রায়ই হাতাহাতি-মারামারির ঘটনা ঘটছে। কোনো কর্মসূচিতে ‘ক’ গ্রুপের নেতা গেলে ‘খ’ গ্রুপের নেতা যান না। কর্মীরা চেয়ার ছোড়াছুড়ি করে সভা পণ্ড করে দেন, পুলিশের প্রয়োজন হয় না। বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে যতজন সদস্য আছেন, দলে ততটি উপদল আছে! বিভক্ত বিএনপিকে সরকার বাইরে থেকে ভাঙার চেষ্টা কেন চালাচ্ছে, তা বোধগম্য নয়। বিএনপি বলেছে, দলীয় সরকারের অধীনে তারা কোনো নির্বাচনে যাবে না। বিএনপিকে ভাগ করেই কি নির্বাচন করতে হবে? আওয়ামী লীগের ক্ষমতা থাকলে বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচন করুক। আর বিএনপির তাগদ থাকলে সেই নির্বাচন ঠেকাবে। দল ভাঙাভাঙির কী প্রয়োজন?
ভাঙা-গড়ারই মহড়া চলছে রাজনীতিতে। আদর্শের ঐক্য নয়, ক্ষমতার ঐক্য, বিরোধিতার জোট। ঈদের আগে বিএনপির নেতৃত্ব যেসব দল বা নেতার সঙ্গে সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদার করতে বৈঠক করেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই সাবেক বিএনপি। তাঁরা জিয়া ও খালেদা জিয়ার বিএনপিতে ছিলেন। কিন্তু তারেক রহমানের বিএনপিতে স্বস্তি বোধ না করে কিংবা অপমানিত হয়ে দল ত্যাগ করেছিলেন। এখন তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে আবার বিএনপির সঙ্গে ঐক্যের চেষ্টা চালাচ্ছেন। খালেদা জিয়াও নানা উপদলে বিভক্ত নেতাদের সামাল দিতে পারছেন না। নয়াপল্টনে যাঁরা তারেক রহমানের মুক্তির দাবিতে মিছিল করছেন, তাঁরাও জানেন না, তিনি কবে দেশে এসে দলকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন? এতে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী হতাশ, নিষ্ক্রিয়।
এ রকম ভঙ্গুর ও দিগ্ভ্রান্ত বিরোধী দল নিয়েও যদি ক্ষমতাসীনেরা দুশ্চিন্তায় থাকেন, ভাবতে হবে তাঁরা দেউলিয়া হয়ে গেছেন। প্রথম আলোর খবরটির তা ৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সরকার বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা করছে। জবাবে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আওয়ামী লীগ দল ভাঙার বা ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করে না। মির্জা ফখরুল খানিকটা আগ বাড়িয়ে আওয়ামী লীগের বঞ্চিত ও ক্ষুব্ধ সাংসদদের বিএনপির সঙ্গে হাত মেলাতে বলেছেন। তাঁর এই আহ্বান আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের বহুলালোচিত ৩০ এপ্রিলের ট্রাম্পকার্ডের কথা মনে করিয়ে দেয়। সে সময়ে নাকি বিএনপির ১০০ সাংসদকে ভাগিয়ে নিয়ে সরকারের পতন ঘটানোর চেষ্টা হয়েছিল। এবার মির্জা সাহেব কার ইঙ্গিতে আওয়ামী লীগ সাংসদদের বিএনপি শিবিরে টানার আহ্বান জানাচ্ছেন? নতুন কোনো ট্রাম্পকার্ড?
বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা সফল হবে না বিফল হবে, এই মুহূর্তে সেই রায় দেওয়া যাবে না। তবে এই খবর ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দুই দলের দেউলিয়াপনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিপুল ভোটে জয়ী আওয়ামী লীগকে আড়াই বছরের মাথায় বিএনপির দিকে হাত বাড়াতে হচ্ছে। আর বিভক্ত বিএনপির নেতাদের মধ্যকার সন্দেহ-অবিশ্বাস আরও প্রকট হবে। এত দিন দলটিতে দুটি ধারা ছিল—সংস্কারপন্থী ও খালেদাপন্থী। এখন আরও একটি ধারা যুক্ত হলো, ক্ষমতাপন্থী।

৩.
আওয়ামী লীগ নিজেকে বরাবর মুক্তিযুদ্ধের চ্যাম্পিয়ন ও গণতন্ত্রের সিপাহশালার দাবি করে। এখন সেই দলটি কী করে একাত্তরের ‘পাকিস্তানি এজেন্ট’ জিয়াউর রহমানের বিএনপি ভাঙার চেষ্টা করছে? কেবল তা-ই নয়, বিএনপির কারাবন্দী এমন একজন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে, যাঁর বিরুদ্ধে একাত্তরে মানুষ খুনের গুরুতর অভিযোগ আছে। সেই কারাগারে আওয়ামী লীগের কোনো নেতার যাওয়ার কথা নয়। তাহলে কাদের মাধ্যমে যোগাযোগ হচ্ছে? কারারক্ষী না গোয়েন্দা বাহিনী?
ওবায়দুল কাদের বিএনপির নেতাদের ইমান পরীক্ষার কথা বলেছেন। উইকিলিকসের মাধ্যমে যেসব তথ্য বেরিয়ে আসছে, তাতে ইমানের পরীক্ষায় আওয়ামী লীগও খুব ভালো অবস্থানে আছে, বলা যাবে না। দুই দলের বড় নেতাদের ইমান পরীক্ষা ২০০৭ সালেই হয়ে গেছে। ইমান মজবুত থাকলে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসতে পারত না। তিনি আরও বলেছেন, আওয়ামী লীগ বন্ধু বাড়াতে চায়। কিন্তু সেই বন্ধু যদি ইয়াহিয়া খানের ভাবশিষ্য হন, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী হন, তাঁর সঙ্গেও আপসরফা করতে হবে?
সারা দেশে আওয়ামী লীগের বিশাল কর্মী বাহিনী আছে। তারা নিজেদের মতো করে সংবিধান সাজিয়েছে, সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন সাজিয়েছে, উপজেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের ভূত তাড়িয়েছে; তার পরও কেন জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে পারছে না? এখনো দেশ-বিদেশে বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগের বন্ধুর সংখ্যা বেশি। কারণ, দলটির জঙ্গি ও সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান। কিন্তু একটি সাফল্য নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। মানুষের নিত্যদিনের সমস্যার সমাধান না করতে পারলে, শেয়ারবাজারের ধস ঠেকাতে না পারলে এবং দলীয় সন্ত্রাস ও দুর্নীতি রোধ করতে না পারলে দল ভাঙা-গড়ার কোনো কৌশলই কাজে আসবে না।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.