সরল গরল-উচ্চ আদালত কি প্রজাতন্ত্রের বাইরে? by মিজানুর রহমান খান

বাংলা ভাষার বিকৃতি ও ভাষা দূষণ বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগের একটি রুল সম্প্রতি গণমাধ্যমে বড় খবর হয়েছে। ১৯৪৮ সালে জিন্নাহর কণ্ঠে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণার দিন থেকেই এ দেশের মানুষের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছিল উল্লেখ করে আদালত বলেন, ‘পৃথিবীতে বাংলাই একমাত্র ভাষা, যার জন্য মানুষ রক্ত দিয়েছে।


পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম দৃষ্টান্ত আর দ্বিতীয়টি নেই। সুতরাং এ ভাষার পবিত্রতা আমাদের রক্ষা করতে হবে।’
এটা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, এই সুপ্রিম কোর্টে বাংলা নেই। সেই সুপ্রিম কোর্টে উর্দু নেই। জিন্নাহর পাকিস্তানে এবং বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টে উর্দু ও বাংলা প্রবেশ করতে পারেনি। পাকিস্তান ও ভারতে বহু ভাষাভাষী। ভারতের কোনো জাতীয় ভাষা নেই। উপরন্তু উভয় দেশের সংবিধানে আদালতের ভাষা হিসেবে ইংরেজিকে নির্দিষ্টভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানে ইংরেজিকে স্বীকার করা হয়নি। উপরন্তু সংবিধানে বলে দেওয়া হয়েছে, সংবিধানের একটি অনুমোদিত পাঠ থাকবে বটে। কিন্তু বাংলা ও ইংরেজি পাঠের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে বাংলা প্রাধান্য পাবে।
পাকিস্তানের ১৯৫৬-র সংবিধানের ২১৪ অনুচ্ছেদে বলা হলো, ‘দি স্টেট ল্যাংগুয়েজেজ অব পাকিস্তান শ্যাল বি উর্দু অ্যান্ড বেঙ্গলি।’ তবে এর শর্তাংশে যা বলা হলো, তাতে মনে হয়, রাষ্ট্রভাষা মানে করা হয়েছিল জাতীয় ভাষা। দেশের দুই অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষার স্বীকৃতি মাত্র, শাসনকার্যের ভাষার স্বীকৃতি নয়। কারণ, শর্তাংশে লেখা হয়েছিল, ‘আগামী ২০ বছরের জন্য সকল সরকারি কাজে ইংরেজি অব্যাহত থাকবে। এরপর সংসদ আইন করে ঠিক করবে কোন কোন ক্ষেত্রে ইংরেজি ব্যবহার করা হবে। দশ বছর পর রাষ্ট্রপতি ইংরেজি প্রতিস্থাপনের সুপারিশ দিতে একটি কমিশন গঠন করবেন। তবে প্রাদেশিক সরকার চাইলে এই ২০ বছরের আগে যে কোনো রাষ্ট্রভাষা দিয়ে ইংরেজি প্রতিস্থাপন করতে পারবে।’
এরপর ১৯৬২-র সংবিধানের ২১৫ অনুচ্ছেদে উর্দু ও বাংলা কিন্তু রাষ্ট্রভাষা নয়, জাতীয় ভাষার মর্যাদা পেল। তার মানে, শাসনগত ভাষার মর্যাদা তারা কেউ পেল না। অফিস-আদালতে-সংসদে ইংরেজি চলায় যাতে বিঘ্ন না হয়, সে কথা স্পষ্ট বলা হলো। এখন তাদের ২৫১ অনুচ্ছেদটি একটি আত্মপ্রবঞ্চনা। সেখানে লেখা, উর্দু যাতে সরকারি ও অন্যান্য উদ্দেশে ব্যবহার করা সম্ভব হয়, সে জন্য সংবিধান আরম্ভের দিন থেকে ১৫ বছরের মধ্যে দরকারি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তার আগ পর্যন্ত ইংরেজি চলবে। কিন্তু ইংরেজিই চলছে। ভারতের সংবিধানের ৩৪৮ অনুচ্ছেদ বলে দিয়েছে, আদালতের ভাষা হবে ইংরেজি। ভারতের প্রয়াত প্রধান বিচারপতি ওয়াই ভি চন্দ্রচুদ বলেছিলেন, ‘আমি আদালতে হিন্দি প্রচলনে প্রচণ্ড বিরোধী। সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্টের রায় হিন্দিতে চলবে না। কারণ, এসব আদালতের বিচারকেরা সারা ভারত থেকে আসেন। তাঁরা হিন্দির সঙ্গে পরিচিত নন।’ ২২টি সরকারি ভাষার দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলনীয় বা প্রাসঙ্গিক নয়।
এই দুঃখ, পরিহাস ও লজ্জা আমরা কোথায় রাখব, বাংলা ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার ৪০ বছর পরও উচ্চ আদালতে মাতৃভাষার প্রবেশাধিকার নিয়ে তেমন কোনো আওয়াজ শোনা যায় না। মাদ্রাজ হাইকোর্টে তামিল ভাষা চালুর দাবিতে অনশন হয়, ঢাকার হাইকোর্টে বাংলার দাবিতে যেন একটি কণ্ঠও উচ্চকিত নয়। কোনো কোনো বিচারক দয়াপরবশ হয়ে বাংলায় রায় লিখে প্রমাণ দিচ্ছেন যে, বাংলায় রায় লেখা অতটা কঠিন নয়।
হাশমতউল্লা বনাম আজমিরি বিবি মামলায় বিচারপতি এ আর এম আমিরুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি এ এম মাহমুদুর রহমান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ১৯৯১ সালের ২৮ নভেম্বর বাংলা ভাষাবিরোধী একটি রায় দিয়েছেন। এতে রাষ্ট্রভাষা থেকে ‘আদালতের ভাষা’কে বিচ্ছিন্ন করে দেখা হয়েছে। বাংলাদেশ সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। সংবিধানের সঙ্গে অন্য যে কোনো আইন বা বিধি থাকুক না কেন, তা অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বাতিল বলে গণ্য হবে। সুপ্রিম কোর্ট তাঁর একাধিক মাইলফলক রায়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেন, জাতীয় সংসদ সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা সংঘাতপূর্ণ কোনো আইন বা বিধান পাস করতে পারে না। কিন্তু যে সত্য তেমন উচ্চারণ করা হয় না, সেটা হলো সুপ্রিম কোর্টও সংবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সুপ্রিম কোর্টের পক্ষেও সংবিধানের সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি করে কোনো রায়ের ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আলোচ্য রায়টিতে কার্যত তেমনই একটি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ইংরেজিতে লেখা সুপ্রিম কোর্টের মান্ধাতা আমলের বিধানগুলো বাংলা করার কোনো উদ্যোগ নেই। কোনো প্রধান বিচারপতি আজ পর্যন্ত প্রশাসনিক দায় অনুভব করেছেন বলে জানা যায় না। অথচ ভাষা বুঝতে পারা বা না-পারার সঙ্গে কখনও জড়িয়ে থাকে বিচারপ্রার্থীর মানবাধিকার ও তাঁর বঞ্চনার প্রশ্নও।
হাইকোর্ট ১৯৯১ সালের ওই মামলায় বলেন, ‘আমরা তিনটি পরিভাষা দেখতে পাচ্ছি। রাষ্ট্রভাষা, সরকারি ভাষা এবং আদালতের ভাষা।’ এ ধরনের বিভাজন আদালতের কল্পনাপ্রসূত। আদালতের কথায়, ‘রাষ্ট্রভাষার অর্থ হলো, রাষ্ট্রের সকল কার্যক্রম অর্থাৎ নির্বাহী, আইন বিভাগ, বিচারিক প্রভৃতি বিষয়ে ব্যবহূত ভাষা। সরকারি কার্যক্রম যে ভাষায় চলবে, তা সরকারি ভাষা। আদালতের কার্যক্রম যে ভাষায় চলবে, তাই ‘আদালতের ভাষা’। এই তিনটি পরিভাষার মধ্যে ‘আদালতের ভাষা’ সংকীর্ণতম।
১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইনটি সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদের আওতায় প্রণীত হয়েছে। হাইকোর্ট এই পর্যায়ে সবচেয়ে অদ্ভুত যুক্তিটি দাঁড় করান এই বলে যে, ‘আদালতের ভাষা’ যেহেতু সংকীর্ণতম, তাই ‘রাষ্ট্রভাষা’ বলতে ‘আদালতের ভাষা’ বোঝাবে না। অথচ, ১৯৮৭ সালের ওই আইনটিতে এ ধরনের কোনো ফারাক বা পরিভাষা সৃষ্টি করা হয়নি। এমনকি উচ্চ ও নিম্ন আদালত বলেও আইনটিতে কিছু নেই। কিন্তু কী আশ্চর্য, হাইকোর্ট ওই আইনের আদালত শব্দের মানে করেছেন নিম্ন আদালত। তাঁদের কথায়, অধস্তন আদালতের ভাষা কী হবে, সেই অর্থে এটি বুঝতে হবে। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে আদালতের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এতে আদালত মানে শুধু অধস্তন আদালত বোঝায়নি। নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, এতে সুপ্রিম কোর্টও অন্তর্ভুক্ত।
হাইকোর্ট আরও গুরুতর ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি বাংলা ভাষা প্রচলন আইনটি একটি সাধারণ আইন। কিন্তু সিপিসি বা সিভিল প্রসিডিউর কোড একটি বিশেষ আইন। যেটি অধস্তন দেওয়ানি আদালত কীভাবে চলবে, তা বর্ণনা করা আছে।
প্রথমত, ১৯৮৭ সালের আইনটিই বিশেষ আইন। ১৯০৮ সালের সিপিসিই বরং সাধারণ আইন। তা ছাড়া এটি শুধু অধস্তন নয়, উচ্চ আদালতের জন্যও প্রযোজ্য। সবচেয়ে বড় যুক্তি সিপিসি বা অন্য কোনো বিদ্যমান আইন বা তার অধীনে কোনো বিধিতে যদি ইংরেজির কথা বলাও থাকে, তাহলে এখন তা বাংলাদেশ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আইন ও বিধির চোখ রাঙানিতে সংবিধানের ভয় পাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।
১৯৮৭ সালের বাংলা ভাষা প্রচলন আইনে বলা আছে, ‘এই আইন প্রবর্তনের পর বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সাথে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং আইনানুগ কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে। উল্লেখিত কোনো কর্মস্থলে যদি কোনো ব্যক্তি বাংলা ভাষা ব্যতীত অন্য কোনো ভাষায় আবেদন বা আপিল করেন, তাহলে তা বেআইনি ও অকার্যকর বলে গণ্য হবে।’ হাইকোর্টের ওই রায় ও তার পর্যবেক্ষণ বাংলা ভাষার ওপর একটি বাধা। একটি আঘাত। ১৬ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চের সঙ্গে সুর মিলিয়ে অনেকেই বলবেন, ‘এই ভাষার ওপর আজ বলাৎকার চলছে। আমাদের জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই অনতিবিলম্বে এটা রোধ করতে হবে।’
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই স্লোগানের ৬০তম বার্ষিকীতে আমাদের স্লোগান বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে বাংলা চাই। গত ৪০ বছরে আমাদের চারটি রায়ও বিদেশি কোনো সুপ্রিম কোর্ট উদ্ধৃত করেছে কি না, সন্দেহ। সুতরাং যাঁরা পরিভাষার ঘাটতি বা বিদেশিদের চাহিদার কথা বলেন, তাঁরা যেন বুঝেশুনে যুক্তি দেন।
ভাষাদূষণ রোধে বাংলা একাডেমীর সভাপতি আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে যে কমিটি গঠনের আদেশ হাইকোর্ট দিয়েছেন, যদি সরকার সত্যি সত্যি কমিটি করে, তাহলে তারাও এ বিষয়ে মনোযোগী হতে পারেন। যদিও গত দুই দশকে এই রায় নিয়ে উচ্চবাচ্য করা হয়নি, তবুও এটি এখনো শুধরে নেওয়ার সুযোগ রয়ে গেছে।
পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের পরিচালনা বিধির একটি সংশোধিত ইংরেজি ভাষ্যের খসড়া অবশেষে চূড়ান্ত করা হয়েছে। শুনেছি, এটি অনুমোদনের জন্য শিগগিরই রাষ্ট্রপতির কাছে যাচ্ছে। আর এতে কিনা নতুন এক বিধানের প্রস্তাব করা হচ্ছে, ফলে উচ্চ আদালতে ইংরেজি নতুন করে স্বীকৃতি পাবে। বাংলায় রায় লিখতে উচ্চ আদালতের জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে না। সংবিধান-পরিপন্থী এ ধরনের সব পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ভাষাসৈনিকদের সরব হওয়ার এখনই সময়। দরকার হলে উচ্চ আদালতের জন্য একটি নতুন আইন করতে হবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.