স্মরণ-(রাধারমণ দত্ত : ধামাইল গীত রচয়িতা)

শ্যাম কালিয়ার রূপে আমায় পাগল করল গো...। আনমনে গানের এই চরণটি আওড়াতে অনেককেই দেখেছি। কিন্তু আমরা অনেকেই এই গানের স্রষ্টা যে রাধারমণ দত্ত তা জানি না। রাধারমণ দত্ত লোকান্তর হওয়ার সাল নিয়ে মতভেদ আছে। অধিকাংশ গবেষকের মতে, তাঁর মৃত্যু তারিখ ২৬ কার্তিক, ১৩২২ বাংলা সন। সাধক কবি রাধারমণ দত্ত তাঁর জীবদ্দশায় সহস্রাধিক গীতিকবিতা (গান) লিখেছেন। লিখেছেন কয়েক শ ধামাইল গান। ধামাইল এমন এক গান, যা সমবেত নারীকণ্ঠে বিয়ের অনুষ্ঠানে গীত হয়। বিশেষত সিলেট অঞ্চলে একসময় এর প্রচলন খুব বেশি ছিল।


ধামাইল গান ছাড়া বিয়ের অনুষ্ঠান পূর্ণতা পেত না। প্রতি গ্রামে ধামাইল গান গাওয়ার জন্য সংঘবদ্ধ মহিলা থাকতেন। বাড়ির মা-কাকিরাও ধামাইল গান জানতেন। ধামাইল গাওয়ার রীতি অন্য গান থেকে কিছুটা ভিন্ন। মেয়েরা ঘরের ভেতর কিংবা বাড়ির উঠোনে গোল হয়ে প্রথমে দাঁড়ান। তারপর একজন গান শুরু করলে অন্যরাও কণ্ঠ মিলিয়ে হাততালি দিতে দিতে গোলাকার বৃত্তের মতো নেচে নেচে চক্কর দিয়ে দিয়ে গান গেয়ে যান। একটি গান শেষ হলে দলের মধ্য থেকে কোনো একজন নতুন আরেকটি গান শুরু করেন। বিয়ের তিন-চার দিন আগ থেকেই এভাবে বিয়েবাড়িতে ধামাইল গান চলত। সময় পাল্টেছে। বিয়েবাড়িতে ধামাইল গানের কদর আর আগের মতো নেই। তার পরও যেটুকু আছে তাতে রাধারমণ দত্তের গানই বেশি গাওয়া হয়। কিন্তু রাধারমণ দত্তকে বর্তমান প্রজন্ম কতটুকু চেনে কিংবা কতটুকু জানে? সেই জানান দেওয়ার জন্য তাঁর ৯৬তম মৃত্যুদিবসে একটু পরিচিতি তুলে ধরা হলো। রাধারমণ দত্তের জন্ম-সন নিয়ে মতভেদ আছে। গবেষক যতীন্দ্র মোহন ভট্টাচার্য ও বিজন কৃষ্ণ চৌধুরীর লেখায় জন্ম-সন ১২৪০ বাংলা। তিনি জন্মেছেন সুনামগঞ্জ জেলার তৎকালীন আতুয়াজান পরগণার কেশবপুর গ্রামে। ১২৫০ বাংলা সনে মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হন। বিয়ে করে তিনি সংসারিও হয়েছিলেন। কিন্তু একে একে তাঁর তিন ছেলে অকালে মারা যায়। রাধারমণ দত্তের বয়স যখন ৫০ তখন তিনি মৌলভীবাজার জেলার ইটা পরগণার ঢেউপাশা গ্রামের বৈষ্ণব সাধক রঘুনাথ ভট্টাচার্যের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি সংসারত্যাগী হন। বৈষ্ণব ভাবধারায় আকৃষ্ট হয়ে সুনামগঞ্জের নলুয়া হাওরের এক নির্জন স্থানে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে তিনি ধ্যানস্থ অবস্থায় গীত রচনা করতেন, সুর করতেন এবং গাইতেন। তাঁর ভক্তরা এসব গীত গেয়ে গেয়ে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেন। জানা যায়, সাধক রাধারমণ দত্ত ও মরমি কবি হাছন রাজার মধ্যে যোগাযোগ ছিল। রাধারমণ ছিলেন হাছন রাজার ২০ বছরের বড়। রাধারমণের একটি গানের চরণ এ রকম : হাছন রাজা তুমি কেমন, রাধারমণ জানতে চায়। উত্তরে হাছন রাজা গানের চরণ বাঁধেন : রাধারমণ তুমি কেমন, হাছন রাজা দেখতে চায়। রাধারমণের ধামাইল গীত সংগ্রহ ও তা প্রচারের জন্য রামকৃষ্ণ সরকার নামে শ্রীমঙ্গলের এক উদ্যমী যুবক দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তিনি জানান, রাধারমণের অনেক গান অন্যের নামে চলছে। অনেক গান ইতিমধ্যে বিকৃত হয়ে গেছে। এসব গান আমাদের লোকসংগীতের বিরাট ভাণ্ডার। এদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে। তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি।
আবদুল হামিদ মাহবুব

No comments

Powered by Blogger.