জন্মদিন-বারবার আসুক ফিরে এই দিন আরও অনেক বছর by আলী যাকের

কটা সময় ছিল যখন আপনার নন্দিত নরকে আমাকে শঙ্খনীল কারাগারের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল এবং তারপর আকৃষ্ট করেছিল আপনার আরও অনেক সৃজনশীল লেখার প্রতি। এরপর তো ইতিহাসই বলে দেবে যে, বহুব্রীহি, আজ রবিবার, ঈদ ভেকেশান এবং আরও সব অবিস্মরণীয় নাটক এক সেতুবন্ধ রচনা করেছিল নাট্যকার আর এই অভিনেতার মাঝে।এসব ভুলি কী করে?শুভ জন্মদিন, হুমায়ূন। বৃশ্চিক রাশির জাতকেরা সাধারণত একরোখা হয়, গোঁয়ার হয়, ক্রুদ্ধ হয়_ এ কথাগুলো শুনে এসেছি তাদের মুখে, যারা রাশিচক্র নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন। আমিও বৃশ্চিক রাশির জাতক। একই মাসে আমাদের উভয়ের জন্ম। আমি জন্মেছি আপনার থেকে ঠিক ৭ দিন আগে, ৬ নভেম্বর।


অতএব, রাশিচক্রের বিধান অনুযায়ী আমাদের স্বভাব একই রকম হওয়ার কথা। কিন্তু আমি ভালো করেই জানি যে, রাশিচক্র যা বলে, বাস্তবতা সব সময় তার সঙ্গে হাতে হাত রেখে পথ চলে না। সে জন্যই আপনি এমন সৃজনশীল এক শিল্পী, আর আমি নিতান্তই ভান করি সৃজনশীলতার পথে চলার। অবশ্য বৃশ্চিক রাশির জাতকেরা কেবল যে সৃজনশীল হন পাবলো পিকাসোর মতো তা-ই নয়, তারা নেতৃত্বও দেন একেবারে সবার সামনে থেকে। যেমন দিয়েছিলেন শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী। আপনার মধ্যে উভয় গুণের সমাবেশ ঘটেছে এবং সে জন্যই আপনি আপামর বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে একটি স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। তাদের হৃদয়ে লেখা হয়ে গেছে আপনার নাম, অনপনেয় কালিতে, যা কখনোই মোছা যাবে না।
সম্প্রতি আপনার সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাৎ হতো কদাচিৎ। কেননা, আমাদের তারুণ্যের সেই দিনগুলোতে, যখন আপনি ছিলেন আমার অনুজপ্রতিম বন্ধুর মতো, তখন যদিও আমরা এক উদ্দাম গতিতে সামনের দিকে চলেছিলাম হাতে হাত রেখে, আস্তে আস্তে আমাদের উভয়ের কাজ আমাদের ভিন্ন ভিন্ন পথে নিয়ে যায়। হয়তো বা আমাদের নিজস্ব জীবনদর্শনও এর জন্য দায়ী। কথা প্রসঙ্গে আমার এক বন্ধুর মন্তব্য মনে পড়ে গেল। তিনি বলেছিলেন, আমরা এখন এমন এক বয়সে পেঁৗছেছি যে, যারা এক সময় একে অন্যের বন্ধু ছিলাম, তাদের আবারও কাছাকাছি আসা উচিত। এই মুহূর্তে আমার মনে হয় এর চেয়ে সত্য আর কিছু নেই। একটা সময় ছিল যখন আপনার নন্দিত নরকে আমাকে শঙ্খনীল কারাগারের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল এবং তারপর আকৃষ্ট করেছিল আপনার আরও অনেক সৃজনশীল লেখার প্রতি। এরপর তো ইতিহাসই বলে দেবে যে, বহুব্রীহি, আজ রবিবার, ঈদ ভেকেশান এবং আরও সব অবিস্মরণীয় নাটক এক সেতুবন্ধ রচনা করেছিল নাট্যকার আর এই অভিনেতার মাঝে। এসব ভুলি কী করে?
আপনার সেই সময়ের দুষ্টুমিগুলোও আজ মনে পড়ছে আমার। মনে আছে, আমি আপনাকে 'স্যাডিস্ট' বলে সম্বোধন করতাম? আমি যা পছন্দ করি না, আপনি নাটকে সবসময় আমাকে দিয়ে তাই করিয়ে আনন্দ পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। যেমন_ ধূমপান আমি করি না। বস্তুতপক্ষে ধূমপানবিরোধী আমি। অথচ আপনার লেখা আমার অভিনীত প্রতিটি চরিত্রের হাতে একটি সিগারেট ধরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব লেখা থাকতোই। আপনি ভালো করেই জানতেন যে, ওই কাজটি আমি করব না। কেননা, আমি এখনও মানি যে, হুমায়ূন আহমেদ লিখিত একটি নাটকে, যত তুচ্ছ অভিনেতাই আমি হই না কেন, আমার দুই আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগারেট তরুণ দর্শকদের একটু হলেও ওই বদ অভ্যাসটার দিকে টানবে। আমি যখন বলতাম, 'হুমায়ূন, আমি সিগারেট খাব না', আপনি তখন আপনার সেই অবিস্মরণীয় মুচকি হাসি, মাঝে মাঝে সশব্দে, মাঝে মাঝে নিঃশব্দে হাসতেন। মনে পড়ে, আজ রবিবার নাটকে আপনি আমায় একটি কফিনের ভেতরে ঢুকিয়েছিলেন? আমি বাধা দেইনি। ভেবেছিলাম, দেখিইনা কেমন লাগে? কফিনের ভেতরে ঢোকার পর যখন ঢাকনাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়, চারপাশের সবকিছু একদম অন্ধকার হয়ে আসে, তখন আমি ভেবেছিলাম, 'বাহ, বেশ মজার তো!'... অতএব, চিরকালের জন্য চোখ বন্ধ করলেও নগণ্য এই অন্ধকারকেই দেখব, এর বেশি তো কিছু নয়? মজার ব্যাপারটা ঘটল যখন আমি কফিন থেকে হাসিমুখে বেরিয়ে এলাম, যেন 'হুমায়ূনকে বেশ একহাত দেখানো গেল। ও ভেবেছিল আমি ভয় পেয়ে এই দৃশ্য ধারণ থেকে বিরত থাকব? কিন্তু আমি সেটি হতে দেইনি।' ঠিক তখনই আপনি আমার দিকে তাকিয়ে সেই স্বভাবসুলভ হাসিটি ঠোঁটের ওপরে এঁকে বললেন, 'যাকের ভাই, আপনি কি জানেন যে, এই কফিনটির ভেতরে একটি লাশ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কবরস্থানে আজ সাকলে?' হঠাৎ তখন মনে পড়ল যে, কফিনের ভেতরে আমি কর্পূরের গন্ধ পেয়েছিলাম। কিন্তু সেদিন আপনি আমাকে হারাতে পারেননি। আতঙ্কিত কিন্তু আমি হইনি। ভালো লাগে ভেবে যে, একই জাতকের দুই বয়সের দু'জন মানুষ আমরা, আপনি অন্ততপক্ষে আমার চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট, একটি ব্যাপারে একেবারে একরকম। আমরা আতঙ্কিত হই না, আমরা আতঙ্কিত হতে শিখিনি। এটি আমাদের রাশিচক্র বলে কি-না, সে ব্যাপারে আমার কোনো ধারণা নেই। ভাবতেও চাই না তা নিয়ে।
আমি আপনাকে কিছু লিখতাম, যখন আপনার অসুস্থতার খবরটা আমার কানে এলো। আমাদের এখানে অনেক মানুষ অনেক রকম সেনসেশন তৈরি করার চেষ্টা করেছে আপনার অসুখকে নিয়ে। মিডিয়াতেও মাঝে মধ্যে এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা বলা হয়েছে। কিন্তু আমি জানতাম এতে আপনার ওপর কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে না, আপনি আতঙ্কিত হবেন না। সে কারণেই আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, যত বড় যুদ্ধই হোক, যুদ্ধ শেষে আপনি বিজয়ীর বেশে বেরিয়ে আসবেন। কেননা, হারতে আপনি জানেন না, হারতে আপনি শেখেননি। এ ব্যাপারে বোধ হয় আপনার সঙ্গে আমার কিছুটা মিল থাকলেও থাকতে পারে। আমিও হারতে শিখিনি। তাই আপনি এখন যখন সম্পূর্ণ আরোগ্যের পথে এবং দিনটিও মোক্ষম, আপনার জন্মদিন, সেইদিন এই কথাগুলো বলার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না। আপনি শতায়ু হোন, সাহিত্যের আরও সোনার ফসল তুলে দিন আমাদের সবার ঘরে_ এই কামনা করি আজ।
পরিশেষে : তবে আমাকে দিয়ে ধূমপান করাতে পারবেন না আপনি আর। ... এই কথা দিচ্ছি আপনাকে। আশা করি, আমিও পারব না ধূমপান করাতে আপনাকে এরপর, যদিও আমি জানি ধূমপান আপনার প্রিয় বদঅভ্যাসগুলোর একটি। হঠাৎ মনে হচ্ছে আপনাকে আসলেই বোধ হয় অনুজ হিসেবে ভালোবাসি আমি... একটু বেশিই ভালোবাসি।

আলী যাকের :সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

No comments

Powered by Blogger.