বিশ্ব অর্থনীতি-জি-২০ সম্মেলনে ধাক্কা খেল আমেরিকা by আসজাদুল কিবরিয়া

বড় কিছু হবে—এমন প্রত্যাশাটি আগেই দমিয়ে আনা হয়েছিল। আর তাই দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিওলে দুই দিনব্যাপী (১১ ও ১২ নভেম্বর) জি-২০ জোটের সম্মেলন শেষে বড় ধরনের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়নি জোটের নেতাদের।


বিশ্বের ধনী ও অগ্রসর উদীয়মান অর্থনীতির ১৯টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে নিয়ে গঠিত এই জোটের এবারের সম্মেলনটিতে কার্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্যবিরোধই প্রাধান্য পেয়েছে। তবে বিরোধ নিষ্পত্তিতে তেমন অগ্রগতি হয়নি। বরং বলা যেতে পারে, সম্মেলন থেকে তুলনামূলক বিচারে চীনই খানিকটা লাভবান হয়েছে। বিপরীতে ব্যর্থতার বোঝা বেড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। এতে করে মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপর্যস্ত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ওপর প্রতিকূলতার চাপ আরও বেড়েছে।
এবারের সম্মেলনে মূল আলোচ্য ছিল মুদ্রাযুদ্ধ বা বিভিন্ন দেশের মুদ্রার প্রতিযোগিতামূলক অবমূল্যায়ন। রপ্তানির শক্তিশালী অবস্থা ধরে রাখতে বিভিন্ন দেশ যখন নিজেদের মুদ্রার মান দুর্বল করে রাখতে বা অন্তত মান বাড়তে না দিতে একযোগে পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করে, তখন তা প্রতিযোগিতামূলক অবমূল্যায়ন হিসেবে পরিচিত হয়। সম্প্রতি জাপান, থাইল্যান্ড, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশ নিজেদের মুদ্রার মান না বাড়ানোর জন্য পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। মুদ্রাযুদ্ধের জের ধরে বাণিজ্য প্রতিরক্ষণনীতি জোরদার হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমনিতেই ২০০৮ সালে বিশ্বজুড়ে আর্থিক সংকট দেখা দেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এই জোটের দেশগুলো অন্তত ২০০-এর মতো বাণিজ্য প্রতিরক্ষণমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।
আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে চীন তাদের মুদ্রা ইউয়ানের মান কৃত্রিমভাবে কমিয়ে রেখেছে। জি-২০ জোটের সম্মেলনে চীনের ওপর এ বিষয়ে বড় ধরনের চাপ তৈরির প্রচেষ্টা ছিল আমেরিকার। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হয়নি। এ বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকেই প্রত্যাশিত সমর্থন পায়নি আমেরিকা। আর তাই সম্মেলনে গৃহীত ঘোষণায় সাদামাটাভাবে ‘প্রতিযোগিতামূলক অবমূল্যায়ন থেকে বিরত থাকার’ বিষয়টি স্থান পেয়েছে। তবে এটা কোনো বাধ্যবাধকতা তৈরি করেনি। কিংবা জি-২০ জোটের দেশগুলো এই ঘোষণা পুরোপুরি মেনে চলবে, এমন প্রতিশ্রুতিও এতে মেলেনি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল কয়েকটি বিষয়ে জি-২০ দেশগুলোর বেশির ভাগের কাছ থেকে সম্মতি আদায় করতে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল কোনো দেশের চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত বা ঘাটতি তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) চার শতাংশের বেশি হতে পারবে না—এমন একটা বিধি চালু করা। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি (অর্থমন্ত্রীর সমমর্যাদায়) টিমুনথি গেইথনার এই প্রস্তাব নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে তৎপরতা চালাচ্ছিলেন। মোটা দাগে চলতি হিসাবে কোনো দেশের নিয়মিত বিদেশি লেনদেনের হিসাব প্রতিফলিত হয়। নিয়মিত আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য আয়-ব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে। চলতি হিসাবের ভারসাম্যে উদ্বৃত্ত এটাই বোঝায় যে নিয়মিত লেনদেনের ক্ষেত্রে দেশকে কোনো ঋণ করতে হয় না। আর ঘাটতি বোঝায় যে দেশটিকে নিয়মিত ঋণ করতে হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের যেহেতু চলতি হিসাবের বিরাট ঘাটতি আর চীনের যেহেতু বিরাট উদ্বৃত্ত, তাই আমেরিকা ঘাটতি কমানোর জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা করছে। চলতি হিসাবের উদ্বৃত্তাবস্থায় লাগাম দেওয়ার চেষ্টাটি তাই আমেরিকার দিক থেকেই ছিল। এতে চীন এককভাবে বাদ সাধেনি, পাশে পেয়েছে জার্মানির মতো শক্তিশালী দেশকে।
আসলে, মুদ্রাযুদ্ধ বিষয়ে সহজাত মিত্রদের সঙ্গে আমেরিকার খানিকটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে কিছুদিন আগেই। সম্মেলন শুরুর কয়েক দিন আগে জার্মানির অর্থমন্ত্রী প্রকাশ্যেই অভিযুক্ত করলেন আমেরিকাকে। বললেন, ‘মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ে আমেরিকা কপটতা করছে। আমেরিকা যখন চীনকে মুদ্রার মান কমিয়ে রাখার জন্য দুষছে, তখন নিজেই আবার একই কাজ করতে যাচ্ছে।’ এই একই কাজ হলো ডলার ছাপিয়ে নিজ দেশের বাজারে ছেড়ে দিয়ে সরববরাহ বাড়িয়ে ডলার দরকে আরও কমিয়ে আনা।
বস্তুত, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ যে দ্বিতীয় দফায় কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং (কিউই) করতে যাচ্ছে, তাতে জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশ তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কারণ, পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করার মানে হলো বাজারে ৬০ হাজার কোটি ডলার সরাসরি জোগান দেওয়া। বাজার থেকে ট্রেজারি বন্ড কিনে নেওয়ার বিপরীতে এই অর্থ জোগান দেওয়া হবে, যা দেশটিতে তারল্য সরবরাহ অনেক বাড়িয়ে দেবে। এতে করে একদিকে ডলারের দাম পড়ে যাবে, অন্যদিকে সস্তায় ডলার পেয়ে আমেরিকার বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান অন্য দেশের আর্থিক বাজারে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেবে। এই বিনিয়োগ আবার সেসব দেশের শেয়ারবাজারসহ আর্থিক বাজারকে স্ফীত করে তুলবে। আর এই স্ফীতি বহুলাংশে হবে কৃত্রিম, যা টেকসই হবে না। কেননা, একপর্যায়ে এসব বিনিয়োগকারী অর্থ তুলে নিয়ে যাবে, যা বাজারকে আবার নিম্নমুখী করবে। খোদ আমেরিকাতেই ফেডারেল রিজার্ভের এই পদক্ষেপ সমালোচনার মুখে পড়েছে।
এই বাস্তবতায় জি-২০ সম্মেলনে আমেরিকার নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। আমেরিকা যতই দাবি করুক না কেন যে নিজ দেশের বেকারত্ব হ্রাস ও মূল্য সংকোচন রোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার ছাড়ার উদ্যোগ নিয়েছে, জি-২০ জোটের অন্যরা এই যুক্তিকে মেনে নেয়নি। বরং তারা এর মাধ্যমে ডলারের মান কমিয়ে আমেরিকার রপ্তানিকে জোরদার করার প্রয়াসকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। চীন বেশ সাফল্যের সঙ্গেই এই তাসটি ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে। তাই, সম্মেলন শুরুর আগেও যেখানে চীনের ওপর চাপ তৈরির বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলো মোটামুটি একমত ছিল বলে প্রতীয়মান হয়েছে, সেখানে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে তারা এই অবস্থান থেকে সরে এসে কার্যত যুক্তরাষ্ট্র, বিশেষত ওবামাকে পাল্টা চাপের মুখে ফেলে দিয়েছে।
অবশ্য আমেরিকার এই ধাক্কা খাওয়ার বিষয়টি অনিবার্য ছিল বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ, নিজেদের সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট ঠিকমতো মোকাবিলা করতে না পেরে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকেরা অন্যদের দায়ী করতে শুরু করেছেন। চীন, ব্রাজিল বা জার্মানির মুদ্রা বিনিময় হারের নীতি ও রপ্তানিকে অভিযুক্ত করার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করেছে। চীনের একজন নীতি-নির্ধারক সম্মেলনের প্রাক্কালে স্পষ্ট ভাষাতেই বলেছেন, ‘আপনার অসুখের জন্য আমাকে ওষুধ খেতে হবে’, তা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
বস্তুত জি-২০ সম্মেলনে আমেরিকার প্রতি গোটা বিশ্বের এক ধরনের অসমর্থনেরই প্রতিফলন ঘটেছে। দুর্বল অর্থনীতি ও দুর্বল ডলারের প্রতি যে কেউ সমর্থন দেবে না, তা স্পষ্ট। কিন্তু আমেরিকার নীতি-নির্ধারকেরা এই বার্তা সহজে মেনে নেবেন, এমনটা ভাবা কঠিন। ফলে জি-২০ সম্মেলনের পর মুদ্রাযুদ্ধ স্তিমিত হয়ে আসবে, এমনটাও ভাবা যাচ্ছে না।
এই অবস্থায় বাংলাদেশের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা একটু পর্যালোচনা করা যায়। জি-২০ভুক্ত দেশগুলোর মধ্যেই রয়েছে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি গন্তব্য (আমেরিকা, জার্মানি প্রভৃতি) এবং প্রধান আমদানির উৎস (চীন ও ভারত)। রয়েছে প্রধান শ্রমবাজার (সৌদি আরব)। ফলে এসব দেশের অর্থনীতিতে উত্থান-পতন বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও কম-বেশি প্রভাবিত করে। তবে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে, বিশেষত বিশ্ব আর্থিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টতা এখনো অত নিবিড় নয়। তাই আমেরিকায় বন্ধকি ঋণের বিপর্যয়ের জের ধরে সৃষ্ট আর্থিক সংকট সেভাবে বাংলাদেশকে আঘাত হানতে পারেনি।
তবে মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ে কিছুটা চিন্তার বিষয় আছে। বিশেষ করে প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের বাজারে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। চীন যদি ইউয়ানের দরকে সামান্য হলেও ঊর্ধ্বমুখী করে, তাহলে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে কিছুটা সুবিধা বাংলাদেশ পাবে। আর তা না হলে যেমন চলছে তেমনই চলবে। বরং, ডলার দুর্বল হলে রপ্তানি ও প্রবাসী-আয়ে সামান্য আঘাত আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমদানি আবার সামান্য ব্যয়সাশ্রয়ী হতে পারে।
আসজাদুল কিবরিয়া: সাংবাদিক।
asjadulk@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.