মুসলমানদের ঐক্যের গুরুত্ব by মুফতি এনায়েতুল্লাহ

একতাই বল; একতাই শক্তি। একতাবদ্ধ মানুষ, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র কখনও ক্ষতিগ্রস্ত হয় না বাইরের শত্রু দ্বারা। সংহত সমাজ ও সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রের জন্য ঐক্য সবিশেষ জরুরি বিষয়। আর জাতিগতভাবে বরাবরই মানুষের কাছে ঐক্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।


কারণ, ঐক্য ও সংহতির মাধ্যমে উদ্ভূত বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সুষ্ঠু সমাধান সম্ভব হয়।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বড় সভ্যতাগুলো বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই গড়ে উঠেছে ও পূর্ণতা পেয়েছে। নিজেদের মধ্যকার ঐক্য ভেঙে যাওয়ার পর ওই সব সভ্যতা ধ্বংসের দিকে এগিয়ে গেছে। ইসলাম নিজেদের উন্নতি ও অগ্রগতির চাবিকাঠি হিসেবে মুসলমানদের সবসময় ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে। কোরআনুল কারিমে মুসলমানদের আল্লাহর রজ্জু শক্ত করে ধরে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হতে নিষেধ করা হয়েছে। মুসলমানরা যতদিন পবিত্র কোরআনের এ আদেশ মেনে চলেছে ততদিন জ্ঞান-বিজ্ঞান, শক্তি ও শৌর্য-বীর্যে তারা ছিল সবচেয়ে উন্নত ও অগ্রগামী। কিন্তু নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির পর মুসলমানদের পতন শুরু হয় এবং তারা সব দিক থেকে অন্যান্য জাতির চেয়ে পিছিয়ে পড়ে। এটা মুসলমানদের জন্য এক বেদনাদায়ক অধ্যায় বটে।
মুসলিম সভ্যতার গৌরবোজ্জ্বল যুগে মুসলমানদের উন্নতি ও অগ্রগতির প্রধান উপকরণ ছিল ঐক্য। পরবর্তী সময়ে নানা বিভেদের কারণে মুসলিম সভ্যতার পতন শুরু হয়। ইসলামে বিভিন্ন মাজহাবের মধ্যে ছোটখাটো কিছু পার্থক্য থাকলেও মৌলিক বিশ্বাসসহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিন্ন উপাদান রয়েছে। আল্লাহতায়ালার একত্ববাদ, মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) এবং পবিত্র কোরআন শরিফের প্রতি সব মাজহাবের মুসলমানদের অগাধ বিশ্বাস রয়েছে। এ ছাড়া তারা একই কিবলার দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। সে সঙ্গে নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত পালনের দিক থেকেও তাদের মধ্যে মতৈক্য রয়েছে। কাজেই বর্তমানে মুসলমানদের মধ্যে যে বিভেদ ও মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে তার সঠিক কারণ খুঁজে বের করা সত্যিই কঠিন। তারা যদি নিজেদের মধ্যকার অভিন্ন বিষয়গুলো বড় করে দেখতে পারেন, তবে মুসলমানদের মধ্যে আবারও ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠিত হবে।
মুসলিম বিশ্বে আজ যে বিভেদ ও মতবিরোধ চলছে, তার কারণ অনুসন্ধান করলে আমরা অভ্যন্তরীণ ও বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া দুই ধরনের উপাদান খুঁজে পাব। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো মুসলমানদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টির ক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক উপকরণ হিসেবে কাজ করছে।
বিষয়টা সহজে বোঝা যাবে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশদের ভূমিকা পর্যালোচনা করলে। এ অঞ্চলের গুটিকয়েক মুসলমানের অজ্ঞতা, কুসংস্কার, গোঁড়ামি ও উগ্র মানসিকতা ব্রিটিশদের বেশ কাজে লেগেছিল। এটাকে পুঁজি করে তারা মুসলমানদের ইসলামের মূলধারা থেকে বিচ্যুত কিছু গোষ্ঠী তৈরি করতে পেরেছিল। বাহ্যত এসব গোষ্ঠী নিজেদের মুসলমান বলে দাবি করলেও তারা নিজেদের অজ্ঞাতসারে ব্রিটিশদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিল। উপনিবেশবাদীরা এসব গোষ্ঠীকে মুসলমানদের মধ্যে মতবিরোধ উস্কে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করত। ফলে দেখা গেল, মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে ঐক্যের উপাদান থাকা সত্ত্বেও তারা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। তারা অভিন্ন বিষয়গুলোকে ভুলে গিয়ে ছোটখাটো মতপার্থক্যকে বড় করে দেখতে শুরু করে এবং উপনিবেশবাদীরা এসব ছোটখাটো বিষয়কে তাদের সামনে মৌলিক বিষয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরে। এভাবেই মুসলমানরা তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার পরিবর্তে পরস্পরে খুনোখুনিতে লিপ্ত হয়। এ ধারা মুসলিম সমাজে আজও বহমান।
বর্তমানে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ, ঐক্যের বিরুদ্ধে হুমকি আগের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতার ধরনও পাল্টে গেছে। বর্তমানে বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশে বিদেশি দখলদারিত্ব চলছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজমান তাদের ইন্ধনে। চলছে মুসলমানদের প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন প্রক্রিয়া। এ ছাড়া পশ্চিমা গণমাধ্যম মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাসগুলো নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করছে এবং ইসলাম অবমাননার মতো ন্যক্কারজনক কাজে হাত দিয়েছে। মুসলমানদের তাদের ধর্ম সম্পর্কে উদাসীন করে তাদের ওপর পশ্চিমা সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে পশ্চিমা গণমাধ্যম এসব কাজ করছে। এ অবস্থায় মুসলমানদের ধর্ম ও দেশ রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।
মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম বিশ্বের গণমাধ্যমগুলোরও ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। পশ্চিমা গণমাধ্যম যেমন মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির কাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে, তেমনি মুসলিম বিশ্বের গণমাধ্যমগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে, মুসলমানদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। এসব গণমাধ্যম বিশিষ্ট মুসলিম আলেম ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে তাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে মুসলমানদের সচেতন করে তুলতে পারে। আর মুসলমানদের এ কথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে, তারা ছোটখাটো মতপার্থক্যকে ঝেড়ে ফেলে মুসলিম উম্মাহর বৃহৎ স্বার্থে নিজেদের মধ্যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য গড়ে তুলতে পারে। আর তা করতে পারলেই হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মহান শিক্ষা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ঐক্য ছাড়া কোনো ধরনের সফলতা অর্জন সম্ভব নয়।
muftianaet@gmail.com
 

No comments

Powered by Blogger.