বাস টার্মিনালে চাঁদাবাজি

এমন অবৈধ তৎপরতা চলছে কিভাবে? বাস টার্মিনালে চাঁদাবাজির মহোৎসব চলছে। রাজধানীর সায়েদাবাদ, মহাখালী, গাবতলী বাস টার্মিনাল তো বটেই, মফস্বলের চিত্রও প্রায় একই রকম। ৩ জুন কালের কণ্ঠের শীর্ষভাগে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রতীয়মান হয়, বাস টার্মিনালগুলো চাঁদাবাজদের মুঠোবন্দি হয়ে আছে।


রাজধানীর তিনটি বড় বাস টার্মিনাল, যেগুলো থেকে দূরপাল্লার গাড়িগুলো ছেড়ে যায়, সেসব স্থানে টাকা যেন বাতাসে উড়ছে। পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজির বিষয়টি এখন একেবারেই 'ওপেন সিক্রেট'। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে চাঁদাবাজদলেরও পরিবর্তন ঘটে, ফিরে আসে নতুন চেহারার আরেক দল। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরের বাস ও ট্রাক টার্মিনাল দখলেরও বদল ঘটে এবং এ অবৈধ তৎপরতা ও ক্ষমতাবানদের স্বেচ্ছাচারিতায় মনে হয়, বহুসংখ্যক ক্ষমতাবানের আয়-উপার্জনের এটি একান্ত পথ। এ খাতে যে বিশৃঙ্খলা, অস্থিরতা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত পরিলক্ষিত হয়, সবই হচ্ছে এর কুফল। তা অনস্বীকার্য।
কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনে চাঁদাবাজির নেপথ্য কাহিনী উপস্থাপিত হয়েছে। পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি ও চাঁদা আদায়ের স্বত্ব নিজেদের কব্জায় রাখতে এই সেক্টরের মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বিষয়টি নতুন কিছু নয়। এর সঙ্গে রয়েছে আইনি সংস্থা, বিশেষ করে পুলিশের ক্ষমতাবান এক শ্রেণীর অসাধুর যোগসাজশ। নিকট-অতীতেও চাঁদাবাজির অভিযোগে রাজধানীর কাউন্টার বাসের মালিকরা বাস বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এই চাঁদাবাজি হালাল করার নানা রকম অপক্রিয়াও এযাবৎ কম পরিলক্ষিত হয়নি এবং এ সব কিছুর সঙ্গেই ক্ষমতাসীন মহলের ক্ষমতাবান স্বার্থান্বেষীরা যুক্ত থাকেন- এও নতুন কিছু নয়। সরব কিংবা নীরব এই চাঁদাবাজির কৌশলও একেক সময় একেক রকম পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন পন্থায় এই অপকর্ম চলছে প্রকাশ্যে। দূরপাল্লার পরিবহনগুলোকে একেক রেটে চাঁদা দিতে হয়। এর কুফল শুধু পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরই ভোগ করতে হয় না, আখেরে মাসুল গুনতে হচ্ছে যাত্রীসাধারণকেও। চাঁদার টাকাটা যাত্রীদের পকেট থেকেই নেওয়া হচ্ছে ভাড়া বাড়িয়ে দিয়ে। সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী বাস টার্মিনালে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজির যে চিত্র কালের কণ্ঠে উপস্থাপিত হয়েছে, তা নিশ্চয়ই সরকারের দৃষ্টিগোচর হবে। জনপ্রত্যাশা, সরকারের এ ব্যাপারে টনক নড়বে। যদি এর বিহিত না হয়, তাহলে এর চূড়ান্ত ফল ভবিষ্যতে ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াতে বাধ্য।
বিষয়টি নিয়ে এযাবৎ আলোচনা-পর্যালোচনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ- কোনো কিছুই কম হয়নি, কিন্তু ফল শূন্য। এই চাঁদাবাজির মতো অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে দৃশ্যত অতীতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বটে, কিন্তু সমস্যা যে তিমিরে ছিল আজও সেখানেই রয়েছে; উপরন্তু কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আরো প্রকট হয়েছে। অতীতে এ জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু এই কমিটির কাজ বেশিদূর এগোতে পারেনি। পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা অত্যন্ত জরুরি। অনিয়ম যদি নিয়ম হয়ে দাঁড়ায় তাহলে এর কুফল সর্বব্যাপী ভয়ংকর হয়ে উঠতে বাধ্য। নিশ্চয়ই শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কারোরই এমনটি কাম্য হতে পারে না। চাঁদাবাজির ফলে নৈরাজ্য জিইয়ে আছে; এর শিকার অনেকের পাশাপাশি যাত্রীসাধারণ। এ খাত থেকে সরকারের প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আসছে। জনস্বার্থ রক্ষা করা এবং সরকারের আয়ের পথ সুগম রাখা দুই-ই জরুরি। চাঁদাবাজ-তোলাবাজদের হাত থেকে মানুষ নিষ্কৃতি চায়। সরকার এর প্রতিবিধানে কালবিলম্ব না করে তৎপর হবে- এটাই শান্তিপ্রিয় মানুষের প্রত্যাশা।

No comments

Powered by Blogger.