গফরগাঁওয়ের সাংসদ-আমরা স্তম্ভিত, শঙ্কিত এবং ক্ষুব্ধ

ময়মনসিংহের সুপরিচিত জনপদ গফরগাঁও থেকে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন আহমেদ নিজের নির্বাচনী এলাকার একদল বিক্ষুব্ধ লোকের ওপর পিস্তল থেকে গুলিবর্ষণ করছেন_ শনিবার সমকালে এ ছবি দেখে দেশবাসী স্তম্ভিত হয়েছে, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়েছে। একই সঙ্গে সৃষ্টি হয়েছে ক্ষোভ।


সংসদ সদস্য এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি এপিএসকে দিয়ে তার গাড়ি ভাংচুরের ঘটনায় থানায় যে মামলা দায়ের করিয়েছেন তাতে সমকালের গফরগাঁও প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল আমিন বিপ্লবকেও অন্যান্যের সঙ্গে আসামি করা হয়েছে। সমকাল প্রতিনিধির অপরাধ_ সংসদ সদস্য তারই নির্বাচনী এলাকার একদল লোকের ওপর প্রথমে নিজের গাড়ি থেকে এবং পরে পায়ে হেঁটে তাড়া করে যখন গুলিবর্ষণ করছিলেন তখন তার চিত্র ধারণ করে সমকালে প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছেন। সমকাল কর্তৃপক্ষ এসব ছবি প্রকাশের উপযুক্ত মনে করেছে এবং গণমাধ্যমের অনুসৃত নীতিমালা অনুযায়ী তা প্রকাশ করেছে। পরের দিন রোববার আরও কয়েকটি সংবাদপত্র সমকালে প্রকাশিত ছবি পুনর্মুদ্রণ করেছে। শনিবার সমকালে বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে ভাংচুর হওয়া সংসদ সদস্যের গাড়ির ছবিও প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনা গফরগাঁওয়ের সমকাল প্রতিনিধির সৃষ্টি নয়_ বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি অনুগত একজন সাংবাদিক হিসেবে তিনি কেবল দায়িত্ব পালন করেছেন। তাহলে তার বিরুদ্ধে কেন জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের করা হলো? জানা যায়, শুক্রবার ঘটনার পর গফরগাঁও থানায় যে মামলা রুজু হয় তাতে সমকাল প্রতিনিধির নাম ছিল না। পরদিন সমকালে সংসদ সদস্য নিজে পিস্তল থেকে জনতার ওপর গুলি করছেন, এমন ছবি প্রকাশের পরই তাকে আসামি করা হয়। এটা তো উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো বৈ কিছু নয়। সংসদ সদস্য বলেননি যে ছবিটি বানোয়াট। তিনি হয়তো দাবি করবেন, আত্মরক্ষার জন্য তিনি গুলি করেছেন এবং তা কাউকে হতাহত করার জন্য নয়। মামলায় বলা হয়েছে, আসামিরা সংসদ সদস্যের গাড়ির কাচ ভাংচুর করে এবং তাকে হত্যার চেষ্টা চালায়। কিন্তু দ্রুত বিচার আইনে দায়ের করা মামলায় সমকাল প্রতিনিধি বাদে অন্য যে ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে তারা স্থানীয় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের সঙ্গে সংসদ সদস্যের বিরোধ কেন? গফরগাঁও থানা ভেঙে নতুন একটি থানা গঠনে তার উদ্যোগে সৃষ্টি হয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। তদুপরি তার নামে রয়েছে দুর্নীতি ও অনিয়মের অনেক অভিযোগ। শুক্রবারের বিক্ষোভ তো তারই ফলশ্রুতি। এ সত্য অস্বীকার করে তিনি ক্ষমতার দম্ভ দেখাতে চান কেন? কেনইবা সত্য ও ন্যায়ের প্রতি অবিচল থাকার কারণে একজন সাংবাদিক জনপ্রতিনিধির রোষের শিকার হবেন? আমরা আশা করব, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এবং তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব জনপ্রতিনিধির মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন ও কলঙ্কিত হতে দেবেন না। যারা নির্বাচনী এলাকার মানুষের আস্থা হারিয়েছে, ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সঙ্গে মানুষের ক্ষোভ-দুঃখের কথা না শুনে উল্টো পিস্তল নিয়ে তাড়া করে তাদের সম্পর্কে সতর্ক হওয়া এবং দলীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সময় এসেছে। শুধু গফরগাঁও নয়, দেশের আরও অনেক স্থানে সাংবাদিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে। শনিবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি হাবিবুর রহমান এক সেমিনারে বলেছেন, গত বছরে ১০১ জন সাংবাদিক নির্যাতিত হয়েছেন পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে। সরকারি দলের ক্যাডার-সন্ত্রাসী এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন অনেক সাংবাদিক। এসব অবশ্যই থামাতে হবে। সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা দেশের জন্য শুভ হয় না, যারা তা করেন তাদেরও কিন্তু এ জন্য চড়া মূল্য দিতে হয়।
 

No comments

Powered by Blogger.