নবজাগৃতি by সুভাষ সাহা

ঘড়ি ধরে রাত ১২টা ১ মিনিটে ঘণ্টাধ্বনি আর পটকাবাজির শব্দ-আবহে রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে বাঙালির নববর্ষ সাধারণত আসে না। আসে কাকডাকা ভোরে ঘুমের চাদর ফেলে দিয়ে শুচিশুদ্ধ বসনে রাবিন্দ্রিক ছন্দে পা ফেলে এই চরাচরকে নতুন করে, আপনার করে দেখার স্বপি্নল-আবিলতায়।


এখানেই ইংরেজি নববর্ষ আর বাংলা নববর্ষ পালনে দুই সংস্কৃতির, দুই সভ্যতার ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের চোখাচোখি। আর বাংলাদেশে বাঙালির নববর্ষ উদযাপন তো বাঙালি সংস্কৃতির এক নতুন দ্যোতনা ও নিজেকে নবআবিষ্কারেরই স্মারক। কালে কালে এখানে নববর্ষ উদযাপন ধর্ম-বর্ণ-গোত্র ও সংকীর্ণতার সীমাবদ্ধ বিবর্ণ ছবিকে নতুন বর্ণময় জীবনের ছন্দে দোলে সামনে এগিয়ে চলার মন্ত্র হয়ে উঠেছে, সেটা যারা নবজাগৃতিকে চিনতে পারেন তারা সম্যক উপলব্ধি করেন। এই একটি দিনে বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্তের মানুষের প্রাণ যেন সেতারের নতুন বাঁধা তারের ঝঙ্কারের মতো নেচে ওঠে। ধনী থেকে নির্ধন সবাই নতুন করে বাঁচার প্রেরণা সন্ধান করে এ দিনটিতে। ঈদে, পূজায়ও যারা নিজের পয়সায় নতুন কাপড় কেনার স্বপ্ন দেখেন না সেই নিতান্ত প্রান্তিক মানুষও আপন গা-গতরে একটি স্বপ্ন-রঙিন নতুন কাপড়ের মধ্যে নিজের শুভ আগামীকে আবাহন করেন। মৌলবাদীদের নানা ধরনের আদেশ-উপদেশের ভয়ের বাঁধনকে কবে মানুষ ভুলে যাওয়া-উপেক্ষার বোতলে বন্দি করে বাংলা নববর্ষকে স্বমহিমায় বরণ করে নিতে শিখেছে তার হিসাব কি আমরা রাখি? ইলিশ মাছ, নতুন আম, মৌসুমি নতুন ফল, রবীন্দ্র, নজরুল, ভোরবেলা সম্মিলিত ঐকতানে মঙ্গল শোভাযাত্রায় লীন হওয়া, আরও কত কি। সারাদিন গান আর আড্ডায় হুটোপুটি খাওয়া। বাঙালির সনাতন ও নতুন অনেক খাবারের আয়োজন এদিনে রসনার খেদ মেটায়। বাঙালি যেন নতুন করে আবিষ্কার করে নিজেকে। অতীতের সঙ্গে, শিকড়ের সঙ্গে নিজের বাঁধনটাকে আরও শক্ত করে নিতে চায়। এ জন্যই বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপন ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনের প্রথাগত সীমাবদ্ধতায় আটকে নেই। কারণ, এই দিবসটি যে বাঙালির নবজাগৃতির উপলক্ষ হয়ে উঠছে। ক্রমশ অধিকতর অসাম্প্রদায়িক মঙ্গল চেতনায় সবাইকে এককাতারে দাঁড় করাতে এদিনটির অবদানকে একদিন ইতিহাস স্বীকার করে নেবে।
বাঙালির মতো পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি তাদের নববর্ষ উদযাপন করে নিজস্ব সংস্কৃতির উপচারের নৈবেদ্য সাজিয়ে। সেখানেও এক একটি জাতির সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার বিচিত্র প্রকাশ ঘটে নবরূপে নতুন রসে। চীনাদের নববর্ষের কথাই ধরুন। তারা ফেব্রুয়ারির ২০ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে তিথি অনুযায়ী তাদের নববর্ষ উদযাপন করেন। তবে অসমিয়ারা আমাদের মতো পহেলা বৈশাখেই 'রংগালি বিহু' বা নববর্ষ উৎসব পালন করেন। এই নববর্ষ উদযাপনের সঙ্গে প্রতিটি জাতির জীবনযাপন ও সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটে বিচিত্রভাবে। আর আমাদের নববর্ষ উদযাপন তো প্রতি বছর নতুন নতুন পত্রপল্লবে শোভিত হচ্ছে। আসলে এই একটি দিনেই গোটা দেশকে যেন আমরা একটা পরিবার হিসেবে চিনতে পারি। সে জন্যই বাংলা নববর্ষ উদযাপনের গুরুত্ব বাঙালি জাতির জীবনে অনন্যসাধারণ।
আমরা কতটা এগিয়েছি, আমরা কতটা সংস্কৃতিবান হয়েছি, আমদের পোশাকে-আশাকে, চলনে-বলনে কতটা পরিবর্তন ঘটেছে এই একটি দিনে এক লহমায় আমরা বুঝতে পারি। তাই বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখের আগমনে ঝড়-বৃষ্টির দাপাদাপিতে আমরা সিঁধিয়ে যাই না। বরং নববর্ষের আগমনী হিসেবে প্রকৃতির এই ক্ষণিক বেচঈন হওয়াকে প্রাণের স্পন্দনের সঙ্গে একসুরে গেঁথে স্বপ্ন-সাগরে ভাসি।

No comments

Powered by Blogger.