রাষ্ট্র ও রাজনীতি-রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং দলীয় আনুগত্য by ইমতিয়াজ আহমেদ

বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রের বিভিন্ন শাখার মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি কার্যত রুদ্ধ করে দিয়েছে, যাতে বলা হয় : 'এই সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদের (৩) দফা অনুসারে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তাঁহার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন।'


এর ফলে একদিকে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খর্ব হয়েছে, পাশাপাশি রাষ্ট্রযন্ত্রের সরকারিকরণ কিংবা আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে দলীয়করণের পথ খুলে গেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে আমলাতন্ত্রের ক্ষেত্রে। ক্ষমতা পরিবর্তনের পর প্রশাসনে পরিবর্তনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে একজন সমালোচক সম্প্রতি লিখেছেন : 'অফ দি পার্টি, বাই দি পার্টি, ফর দি পার্টি'। দুই আমলের কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরলেই বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রথম দুই বছরে ৬ জন সচিব, ৩০ জন অতিরিক্ত সচিব, ১৬২ জন যুগ্ম সচিব এবং ৭৮ জন ডেপুটি সেক্রেটারি, মোট ২৭৬ জনকে ওএসডি করা হয়। অন্যদিকে, বিএনপি ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথম ২০ মাসে ৩০০ জনকে ওএসডি করেছিল। উভয় দলই এ সময়ে নিজ নিজ দলের সমর্থক হিসেবে পরিচিতদের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়ে আসে। এখানে বলা দরকার যে, 'বিশেষ দায়িত্ব পালনের জন্য অফিসার' বা ওএসডি হিসেবে যাদের বাছাই করা হয় তাদের ভাগ্য বড়ই মন্দ। প্রকৃতপক্ষে তাদের বলা হয় 'অফিসার অন স্লিপিং ডিউটি'। তাদের কোনো কাজ থাকে না, কোনো রুম থাকে না। সচিবালয়ের করিডোরে ঘুরতে ঘুরতে পার হয়ে যায় সময়।
আমলাতন্ত্রের এভাবে দলীয়করণের কারণে আমরা দেখি যে কিছু উচ্চাভিলাষী আমলা ক্ষমতাসীন দল কিংবা যে দলের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে তাদের তুষ্ট রাখায় ব্যস্ত থাকেন। এ প্রক্রিয়ায় তাদের মধ্যে আপসকামী মনোভাব বেড়ে যেতে থাকে এবং দক্ষতা ও বাস্তব বিবেচনাবোধ হ্রাস পায়। যারা ক্ষমতাসীনদের সুনজরে থেকে সুবিধা পাচ্ছেন এবং যারা তা থেকে বঞ্চিত তাদের মধ্যে চলতে থাকে টানাপড়েন। এটাও দেখা যায় যে, আমলারা সেলফ-সেন্সরশিপ আরোপ করেন। তারা কোনো ঝুঁকির মধ্যে যেতে চান না। যে কোনো কাজেই একপক্ষ খুশি এবং অন্য পক্ষ ব্যাজার হবে, তার চেয়ে কোনো কাজ না করাই ভালো নয় কি?
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, যিনি নিজেও একজন ডাকসাইটে আমলা ছিলেন_ সম্প্রতি আমলাদের কাজে ঢিলেমি দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, 'পরিবর্তনের ব্যাপারে তাদের মনোভাব রক্ষণশীল।' গণতন্ত্রে এ ধরনের পরিস্থিতি কাম্য হতে পারে না। রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। কিন্তু দলীয়করণ উন্নয়ন কাজে বিঘ্ন ঘটায় এবং দুর্নীতি ও অনিয়মের জন্ম দেয়।
মেরুকরণের রাজনীতির কারণে জাতীয় সংসদের কার্যক্রমও সঠিকভাবে চলছে না। প্রধান বিরোধী দল প্রতিটি সংসদ টানা বর্জনের ধারায় চলছে। পঞ্চম সংসদে (১৯৯১-৯৬) আওয়ামী লীগ ৪০০ কার্যদিবসের মধ্যে ১৩৫ দিবস বয়কট করে। অন্যদিকে, বিএনপি সপ্তম সংসদের ৩৮২ কার্যদিবসের মধ্যে ১৬৩ দিবস অনুপস্থিত থাকে। আবার অষ্টম সংসদে (২০০১-২০০৬) আওয়ামী লীগ ৩৭৩ কার্যদিবসের মধ্যে ২২৩ দিবস বয়কট করে। এবারে বিএনপি এবং তাদের মিত্র জামায়াতে ইসলামী চলছে একই ধারায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর পরিস্থিতির পরিবর্তন আশা করা গিয়েছিল; কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।
সংসদে প্রধান বিরোধী দল অনুপস্থিত থাকার পরও ভিন্নমত প্রকাশের সামান্যতম সুযোগ সৃষ্টিতে সরকার পক্ষের আগ্রহ দেখা যায় না। আড়িয়ল বিলে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে মুন্সীগঞ্জে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল এবং এক পর্যায়ে তা গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। এ ঘটনা নিয়ে ১ ফেব্রুয়ারি সংসদে উপস্থিত একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিম পয়েন্ট অব অর্ডারে আলোচনার চেষ্টা করলে সরকারি দলের সদস্যদের হৈচৈ ধ্বনিতে তার কণ্ঠ চাপা পড়ে যায়। ডেপুটি স্পিকার তাকে এই বলে থামিয়ে দেন যে, তার বক্তব্য পয়েন্ট অব অর্ডারে পড়ে না। সংসদের চিফ হুইপ তার বক্তব্যকে এক্সপাঞ্জ করার প্রস্তাব করলে স্পিকারের আসনে বসা ডেপুটি স্পিকার তাতে দ্রুতই সায় দেন।
একমাত্র বিরোধী কণ্ঠ এভাবে থামিয়ে দেওয়ার কোনো যুক্তি ছিল কি? আড়িয়ল বিলকে কেন্দ্র করে যেসব ঘটনা ঘটেছে তা সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে গুরুত্বপূর্ণ খবর হয়েছে। সেটা নিয়ে সংসদে আলোচনা করায় কোনো সমস্যা ছিল না।
ভিন্নধর্মী আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল সরকারদলীয় প্রভাবশালী সদস্য সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। তিনি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল চিত্র তুলে ধরলে বেশিরভাগ সদস্য তাকে সোৎসাহে সমর্থন করেন। ডেপুটি স্পিকারও চেয়ারে থেকে তার বক্তব্যের যৌক্তিকতা স্বীকার করেন। এর দু'দিন পর বিষয়টি ফের আলোচনায় আসে। এ সময় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী কার্যত যোগাযোগমন্ত্রীর অবস্থানকে সমর্থন করে বক্তব্য রাখেন। তার বক্তব্যের পর কোনো কোনো সদস্য একজন সচিবের আচরণে তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়া প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে চাইলে তাদের এই বলে থামিয়ে দেওয়া হয় যে, সংসদ নেতার বক্তব্যের পর বিষয়টির নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। এ ঘটনার পেছনে একজন সচিবের কার্যক্রম একজন সংসদ সদস্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করলেও সংসদে সে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারল না। সরকার পক্ষ থেকে বারবার টানা বর্জনে থাকা বিরোধীদের অধিবেশন কক্ষে ফিরে আসার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে। তারা বলছেন, ফ্লোরে তারা যা খুশি এবং যতক্ষণ খুশি বলতে পারেন। কিন্তু সরকারি দলের সদস্যরা সে সুযোগ পাচ্ছেন না। আমরা সবাই জানি যে, ভিন্ন মত ব্যতিরেকে গণতন্ত্র অর্থহীন। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে সরকারের কাজের প্রসঙ্গে ভিন্ন দলের সমালোচনায় বাধা আসে, দলের ভেতরেও কেউ সমালোচনা করে কথা বলতে পারে না।
বিচার বিভাগের চিত্রও আশা জোগায় না। সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।' ১৯৯৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন এবং তার আলোকে ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করায় উদ্যোগ নেয়। তবে বিচার বিভাগের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণের অবসান প্রত্যাশিত মাত্রায় ঘটেছে বলে এখনও মনে হয় না। এমনকি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সংবিধানে প্রধান বিচারপতি এবং প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু এ দুটি ক্ষেত্রেও তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন বলে প্রতীয়মান হয় না। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ প্রদানে বাধ্য। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ বারবার উঠছে এবং এর পেছনে ক্ষমতাসীদের ভূমিকা সর্বজনবিদিত। এ ধরনের নিয়োগের পর দেখা যায় যে, সুপ্রিম কোর্ট বারের সরকার সমর্থকরা রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন এবং বিরোধীরা নেন বিপরীত অবস্থান। শেষোক্তদের কাছে এ ধরনের নিয়োগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রকৃতপক্ষে সর্বোচ্চ আদালত থেকে নিম্ন আদালত সর্বত্রই আমরা দেখি যে, আইনজীবীরা রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বিভক্ত। সরকার পরিবর্তনের পর আদালত অঙ্গনেও তার দ্রুত প্রভাব পড়ে।
বার্লিনভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল গত বছরের ডিসেম্বরে একটি জরিপের ফল প্রকাশ করেছিল। এতে দেখা যায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও ভূমি প্রশাসনের পরই বিচার বিভাগ হচ্ছে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত। এ সংস্থা জনসাধারণকে সেবা প্রদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ পরিচালনা করে এবং এ জন্য বিপুলসংখ্যক ব্যক্তির কাছ থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তাদের প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০০৯ সালের জুন থেকে ২০১০ সালের মে পর্যন্ত বিচার বিভাগের দ্বারস্থ হওয়া পরিবারগুলোর ৮৮ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে সেখানে বিদ্যমান দুর্নীতি ও হয়রানিমূলক পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। এটাও দেখা যায় যে, গত তিন বছরে এর মাত্রা বেড়েছে। গত ডিসেম্বরে তৎকালীন প্রধান বিচারপতির একটি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি জেলা জজদের বলেছিলেন, '... নাজিরদের কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণ করবেন না। আপনাদের সবাই এটা করছেন সেটা বলা যাবে না, এটা করছে কিছু লোক।' কিন্তু এটাও বাস্তবতা যে, ট্রান্সপারেন্সি তাদের কাজের জন্য সরকারি মহলের তোপের মুখে পড়ে। তাদের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ তোলা হয়।
রাষ্ট্র ও সমাজের এভাবে মেরুকরণ কিন্তু দেশের অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধক। শাসকরা বিরোধী পক্ষকে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং এমনকি ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করে।
বাংলাদেশে সিভিল-মিলিটারি সংঘাত পুরনো। ১৯৭৫ সালে একদল তরুণ সেনা কর্মকর্তা খন্দকার মোশতাক আহমদ ও তাহেরউদ্দিন ঠাকুরের মতো আওয়ামী লীগের দক্ষিণপন্থি অংশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত করে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটায়। এ সংঘাত চলে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত। সে সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একযোগে আন্দোলন করে সামরিক শাসনের অবসান ঘটায়। কিন্তু ২০০৭ সালে এই সেনাবাহিনীই রাজনৈতিক অচলাবস্থার সময়ে দৃশ্যপটে চলে আসতে পারে। সে সময়ে বেসামরিক শক্তির মধ্যে বিভেদ হানাহানির রূপ নিয়েছিল। এ সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে আমরা বলতে পারি যে, রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতার চর্চার পাশাপাশি দলের ভেতরেও তার অনুশীলনই কেবল সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে।

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ :অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
 

No comments

Powered by Blogger.