পদ্মা সেতু-দক্ষিণাঞ্চলে রেলবন্ধনের সুবর্ণ সুযোগ

দাতাপক্ষগুলোর সঙ্গে ঋণচুক্তি সম্পাদনসহ গত কয়েক মাসে পদ্মা সেতুর ব্যাপারে অন্য সব অনিশ্চয়তা কেটে গেলেও প্রথম থেকে রেলসংযোগ স্থাপন এখনও অনিশ্চিত_ এমন খবর আমাদের আশাহতই করে। দেশের বৃহত্তম এ সেতু নির্মাণ উদ্যোগের গোড়া থেকেই যে এর ওপর রেললাইন বসানোর পরিকল্পনা ছিল সে কথা আমরা সবাই জানি।


এও অজানা নয়, মংলা বন্দরসহ রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেলবন্ধনের ক্ষেত্রে বহুল প্রত্যাশিত সেতুটি হতে পারে মোক্ষম মাধ্যম। বিপুল উপযোগিতা থাকা সত্ত্বেও কেবল নদীপথের বাধার কারণে রেল নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা বরিশাল, পটুয়াখালীসহ দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের জন্যও সেতুটি নিঃসন্দেহে বহুমাত্রিক সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে। কেউ কেউ আশাবাদ ব্যক্ত করছেন যে, পদ্মা সেতু নির্মিত হলে ফরিদপুর কিংবা বরিশাল থেকে রাজধানীতে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি সম্ভব হবে। যানজটসহ পরিচিত অন্যান্য বিঘ্নের কারণে তা যদিও কারও কাছে অতি আশাবাদ মনে হতে পারে; রেল যোগাযোগ থাকলে বরিশাল থেকে ঢাকায় দৈনিক যাতায়াত যে নির্বিঘ্নই হবে তাতে সন্দেহ নেই। আমরা জানি, বিভাগীয় শহরগুলোর মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্বের দিক থেকে বরিশালই রাজধানীর সবচেয়ে কাছে। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বরিশালকে মনস্তাত্তি্বকভাবে অনেক দূরের শহর মনে হয়। প্রাচ্যের ভেনিসখ্যাত এই বিভাগীয় শহরকে রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগের আওতায় আনতে পারলে সে দূরত্ব ঘুচতে সময় লাগার কথা নয়। পদ্মা সেতুতে রেললাইন স্থাপনের সঙ্গে শুধু অভ্যন্তরীণ রেল যোগাযোগ সংহত করার প্রশ্নও জড়িত নয়। বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পদ্মা সেতু সেক্ষেত্রে স্বভাবতই গুরুত্বপূর্ণ সংযোগে পরিণত হতে যাচ্ছে। সেখানে রেলপথ না থাকার বিষয়টি হেলায় সুবর্ণ সুযোগ হারানো ছাড়া আর কিছু হবে না। যে কারণে সরকার প্রথম থেকেই পদ্মা সেতুতে রেললাইন স্থাপনের ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। রেলওয়ে সূত্র উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেতুর সঙ্গে রেললাইন স্থাপন প্রকল্পে ঢাকা-মাওয়া-জাজিরা-ভাঙ্গা ৮৩ কিলোমিটার নতুন ব্রডগেজ লাইনের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে মূল সেতু এলাকা ছাড়া ৭০ কিলোমিটার রেলপথের অ্যালাইনমেন্ট নির্ধারণের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। সম্পন্ন হয়েছে রেলওয়ের নিজস্ব উদ্যোগে সম্ভাব্যতা যাচাই। এখন চলছে নকশা প্রণয়নসহ অন্যান্য কাজ। কিন্তু সমকালে বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, চালুর প্রথমদিন থেকে রেল সংযোগ স্থাপনের বিষয়টি এখনও সবুজ সংকেত পায়নি। এর মূল কারণ এ ব্যাপারে অর্থায়নে দাতাদের অনাগ্রহ। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় রেললাইন বসানোর জায়গা রেখে সেতু তৈরিতে আগ্রহী থাকলেও সাড়া দিচ্ছে না উন্নয়ন সহযোগীরা। পদ্মা সেতুর নকশা অনুযায়ী রেলপথের জায়গা থাকলেও তারা বলছে, রেলপথ নির্মাণের কাজটি বাংলাদেশ সরকারকেই করতে হবে। আমরা মনে করি, রেলওয়ে অ্যালাইনমেন্ট নির্মাণ, সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা প্রণয়নের কাজগুলো করে বাংলাদেশ সরকার এ ব্যাপারে পূর্ণ সহযোগিতার মনোভাব প্রদর্শন করছে। এখন দাতারা এগিয়ে আসবেন বলে প্রত্যাশা। এটি ঠিক যে, সেতু নির্মাণের পরও রেলওয়ে সংযোগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তা যে সহজ নয়, যমুনা নদীতে বঙ্গবন্ধু সেতুর ক্ষেত্রে আমরা তা দেখেছি। আমরা আশা করি, দাতা পক্ষগুলোর পদ্মা সেতুর অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার কথা মাথায় রেখে রেলওয়ে সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবস্থান গ্রহণ করবে।
 

No comments

Powered by Blogger.