অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী উন্নয়নের পণবন্দি by রণজিৎ বিশ্বাস

বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ফসল আমাদের স্বাধীনতা। সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের রক্তদান, প্রাণ বলি ও ত্যাগের পরিমাণ তুলনাবিরল শুধু নয়, তুলনারহিত। আমাদের ঘোষণাপত্রেও ধৃত আছে সব মানুষের জন্য সমতা, মানবমর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কথা।


১৯৭২ সালে প্রণীত আমাদের সংবিধান দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীসহ সব মানুষের মানবাধিকার সুরক্ষায় এক সেরা দলিল।
বাংলাদেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ প্রতিবন্ধী মানুষ। এই মানুষগুলোর সমস্যার রং এখনো আমরা চিনে উঠতে পারিনি। সমাজ ও পরিবার থেকেও তারা সব সময় বন্ধুসুলভ আচরণ পান না। শুধু আমাদের দেশেই নয়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবঞ্চিত হওয়ার ঘটনা বিশ্বব্যাপ্ত।
বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী দিবস পালিত হচ্ছে ১৯৯৯ সাল থেকে। জাতিসংঘের আহ্বানে পৃথিবীর সব দেশের মতো ৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশেও পালিত হয় আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস। কিন্তু জাতীয়ভাবে প্রতিবন্ধী দিবস পালনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দৃষ্টান্ত অনন্য। শুরুতে এপ্রিল মাসের প্রথম বুধবার এই দিবস পালন করা হতো। ২০০৮ সাল থেকে জাতিসংঘ কর্তৃক ২ এপ্রিলকে বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস ঘোষণা করার পর থেকে বাংলাদেশে জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস এবং বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস ২ এপ্রিল, একই দিনে পালন করা শুরু হয়। আমরা এক রকম বিস্মৃতই যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আলাদা প্রকোষ্ঠে তাদের বসিয়ে রেখে জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। উন্নয়নকাজে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা না গেলে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি প্রায়ই থাকে প্রতিবন্ধকতার ভূমিকায়। আমরা মানতে রাজি নই যে প্রতিবন্ধিকতা মানববৈচিত্র্যেরই অংশ। সংসারে প্রত্যেকেরই ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য আজকের দিনটি অত্যন্ত স্মরণীয়। এ দিনে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর প্রতি আমরা আমাদের অঙ্গীকার নবায়ন করি। কয়েক বছর সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, সমাজসেবা অধিদপ্তর, জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন ও জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম যৌথভাবে একই দিনে দিবসটি পালন করছে। অটিস্টিক ব্যক্তিদের উন্নয়নে কাজ করার দায়বদ্ধতা থেকে এ বছরের জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারিত হয়েছে_'অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী/উন্নয়নে পণবন্দি'। অর্থাৎ আমরা প্রতিবন্ধিত্ব ও শারীরিক সক্ষমতা-নির্বিশেষে উন্নয়নের পথে সম্মেলনগীতি গাইতে চাই।
এটি সত্য, দেশের অটিজম বিষয়ে সচেতনতা পর্যাপ্ত নয়। ফলে এ বিষয়ে একদিকে অনেক অটিস্টিক শিশুকে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না এবং শনাক্ত করা অটিস্টিক শিশুদেরও যথাযথ যত্ন প্রদান সম্ভব হচ্ছে না। কিছু ভ্রান্ত ধারণাও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সেবাপ্রাপ্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তারা উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারছে না। উন্নয়নের হাতিয়ার 'কর্মসংস্থান' এখনো তাদের অনেকের নাগালের বাইরে।
তাই কর্মহীন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সামাজিক অবস্থান ও উপযোগিতা বিশ্লেষণের ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ ও প্রতিবন্ধকতা এবং সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করা এখন সময়ের দাবি।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার সঙ্গে সংযোগ সম্পর্ক সব মন্ত্রণালয়ের থাকলেও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাদের কর্মসংস্থান সামাজিক জীবনে তাদের পূর্ণ অংশগ্রহণ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নানামুখী।
লেখক : সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব

No comments

Powered by Blogger.