বাঘা তেঁতুল-গোঁফ by সৈয়দ আবুল মকসুদ

প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের শরীরে যত রকমের কেশ রয়েছে, তার মধ্যে গোঁফ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিবিশেষে মাথার চুলের চেয়ে গোঁফের মর্যাদা বেশি। স্প্যানিশ চিত্রশিল্পী সালভাদোর দালির শিল্পকর্ম যত বিখ্যাত, তার চেয়ে বেশি খ্যাতি তাঁর গোঁফের। আশির দশকে তিনি যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন তাঁর গোঁফ নিয়ে বিপদে পড়েছিলেন তাঁর চিকিৎসকেরা।


গোঁফ না কাটলে লাইফসাপোর্ট যন্ত্রপাতি নাকে-মুখে লাগানো যায় না। যদিও তিনি অচেতন, তবু কার সাধ্য তাঁর গোঁফ কাটেন? চিকিৎসকেরা এক বুদ্ধি বের করলেন। বললেন, আপাতত গোঁফ জোড়া কেটে সরিয়ে রাখি। গোঁফের চেয়ে তাঁর জীবনের দাম কম নয়। তা-ই করা হয়েছিল এবং শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করা মাত্র যেখানকার গোঁফ সেখানেই সুপার গ্লু দিয়ে আটকে দেওয়া হয়।
মানবদেহের সব রকম চুলের মধ্যে শুধু গোঁফেই তা দেওয়া যায়। গাছে কাঁঠাল পাকার আগেই তাতে অনেকে তেল দেয়। কোনো কোনো মানুষকে শুধু গোঁফ দিয়ে যায় চেনা। অহংকারী লোকদের জীবনে এমন মুহূর্তও আসে, যখন তাঁদের গোঁফ নামিয়ে কথা বলতে হয়।
এবার রবীন্দ্রবর্ষ। তাঁর চুল, গোঁফ ও দাড়ি ছিল পর্যাপ্ত। যদি এই হিড়িকে ‘রবীন্দ্রনাথ ও গোঁফ’ শিরোনামে কোনো গবেষণাগ্রন্থ বের হয়, আমি তাঁর সম্পূরক আরেকটি বই লিখব। যার নাম হবে ‘গোঁফমুক্ত রবীন্দ্র-উত্তর কথাশিল্পী ও কবি’। তাতে প্রমাণ করার চেষ্টা হবে যে গোঁফ-দাড়ি ছাড়াও বড় কথাশিল্পী ও কবি হওয়া সম্ভব।
আধুনিক কবি-সাহিত্যিক আর বাউল সাধকদের কথা আলাদা। বাউলেরা গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে বেড়ান। দাড়ি-গোঁফ কামানোর কথা ভাববার সময় কোথায় তাঁদের? কেশ হিসেবে গোঁফ অমূল্য না অবাঞ্ছিত—সে তর্কে যাব না। শুধু এইটুকু বুঝি, কারও গোঁফে তার অনুমতি ছাড়া হাত দেওয়াও অপরাধ। গোঁফ কাটা বা ছাঁটা কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ মাসের প্রথম সপ্তায় পাংশা উপজেলায় ২৮ জন বাউল সাধুকে ধরে এক মসজিদে নিয়ে তওবা পড়িয়ে তাঁদের চুল ও গোঁফ কেটে দেওয়া হয়েছে। লম্বা গোঁফ ও চুল অনৈসলামিক বলে ফতোয়া দেওয়া হয়। সম্প্রদায় হিসেবে বাউলরা নির্বিরোধ। তা ছাড়া গোঁফ কতটুকু জায়েজ, আর কতখানি না-জায়েজ, তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় তাঁদের নেই। তা মাপজোকের দায়িত্ব ও কাটছাঁটের অধিকার ধর্মনেতাদের কেউ দেয়নি।
রবীন্দ্রনাথ একবার নজরুলকে বলেছিলেন, তুমি তলোয়ার দিয়ে দাড়ি কাটছ, ও-কাজটির জন্য ক্ষুরই উপযুক্ত। এখন তলোয়ার পাওয়া যায় না বলে দা দিয়েও চুল-গোঁফ কাটা হয়। খবরে জানা যায়, ‘বেশ কয়েকজন যুবক দা-কাঁচি দিয়ে বাউলদের চুল ও গোঁফ কেটে ইমামদের ফতোয়া বাস্তবায়ন করেন। তা ছাড়া বাউলদের গানের যন্ত্রপাতি ভেঙে ফেলা হয়।’
এই যে বাউলদের চুল ও গোঁফ ছাঁটা হলো, প্রতিবাদ করলেন সাংস্কৃতিক নেতা-কর্মীরা। রাজনীতিকেরা এসব সামান্য ব্যাপারে মাথা ঘামাবেন না। যাঁরা এ জাতীয় কাজ সমর্থন করেন না, তাঁরাও নীরব থাকেন এবং নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে তাঁদের সাংস্কৃতিক ফ্রন্টের নেতাদের কাঁধে বন্দুক বসিয়ে দেন। তাতে কাজ হলে তো হলো, না হলে না হলো।
প্রাক-মধ্যযুগীয় বর্বর কাজটি ঘটিয়েছেন মসজিদ ও মাদ্রাসার লোকজন। আমাদের ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামি চিন্তাবিদেরা কোনো কথা কইলেন না। তাঁরা তাঁদের লোকদের বেশি বকাঝকা না করেও এটুকু তো বলতে পারতেন যে কাজটা অন্যায় হয়েছে। নাকি তাঁদেরও অনুমোদন আছে এই কাটা ও ছাঁটায়?
কোনো কিছু কাটাতেই বাঙালির উৎসাহ। বনভূমির গাছ কাটছে। সড়কের বৃক্ষ কাটছে। পাহাড় কাটছে। নদীর পাড় কাটছে বালু ও মাটির জন্য। এখন গোঁফ ও চুল কাটা শুরু হলো। ধর্মরক্ষিণী সংঘসমূহের ফতোয়ার পরিসরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। এতদিন নারীর ওপর প্রযোজ্য ছিল। ধর্মাধিপতিদের শক্তি বাড়ছে। এরপর কবি, কথাশিল্পী, সংগীত ও নৃত্যশিল্পী, সম্পাদক, কলামলেখক—সবাইকে ফতোয়ার আওতায় আনা হতে পারে। দোররা সবার ওপর প্রয়োগ করা যাবে না। কিন্তু কাগজ, কলম ও কম্পিউটার কেড়ে নিয়ে তা বাদ্যযন্ত্রের মতো ভেঙে ফেলার হুকুম আসতে পারে। আজ যারা গোঁফ কেটেছে, একদিন তারা কোনো নৃত্যশিল্পীর কাটবে নাক—নাক তো গোঁফের কাছেই।
সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন গোঁফের বিরুদ্ধে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল হবে। ঠোঁটের কার্নিশের কিছু কেশের কারণে কোটি টাকা দামের বহু গাড়ি চুরমার হবে হরতালের দিন নয়—হরতালের আগের সন্ধ্যায়। গোঁফের বিরুদ্ধে জেহাদের ডাক আসতে পারে এবং গোঁফ না চাঁচলে ‘এক ঘণ্টায় দেশ অচল’ করে দেওয়ার হুমকিও আসতে পারে।
আলেম-ওলামা, মোল্লা-মৌলভিরা সমাজে যেমন শ্রদ্ধেয়, তেমনি বাউল-ফকির, সাধু-সন্ন্যাসীরাও শ্রদ্ধার পাত্র। আমাদের নিজ নিজ ধর্ম যেমন আমাদের কাছে খুব প্রিয়, একই রকম প্রিয় আমাদের সংস্কৃতি। ধর্মের ওপর আঘাত যেমন আমরা সহ্য করি না, সংস্কৃতির ওপর আঘাতও সহ্য করা সম্ভব নয়। কাথাটা ধর্মরক্ষিণী সংঘসমূহের অধিপতি ও হরতালওয়ালারা যেন ভুলে না যান। অন্যদিকে বাংলার যেসব কিশোরের এখনো গোঁফ গজায়নি, তাদের কাছে অনুরোধ—এখন থেকেই যেন তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে আমেরিকার প্রি-এমটিভ যুদ্ধ-ব্যবস্থার মতো।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

No comments

Powered by Blogger.