সরকারের নীরবতা পীড়াদায়ক-শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির হোতাদের বিচার হোক

শেয়ারবাজার নিয়ে সরকারের রহস্যজনক নীরবতা অনেকের কাছেই রীতিমতো পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে সংসদ সদস্যরাও এ কারণে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থাও গত সপ্তাহে সরকারকে


হুঁশিয়ার করে দিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় না আনা গেলে এবং বাজার স্থিতিশীল করা না গেলে সরকারকে বড় ধরনের খেসারত দিতে হতে পারে। কথায় বলে, সমঝদার ব্যক্তির জন্য ইশারাই কাফি। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ইশারা কেন, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও বর্তমান সরকারের টনক নড়বে না। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির ঘটনা তদন্ত করতে বর্তমান সরকারই বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। কমিটি যথাসাধ্য খোঁজখবর নিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়। তাতে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির জন্য স্পষ্টত দায়ী কিছু ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়। এর আগে পর্যন্ত শেয়ারবাজার নিয়ে সরকারের যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখা গেলেও প্রতিবেদন পেশ করার পর থেকেই দেখা যেতে থাকে নানা ধরনের টালবাহানা। একবার বলা হয়, আরো তদন্ত করে দেখা হবে। আবার বলা হয়, প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে জড়িত ব্যক্তিদের নামধাম বাদ দিয়ে। সরকারের, বিশেষ করে অর্থমন্ত্রীর নানা ধরনের বক্তব্যে শেয়ারবাজারের সঙ্গে জড়িত ৩৩ লাখ ব্যক্তির যেমন বুঝতে বাকি থাকে না যে সরকার দায়ী ব্যক্তিদের বাঁচাতে চাইছে, তেমনি দেশের শিক্ষিত, সচেতন জনগোষ্ঠীও সরকারের এই ভূমিকায় ঘৃণা ও উষ্মা প্রকাশ করতে থাকে। এমনকি মহাজোটের শরিক দলগুলোও দ্রুত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ ও জড়িত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করতে থাকে। যে বিএনপি প্রথমে এই তদন্ত কমিটি গঠনের বিরোধিতা করেছিল, তারাও প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানিয়েছে। সর্বশেষ আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরাও ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন সংসদ অধিবেশনে। তাঁরা জানতে চেয়েছেন, এরা কারা? এরা কি আদর্শ, দল ও দেশের চেয়ে বড় কি না। আরো নিন্দনীয় বিষয় হচ্ছে, সরকারের এমন দুর্বলতা ও দ্বিমুখী নীতির কারণে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা আজ খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের মতো একজন সজ্জন, নির্মোহ ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিকে নানাভাবে হেয় করার প্রয়াস পাচ্ছে। তারা আদালতে খোন্দকার খালেদের বিরুদ্ধে মানহানির মামলাও করেছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সম্ভবত সবচেয়ে বেশিবার যে কথাটি বলা হয়েছে, তা হলো, অপরাধী অপরাধীই, সে নিজ দলের হলেও তাকে রেহাই দেওয়া হবে না। আর তা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের কনিষ্ঠতম সদস্য পর্যন্ত। কিন্তু বাস্তব বলছে উল্টো কথা। অর্থাৎ অপরাধী নিজ দলের হলে তাকে রেহাই দেওয়ার জন্য অনেক অপচেষ্টাই করা হয়। কথা ও কাজের এই অসংগতি জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এর ফল বা পরিণতি কখনোই ভালো হবে না, হতে পারে না। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও এভাবে কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছিল এবং বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিল। এবারও তাই হলো। ফলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে শেয়ার কেলেঙ্কারি 'ব্র্যান্ডেড' হয়ে পড়ার কথাও অনেকে বলছেন। আওয়ামী লীগ সেই 'ব্র্যান্ডেড' হওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করার যে সুযোগ পেয়েছিল তা কাজে লাগাতে পারেনি, বরং তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করতে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় সেই 'ব্র্যান্ড' আরো স্থায়ী রূপ নিয়েছে। আমরা আশা করি, সরকার দেরিতে হলেও এ ব্যাপারে সুবুদ্ধির পরিচয় দেবে।

No comments

Powered by Blogger.