ছবি যেন শুধু ছবি নয় by মহসীন হাবিব

সেই কৈশোর থেকে আমরা একটি অতি চেনামুখ টেলিভিশনের পর্দায়, পত্রিকার পাতায় দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম। রাশভারী, কোট-প্যান্ট, চওড়া টাই পরা রাজকীয় সে মুখটি ছিল মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের, যিনি একনাগাড়ে ৩০ বছর দেশটির সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।


তাঁর বডি ল্যাঙ্গুয়েজই এমন ছিল যে ক্ষমতার ছটা বের হতো। হোসনি মুবারক কয়েক দিন আগে প্রবল এক আন্দোলনের মুখে মিসরের ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত পশ্চিমা বন্ধু যুক্তরাষ্ট্র মিসরের জনগণের আন্দোলনের সময়টিতে হোসনি মুবারকের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। ফলে গত্যন্তর না দেখে তিনি ক্ষমতা ছেড়ে দিলেন। এখন তিনি ও তাঁর পরিবার দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের সম্মুখীন। লক্ষ করলেই দেখতে পাবেন, তাঁর তিন দশক ধরে তৈরি হওয়া রাশভারী চেহারাটা মাত্র কয়েক দিনে উধাও হয়ে গেছে। চোখেমুখে হতাশাগ্রস্ত বিনয়ের ছাপ। যাঁরা চেহারার ভাষা পড়তে পারেন, তাঁরা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন, আজকের মুখটির সঙ্গে মাত্র ছয় মাস আগের মুখটিরও কত ব্যবধান!
ইতিহাসের শিক্ষক, অপেশাদার কেমিস্ট ও ফিজিসিস্ট লরা কুদু বাগবো আইভরি কোস্টের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ২০০০ সাল থেকে। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেনশিয়াল ইলেকশনে আলাসানে ওয়াতারা জয়লাভ করলে বাগবো ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকার করেন ভোট কারচুপি ও জালিয়াতির অভিযোগে। অবশেষে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে বাগবোকে ক্ষমতা ছাড়তে হয় এবং তিনি গ্রেপ্তার হন। এই লরা বাগবোর গত ১০ বছরের চেহারা অনেকেই দেখেছেন। ক্ষমতায় থাকতে তাঁর চেহারায় ইতিহাসের শিক্ষকের কোনো ছাপই ছিল না। এখন তাঁর চেহারায় বিনয়ী ভাব। হীনম্মন্যতা ফুটে উঠেছে তাঁর মুখাবয়বে। চেহারায় ক্ষমতার দ্যুতি নেই।
তাহলে কি ক্ষমতা মানুষের মস্তিষ্কের পাশাপাশি দেহকেও প্রভাবিত করে? আমাদের দেশের নেতা-নেত্রীদের মধ্যে এ পরিবর্তন আরো বেশি স্পষ্ট হয়ে, তীব্র হয়ে ফুটে ওঠে। কারণ এখানে এখন কেউ দায়িত্ব নেন না, ক্ষমতা নেন। বাংলাদেশে বহুকাল ধরে আমরা দেখে আসছি, ক্ষমতায় এলে নেতা-নেত্রীদের চেহারায় একটি খোলতাই ভাব আসে।
এমন লাখো সমস্যাজর্জরিত দরিদ্র একটি দেশের ১৭-১৮ কোটি মানুষের দায়িত্ব নিলে চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ পড়ার কথা। অতি ব্যস্ততার জন্য পোশাক-আশাক ও প্রসাধনী ব্যবহারে অবহেলা-অযত্নের ছাপ থাকার কথা। কিন্তু ঘটে পুরো উল্টোটা। ক্ষমতায় না থাকলে চেহারা মলিন হয়ে যায়। আর ক্ষমতায় গেলে কাউকে কাউকে এমন সজ্জিত দেখা যায় যে সজ্জার জন্য দিনে কমপক্ষে এক ঘণ্টা সময় দিতে হয়। বাংলাদেশে যেসব মানুষ শুধু একটি চাকরি করেন, বাড়িতে পরিবারকে কিছুটা হলেও সেবা দেন, তাঁরা জানেন, একটি ঘণ্টা সময় বের করা কত দুরূহ কাজ। আর দেশে যিনি কমপক্ষে চার কোটি পরিবারের অভিভাবকত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দায়িত্ব নেন, তাঁর সুখী, ক্ষমতাশালী চেহারা হয় কী করে? এ প্রশ্নের মধ্যেই লুকানো আছে বাংলাদেশের দুঃখের রজনী।
বিশ্বব্যাপী আরো লক্ষ করলে দেখা যাবে, 'যাঁরা প্রকৃত রাজনীতিবিদ, জনগণের জন্য রাজনীতি করেন, তাঁদের পোশাক-পরিচ্ছদ, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও চেহারায় কোনো পরিবর্তন আসে না। আমাদের কুমিল্লা থেকে এক দৌড়ে সীমান্ত পার হলেই ভারতের রাজ্য ত্রিপুরা। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার। যে চটি পরে ১৯৬৭ সালে ছাত্র অবস্থায় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে খাদ্য আন্দোলনে রাস্তায় নেমেছিলেন, আজও মুখ্যমন্ত্রী মানিকের পায়ে সেই একই চটি। তিনি ১৯৯৮ সাল থেকে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী। ২০০৮ সালের নির্বাচনে সম্পদের হিসাব দিতে গিয়ে মানিক ঘোষণা দেন, তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১৩ হাজার ৯২০ ভারতীয় রুপি আছে। তাঁর কোনো বাড়ি নেই, কোনো ভূমি নেই, নিজস্ব কোনো গাড়ি নেই। সংসার চলে স্ত্রী পাঞ্চালি ভট্টাচার্যের বেতনে। মানিক সরকারের স্ত্রী ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সমাজকল্যাণ বোর্ডের কর্মকর্তা। ত্রিপুরা রাজ্যে মানিকের সবচেয়ে বড় বিরোধী হলো কংগ্রেস। সেই কংগ্রেসের নেতারা উঁচু স্বরে বলে থাকেন, মানিকের সততা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। উল্লেখ্য, রাজ্য কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট এবং ১৯৯২-৯৩ সালে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী সমীর রঞ্জন বর্মণের সম্পদের পরিমাণ ১৬ মিলিয়ন রুপি। দরিদ্র মানিক তৃতীয়বারের মতো ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। ক্ষমতা ছাড়তে হলেও মানিককে কখনো পালাতে হবে না। মানিকের চেহারায় কোনো পরিবর্তন আসবে না।
বিশ্বের দিকে তাকিয়ে দেখুন, যেসব নেতার ক্ষমতায় গিয়ে চেহারাসুরতে কোনো পরিবর্তন আসেনি, তাঁরা জাতির গৌরব হয়ে আছেন, ইতিহাস হয়ে আছেন। ভারতের স্বাধীনতার আগে এবং স্বাধীনতার পর মহাত্মা গান্ধীর চেহারায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। 'দি ইন্ডিয়ান ফকির' সর্বদা একই রকম ছিলেন। নেলসন ম্যান্ডেলা কারাগারে থাকতে যেমন দেখতে ছিলেন, শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার নয়, সারা পৃথিবীর নেতা হয়েও তিনি একই রকম আছেন, বয়স বেড়েছে মাত্র। ক্ষমতার লোভ-লালসার আগুন পোড়াতে পারেনি নেলসন ম্যান্ডেলাকে। তিনি তাঁর আত্মজীবনী Long Walk to Freedom গ্রন্থে লিখেছেন, Although over the decades there have been many stories that I was in the line of succession to the Thimbu throne, the simple genealogy I have just outlined exposes those tales as a myth. Although I was a member of the royal household, I was not among the privileged few who were trained for rule.
তিনি বলেছেন, মুক্তির দীর্ঘপথ অতিক্রম করেছি। এ দীর্ঘপথে আমি ভুল করেছি, কিন্তু আত্মবিশ্বাস হারাইনি। একটি পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠে আমি দেখতে পেয়েছি, অসংখ্য পাহাড় এখনো বেয়ে ওঠা বাকি আছে। আমাদের নেতা-নেত্রীরা ইলেকশনের পাহাড়টি টাকার রশি দিয়ে বেয়ে উঠে তারপর আয়েশে শাসন করেন, অন্য কোনো পাহাড় অতিক্রমের কোনো দুশ্চিন্তা তাঁদের থাকে না। সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে আরামদায়ক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে দ্রুত পথ অতিক্রম করার সময় গাড়ির জানালা দিয়ে চোখ খুলে দেখেন না, অথবা দেখতে পান না, ঢাকার কর্মজীবী মানুষ তখন গণপরিবহনের ভেতরে প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত হয়ে পুড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, ইতিহাসের এক মহানায়ক আব্রাহাম লিংকনের চোয়াল ভাঙা ছিল। ক্ষমতায় গিয়ে লিংকনের সে ভাঙা চোয়াল ফুলে ওঠেনি।
আরো একজন মানুষের চেহারায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জেলজুলুমের পর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ছবির সঙ্গে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ছবির খুব একটা পার্থক্য নেই।
পাদটীকা : এক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের সফর নিয়ে অন্য দেশের সাধারণ মানুষের পাগল করা উচ্ছ্বাসের ঘটনা খুবই বিরল। সম্প্রতি আয়ারল্যান্ড সফর করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। রাজধানী ডাবলিনে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী 'ওবামা', 'ওবামা' চিৎকারে আকাশ-বাতাস মাতিয়ে তোলে। সিএনএন, বিবিসির মতো চ্যানেল মন্তব্য করেছে, মনে হয় যেন ওদের সামনে কোনো রকস্টার এসেছে। এমন উচ্ছ্বাস আমরা একবার দেখেছিলাম দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর কলকাতা সফরের সময়। ভারতের আকাশ 'জয় বাংলা' ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়েছিল।

লেখক : সাংবাদিক
mohshinhabib@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.