শিল্প-কারখানা বাঁচাতে হবে-গ্যাস-বিদ্যুৎ খাতে নৈরাজ্য দূর করুন

উন্নয়নের রোডম্যাপ, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, সবার জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ, ডিজিটাল বাংলাদেশ- আমরা এমনই কত না গালভরা বুলি প্রতিনিয়ত শুনে আসছি! আর নির্বাচনের আগে তো প্রতিশ্রুতি প্রদানের হিড়িক পড়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে আমরা সেসবের নাগাল পাই না।


ফলে দেশ বা দেশের মানুষের ভাগ্য আগের মতোই থেকে যায় কিংবা তার চেয়ে নিম্নগামী হয়। গ্যাস-বিদ্যুতের নিত্য সংকটে জনজীবন আজ চরম দুর্দশাগ্রস্ত। অথচ ক্ষমতাসীনদের নির্বিকার মনোভাবে পীড়িত হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই।
গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠে গ্যাসের সংকট নিয়ে যে সিরিজ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক। গ্যাসের সংকটে দেশের শত শত কারখানা স্থবির হয়ে পড়েছে। অনেক কারখানার উৎপাদন অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে। ফলে লোকসানের বোঝা বহন করতে না পেরে অনেক কারখানা বন্ধও করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ২০০৯ সালের জুলাই থেকে নতুন কারখানায় গ্যাস সংযোগ প্রদান বন্ধ রাখায় বহু কারখানা চালু করা যাচ্ছে না। আর দেশীয় উদ্যোক্তারাই যদি গ্যাসের অভাবে কারখানা চালু করতে না পারেন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগ এখানে আসবে কী করে? ফলে কর্মসংস্থান পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে বরং দিন দিনই অবনতি হচ্ছে। একই অবস্থা বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও। এখানেও প্রায় তিন বছর আগে থেকে শিল্প-কারখানায় বিদ্যুতের নতুন সংযোগ প্রদান বন্ধ রাখা হয়েছিল। গতকালেরই কালের কণ্ঠে প্রকাশিত আরেক খবরে জানা যায়, সরকার সারা দেশে ১৮ লাখ গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এই নতুন গ্রাহকদের উৎপাদন খরচের ভিত্তিতে বাড়তি মূল্য দিয়ে বিদ্যুৎ কিনতে হবে। অথচ লুটপাটের অভিযোগে অভিযুক্ত রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্রকল্পে উৎপাদিত বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি খরচ প্রায় চার-পাঁচ গুণ বেশি। সে ক্ষেত্রে নতুন সংযোগ পাওয়া কারখানাগুলো বিদ্যুতের অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে কি না, তা অবশ্যই সরকারকে বিবেচনা করতে হবে। অথচ গত শনিবার 'বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় আশু করণীয়' শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তাদের কেউ কেউ এমন অভিযোগও করেছেন যে কমিশন খাওয়ার জন্যই বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) ১৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রেখে কুইক রেন্টাল থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনা হয়। কোনো কোনো বক্তা এ জন্য জ্বালানি উপদেষ্টাকে দায়ীও করেছেন। আবার বিশেষজ্ঞদের দাবি, সিস্টেম লসের নামে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রতিদিন যে পরিমাণ বিদ্যুৎ চুরি হয়, তা বন্ধ করে বৈধ গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করা গেলেও পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হতো। কিন্তু সেসবে সরকারের বিশেষ কোনো আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। গ্যাস খাতেও চলছে একই ধরনের নৈরাজ্য। বৈধ গ্রাহকরা গ্যাস না পেলেও অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে চুরি করে গ্যাস বিক্রি করে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী। কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকেই জানা যায়, দৈনিক ছয় ঘণ্টা বন্ধ রাখার নির্দেশ থাকলেও কিছু সিএনজি স্টেশনে বিশেষ যোগসাজশে ২৪ ঘণ্টাই গ্যাস বিক্রি করা হয়।
গ্যাস-বিদ্যুতের এই সংকটে দেশে শিল্পের বিকাশ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে দেশে বেকারত্ব বাড়ছে। আর বেকারত্ব বাড়তে থাকলে তার বিপরীতে দারিদ্র্য বাড়ে, অপুষ্টি বাড়ে, অশিক্ষা বাড়ে এবং মানুষের কর্মদক্ষতা হ্রাস পায়। আবার বেকারত্বের প্রভাব পড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সমাজের নানা দিকে। ফলে সমাজের শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতি নষ্ট হয়। আমরা মনে করি, কেবল দোষারোপের রাজনীতি নয়, মিথ্যা আশ্বাসও নয়- বর্তমান সরকার এ ক্ষেত্রে তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালনের চেষ্টা করবে।

No comments

Powered by Blogger.