চারদিক-বাংলা বিভাগে বর্ষবরণ by শারমিন নাহার

১৪১৭ বাংলা সনের সূর্যটা বিদায় নিতেই সরব হয়ে উঠল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের বাংলা বিভাগ প্রাঙ্গণ। সূর্যের আলো নেই, তবে অন্ধকারের ঘোরে বেশি সময় কাটাতে হলো না। একবারেই জ্বলে উঠল বেশ কয়েকটা প্রদীপ। প্রদীপের আলোর ঝলকানিতে তখন উদ্ভাসিত বিভাগ প্রাঙ্গণ।


বিভাগের চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য শিক্ষকের অংশগ্রহণে প্রদীপ প্রজ্বালন অনুষ্ঠানটা হয় জমকালো। এরই মধ্যে ঢাক আর ঢোলের আওয়াজে মুখরিত হয় চারদিক। চৈত্রসংক্রান্তির এই ক্ষণে পুরোনো বছরকে বিদায় দিতেই যত আয়োজন। বিভাগের ছোট্ট করিডরের চারদিকে লাল, নীল আর রংবেরঙের রং-তুলির ছোঁয়ায় আঁকা আলপনা। বাঁশ আর কাঠ দিয়ে তৈরি অস্থায়ী ফটক দেখে মনে হচ্ছিল যেন নতুন কারও পদধূলি পড়বে এখানে, আর তার জন্যই এত আয়োজন। আসলেই তো তা-ই, রাত ফুরালে নতুনের আবির্ভাব, ১৪১৮ বঙ্গাব্দ। যে সূর্যের আলো বিচ্ছুরিত হবে বা নতুন যে বাতাস বয়ে যাবে এবং নতুন যে বৃষ্টির ফোঁটা শরীরে পড়বে, তাও নতুন। পুরোনো জরাজীর্ণতা ঝেড়ে ফেলে নতুন করে শুরু করার আয়োজনটা তো বেশি হবেই।
সকাল আটটা থেকেই শিক্ষার্থীরা আসতে থাকেন বিভাগে। নয়টার মধ্যেই তাঁদের সমাগম বাড়তে থাকে। ১৪১৮ সনের নতুন বছরের আনন্দটাকে আরও ভাগাভাগি করে নেওয়ার জন্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন।
নয়টায় শুরু হয় আনন্দ শোভাযাত্রা। কলাভবন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার প্রদক্ষিণ করে টিএসসি হয়ে আবার কলাভবনে এসে থামে। বিভাগের চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ আর বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে বর্ণিল শোভাযাত্রায় পরিণত হয় এটি। আনন্দ শোভাযাত্রায় উঠে আসে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি-সম্পৃক্ত চরিত্রগুলো। কী ছিল না শোভাযাত্রায়? রাধা-কৃষ্ণ, রাজা-রানি, বর-বউ, কিষানি, মালিনী, বাউল-সাধকসহ সংগ্রামী লাঠিয়াল বাহিনী; বাংলার মানুষ সৌন্দর্যপিপাসু, সঙ্গে সঙ্গে সংগ্রাম করে টিকে থাকার প্রত্যয় তাদের রয়েছে—এমন কথাই মনে করিয়ে দেয় চরিত্রগুলো। এমন দৃষ্টিনন্দন বর্ণিল শোভাযাত্রা মুগ্ধ করে উপস্থিত সবাইকে। কেবল বিভাগের শিক্ষার্থীরাই নন, ঘুরতে আসা লোকজনের অনেকেই অংশ নেন এই বর্ণিল শোভাযাত্রায়।
শোভাযাত্রা শেষে কলাভবনের সবুজ প্রাঙ্গণ জমে উঠেছে। লাল আর সফেদ সাদা কাপড়ের তৈরি মঞ্চের সামনে উপস্থিত দর্শক। ঘাসের ওপর বিছানো চাটাইয়ে বসেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা। উদ্দেশ্য তাঁদের অনুষ্ঠান দেখা। সূর্যের তেজ সেদিন কিছুটা কম। তাতে কী? কিরণ ছড়াতে তখন মাইক্রোফোন হাতে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক কিরণ এসে হাজির। তিন পর্বে ভাগ করা অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বের গানের আসর জমান বিভাগের শিক্ষার্থীরাই। শিল্পীর আসতে কিছুটা বিলম্ব, দর্শকের আর যেন তর সইছে না। এরই মধ্যে কানে ভেসে আসে গানের ধ্বনি—‘আমার দেশের মাটির গন্ধে ভরে আছে সারা মন’। বিভাগের প্রয়াত শিক্ষক মনিরুজ্জামান রচিত গানের মাধ্যমেই শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। গানের সুরেই মোহিত দর্শক। ‘আজি নূতন রতনে ভূষণে যতনে, প্রকৃতি সতীরে সাজিয়ে দাও’। নতুনকে বরণ করে নেওয়ার দিন তাই প্রকৃতিকে সাজাতে চায়, সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও।
গানে আর নাচে যখন মাতোয়ারা দর্শক, তখনই কিছুটা বিরতি। এর পরই দ্বীনবন্ধু মিত্রের বিয়েপাগল বুড়ো প্রহসন মঞ্চস্থ হয়। হাস্যরসেই এই প্রহসনের মাধ্যমে কোথায় যেন এক সূক্ষ্ম খোঁচা দেওয়া হয় সমাজকে। সন্ধ্যা নামতেই কানে ভেসে আসে ‘হা হা হা। এই সেই হোমরা ডাকাত, যার নাম শুনলেই সবাই আতঙ্কে শিউরে ওঠে।’ যাত্রাপালা মহুয়ার হোমরার সংলাপ এটি। দর্শক সমাগমে মুখরিত হয় পুরো অনুষ্ঠান, আর তা চলে রাত নয়টা পর্যন্ত। কেবল বর্তমান শিক্ষার্থীরাই নন, বরং প্রাক্তন অনেক শিক্ষার্থী আসেন এই বিশেষ আয়োজনে যোগ দিতে।
বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী রুবায়েৎ শারমিন বলেন, ‘কোথায় যেন ভালো লাগার একটা টান অনুভব করি। তাই প্রতিবছরই ছুটে আসি। নিজেদের বিভাগের দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠান অনেক ভালো লাগে। এ যেন এক মিলনমেলা।’
অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক বিভাগের শিক্ষক রফিকুল্লা খান বলে যান বিভাগের এই আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে, ‘বাংলা বিভাগ প্রতিবারের মতো এবারও আড়ম্বরেই বাংলা সনকে বরণ করে নেয়। এটা তো আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। বাঙালির জীবনে যে বহুমাত্রিকতা রয়েছে, তা পুরো আয়োজনের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা থাকে। আয়োজনটা এক দিনের হলেও এর ছাপ যেন সবার মাঝেই থাকে—এই চেষ্টা বিভাগের থাকে সব সময়ই।’
নতুন বছর বরণ করে নিয়ে সামনে এগিয়ে চলা। আর এই চলার পথ রোখার নয়, তাই বলতে হয়, ‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবৈশাখীর ঝড়, তোরা সব জয়ধ্বনি কর’।
শারমিন নাহার

No comments

Powered by Blogger.