নারী উন্নয়ন নীতি-নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠায় কী ভূমিকা রাখবে? by মালেকা বেগমনারী উন্নয়ন নীতি-নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠায় কী ভূমিকা রাখবে? by মালেকা বেগম

জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি নিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। দেশের প্রগতিশীল মানুষ তথা নারীসমাজ যখন নতুন নারীনীতিতে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেনি বলে আক্ষেপ করছে, তখন এ নিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের অপপ্রচারের উদ্দেশ্য বুঝতে অসুবিধা হয় না।


তারা চাইছে যেটুকু প্রগতির কথা আছে, তা নস্যাৎ করতে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর দুর্বল আবস্থানকে আরও দুর্বল করে দিতে। কেবল নারীনীতি নয়, নারীর পক্ষে যেকোনো ভালো উদ্যোগ নেওয়া হলে তারা অযথা হইচই করে।
এখন দেখা যাক নারী উন্নয়ন নীতি, ২০১১-এ কী আছে। এর সূচিপত্র থেকে জানা যায়, এই নীতি তিনটি ভাগে সাজানো হয়েছে। প্রথম ভাগে আছে ভূমিকা, পটভূমি, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নারী, বিশ্ব প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশ, নারীর মানবাধিকার ও সংবিধান, বর্তমান প্রেক্ষাপট, নারী ও আইন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, নারী মানবসম্পদ, রাজনীতি ও প্রশাসন, দারিদ্র্য, নারী উন্নয়নে সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরণ, সরকারি ও বেসরকারি কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা, সম্পদ ও অর্থায়ন, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।
দ্বিতীয় ভাগে আছে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির লক্ষ্য, নারীর মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, কন্যাশিশুর উন্নয়ন, নারীর প্রতি সব নির্যাতন দূরীকরণ, সশস্ত্র সংঘর্ষ ও নারীর অবস্থা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি, জাতীয় অর্থনীতির সব কর্মকাণ্ডে নারীর সক্রিয় ও সম-অধিকার নিশ্চিতকরণ, নারীর দারিদ্র্য দূরীকরণ, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, নারীর কর্মসংস্থান, জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট ও জেন্ডার বিভাজিত ডেটাবেইস প্রণয়ন, সহায়ক সেবা, নারী ও প্রযুক্তি, নারীর খাদ্যনিরাপত্তা, নারী ও কৃষি, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, নারীর প্রশাসনিক ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, গৃহায়ণ ও আশ্রয়, নারী ও পরিবেশ, দুর্যোগ-পূর্ববর্তী, দুর্যোগকালীন ও দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে নারী ও শিশুর সুরক্ষা, অনগ্রসর ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীর জন্য বিশেষ কার্যক্রম, নারী ও গণমাধ্যম, বিশেষ দুর্দশাগ্রস্ত নারী।
তৃতীয় ভাগে আছে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও কৌশল—জাতীয় পর্যায়ে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে, তৃণমূল পর্যায়ে। নারী উন্নয়নে এনজিও ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সহযোগিতা, নারী ও জেন্ডার সমতাবিষয়ক গবেষণা, কর্মপরিকল্পনা ও কর্মসূচিগত কৌশল, আর্থিক ব্যবস্থা, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা, নারীর ক্ষমতায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।
জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতির ৪৯টি ধারায় আরও ব্যাখ্যা করে প্রাসঙ্গিক সূত্রসহ, প্রেক্ষাপটসহ, বাস্তবায়নের পরিকল্পনাসহ বর্ণনা করা হয়েছে। রাষ্ট্রের আদর্শগত, শাসনগত, পরিকল্পনাগত বিভিন্ন নীতি রয়েছে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়কে কেন্দ্র করে তাদের কাজের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সেসব নীতি সামগ্রিকভাবে পরস্পরের পরিপূরকভাবেই কাজ করবে, সেটাই সরকারের প্রশাসনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। শিক্ষা, প্রযুক্তি, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, অর্থ, আইন ও বিচার বিভাগ, শ্রম ও কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, সমাজকল্যাণ, তথ্য ও গণমাধ্যম, দুর্যোগ প্রতিরোধ, গৃহায়ণ, ভূমি, পররাষ্ট্র, মহিলা ও শিশু, মানবাধিকার, প্রশাসন, স্বরাষ্ট্রসহ সব বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজ পরস্পরের পরিপূরকভাবে কতটা হচ্ছে, তা-ও ভেবে দেখা দরকার। দেশের সব জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ যেমন এর অভীষ্ট লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন, তেমনি মনোযোগ দিতে হবে আদিবাসীসহ সব দলিত জনগোষ্ঠী, সব প্রতিবন্ধী ও সব ধর্মাবলম্বী মানুষের উন্নয়ন অগ্রগতির প্রতি।
দেশের জনগোষ্ঠীর প্রায় ৫০ শতাংশ নারী। শ্রেণীগতভাবে, জাতিগতভাবে এবং ধর্মীয় দৃষ্টিতে নািরী ও পুরুষের রয়েছে অসম অবস্থান। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, কৃষি, ভূমি, সম্পদ, রাজনীতি, কর্মসংস্থান, তথ্য ও গণমাধ্যম, আইন ও বিচার, পররাষ্ট্র, রাজনীতি, মানবাধিকার, স্বরাষ্ট্রসহ অন্য সব ক্ষেত্রে নারী বৈষম্যের শিকার। সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে নারীর ওপর নানাবিধ নির্যাতনের তথ্য প্রতিদিন পাওয়া যাচ্ছে পত্রপত্রিকা, টেলিভিশন, আইন-আদালতের মামলার মাধ্যমে। আলোচ্য নারীনীতিতে এসব বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে, তথ্য দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিকারের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও বলা হয়েছে।
অস্বীকার করার উপায় নেই, যুগ যুগ ধরে এ দেশের নারীর প্রতি সামাজিক-পারিবারিক-রাষ্ট্রীয় অসাম্য-বৈষম্য চলে আসছে। সামগ্রিক বিচারে বলা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে এ দেশের মুসলিম নারীরা ব্যাপকভাবে অবরোধে-নিরক্ষরতায়-সংস্কৃতিচর্চায় পশ্চাদপদতার মধ্যে পরিবারে ও সমাজে অবদমিত, প্রায় শৃঙ্খলিত ছিল। হিন্দু নারীরা শিক্ষা-সংস্কৃতিচর্চায় তুলনামূলকভাবে অগ্রসর ছিল। কিন্তু সামাজিক-পারিবারিক অবরোধ ও বৈষম্যপূর্ণ অবস্থানের কারণে তারাও অনেকটা অধিকারবঞ্চিত ছিল। ব্রিটিশ যুগে সব নাগরিক পরাধীন হলেও নারীকেই বেশি সামাজিক-পারিবারিক কুসংস্কার, ধ্যান-ধারণা, অবদমন, বৈষম্য-নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে, যদিও সেই যুগেও বীরত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনে প্রগতিশীল পুরুষ নেতৃত্বের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহণ, অবদানও কম ছিল না। লীলা নাগ, প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, মনোরমা বসুসহ বহু নারীর অবদানের কথা আমরা জানি। মুসলিম নারীর অংশগ্রহণ মুষ্টিমেয় হলেও সমাজপ্রগতিতে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, শামসুন্নাহার মাহমুদ, সুফিয়া কামাল, জোবেদা খাতুন চৌধুরী, হোসনে আরা মোদাব্বের, দৌলতননেসা খাতুন অনন্য ভূমিকা রেখেছেন।
ধর্মভিত্তিক দেশভাগ যেমন ব্রিটিশ শাসকদের অপকৌশল ছিল, তেমনি দেশীয় রাজনীতিবিদদের স্বার্থপরতাও কম ছিল না। সব ধর্মের নারী-পুরুষ এর শিকার হয়েছে। নারীসমাজ সেই সময়েও পুরুষের তুলনায় বেশি মাত্রায় নিপীড়িত, বৈষম্যপীড়িত ছিল এবং এখনো আছে।
ব্রিটিশ শাসক তৈরি করে গেছে পার্সোনাল ল। ব্যক্তি আইনে বিভাজন সৃষ্টি করেছে ধর্মভিত্তিক পারিবারিক আইন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর মুসলিম নারী আন্দোলনের ফলে ‘মুসলিম পারিবারিক আইন, ১৯৬১’ বিধিবদ্ধ হয়েছিল, যা এখনো চালু আছে। মুক্তিযুদ্ধোত্তর গণতান্ত্রিক, অগণতান্ত্রিক—কোনো সরকার ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইনকে সংশোধন করে সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়নি। অন্যদিকে হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী নারীর জন্য পাকিস্তান শাসনামলে কিংবা স্বাধীনতার পর গত ৪০ বছরে পারিবারিক আইন করা হয়নি। ফলে তারা পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন, পারিবারিক অধিকার আদালত আইন, যৌতুকবিরোধী আইনের অধিকার থেকে বঞ্চিত। হিন্দু বিয়েতে রেজিস্ট্রেশন ও তালাকের বিধান নেই। ফলে স্ত্রীকে তালাক না দিয়েও স্বামী একাধিক বিয়ে করতে পারে। আবার হিন্দু নারীর তালাক দেওয়ার অধিকার না থাকায় স্বামীর পরিবারে আমৃত্যু অবদমিত, নির্যাতিত হয়ে থাকতে বাধ্য হয়। এ ছাড়া উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার নেই।
পাকিস্তান শাসনামলে এ দেশের নারীসমাজ সামাজিক-পারিবারিক কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে, উত্তরাধিকারে ছেলেমেয়ের সম-অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করেছে। মুক্তিযুদ্ধে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের লক্ষ্যও ছিল সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে রচিত সংবিধানেও ধর্ম-জাতি-বর্ণনির্বিশেষে নারী-পুরুষের সম-অধিকার ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু সেই বিধান অনুযায়ী আইন করা হয়নি। উত্তরাধিকার সম্পত্তিসহ সব ক্ষেত্রে তারা বৈষম্যের শিকার।
স্বাধীনতার পর এ দেশের নারীরা সম-অধিকারের আন্দোলন করলেও প্রতিনিয়ত বাধা পেয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, নিজের পরিবার, প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও সরকারের কাছ থেকে। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নারীসমাজের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালে প্রথম নারী উন্নয়ন নীতি ঘোষিত হয়। কিন্তু ২০০৪ সালে চারদলীয় জোট সরকার সেই নারীনীতির প্রগতিশীল ধারাগুলো বাদ দিয়ে একটি পশ্চাদপদ নারীনীতি ঘোষণা করে, যা নারীসমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এরপর ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আরেকটি নারীনীতি প্রণীত হলেও তা কার্যকর হয়নি। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকারের কাছে নারীসমাজের প্রত্যাশা ছিল একটি অধিকতর প্রগতিশীল নারীনীতি; অন্তত ১৯৯৭ সালের নারীনীতিতে যেসব ধারা ছিল, সেগুলো বহাল থাকবে। কিন্তু বর্তমান নীতিটি তা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি নারীর ক্ষমতায়নের গাইডলাইন হিসেবে সরকার বিবেচনা করছে। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এটিকে আমরা ভালো উদ্যোগ বলে মনে করি। হীন উদ্দেশ্যেই প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এর বিরোধিতা করে আসছে। সেই সঙ্গে আমরা এ-ও দেখছি যে নারীর উন্নয়ন, সম-অধিকার ও ক্ষমতায়নের বিষয়টি তথাকথিত প্রগতিবাদী পুরুষেরাও ভালোভাবে নিচ্ছে না। তাদের মৌনতা প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর পক্ষেই যাচ্ছে। বিশেষ করে সন্তানের অভিভাবকত্ব, স্ত্রীর সমমর্যাদা, যৌতুক, বাবার সম্পত্তিতে ছেলেমেয়ের সম-অধিকার, নারীর জন্য শ্রমবিভাজনের প্রচলিত ধ্যান-ধারণার ক্ষেত্রে তাদের মনোভাব নারীর ক্ষমতায়নে বড় বাধা। জাতিগত, ধর্মগত অনুদারতা সম-অধিকারের দাবিকে করছে ভূলুণ্ঠিত।
ঘোষিত নারীনীতির অনেক দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও দেশের নারীসমাজ এটিকে মন্দের ভালো হিসেবে মেনে নিয়েছে এবং তারা ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর যেকোনো আক্রমণ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। এ ব্যাপারে সরকারকে দুর্বল হলে চলবে না। মৌলবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে আপস করারও প্রয়োজন নেই। নারী উন্নয়ন নীতি দেশ ও সমাজের জাতীয় উন্নয়ন নীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই এর বাস্তবায়নে নারী-পুরুষনির্বিশেষে সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে।
সরকারকে এটা উপলব্ধি করতে হবে যে এই নারীনীতি একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া। কেবল নীতি প্রণয়ন করলেই হবে না, এর বাস্তবায়নের বাধাগুলোও দূর করতে হবে। নারী-পুরুষের বৈষম্যমূলক সব আইন রদ করতে হবে। সম-অধিকারভিত্তিক একটি প্রগতিশীল ও প্রাগ্রসর নারীনীতিই দেশ ও সমাজের সর্বস্তরে গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় করতে পারে।

No comments

Powered by Blogger.