আর কত বেঘোরে জীবন দেবে যাত্রী?-মেঘনায় লঞ্চ দুর্ঘটনা

গত বুধবার গভীর রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে মেঘনা নদীতে লঞ্চডুবির ঘটনাটিকে নিছক দুর্ঘটনা বলে চালানোর সুযোগ নেই। সেই রাতে ঝড়-বৃষ্টি ছিল না, তাই প্রকৃতির ওপর দায় চাপানো যাবে না। ৩০ বছরের পুরোনো এমভি বিপাশা নামের এই লঞ্চটি রাতের বেলায় ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী নিয়ে চলাচল করার কথা নয়।


তার পরও চলেছে, যার পরিণতি নির্ঘাত দুর্ঘটনা এবং বহু মানুষের মৃত্যু। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দুর্ঘটনাস্থল থেকে ৩৩টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
ভৈরবের মোটবী এলাকায় সম্প্রতি যে মালবাহী ট্রলারটি ডুবে যায়, তার সঙ্গে ধাক্কা লেগে লঞ্চটি দুর্ঘটনায় পড়ে বলে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর ও বিআইডব্লিউটিএর তাৎক্ষণিক তদন্তে জানা যায়। তাদের দাবি, চালকের ভুলের জন্য দুর্ঘটনা ঘটেছে। ডুবে যাওয়া ট্রলারের ধাক্কা লাগার পর লঞ্চটি থামালে দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। কিন্তু দুর্ঘটনাস্থলে নিশানা রাখার দায়িত্ব তো বিআইডব্লিউটিএর। নিশানা চুরি হওয়ার অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়।
লঞ্চটির সনদপত্র নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ গত মার্চে লঞ্চটিকে ডকইয়ার্ডে নিয়ে নিতে বললেও মালিক তা করেননি। নিয়ম অনুযায়ী লঞ্চে ৩৫টি জীবন রক্ষাকারী বয়া, চারটি অগ্নিনির্বাপণযন্ত্র এবং দুটি বালুর বাক্স থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ ছিল না বলে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। তাহলে অবস্থাটি দাঁড়াল, দুর্ঘটনাটি মানবসৃষ্ট এবং লঞ্চের মালিক, চালক ও বিআইডব্লিউটিএ—কেউ এর দায় এড়াতে পারেন না। নৌপরিবহনমন্ত্রী নিহতদের পরিবারকে ৩০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা বলেছেন। জীবনের মূল্য কি মাত্র ৩০ হাজার টাকা? নিহতের পরিবার ও আহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে লঞ্চমালিককেও বাধ্য করতে হবে।
দেশে সাধারণ মানুষের জীবন এতই তুচ্ছ যে, পথেঘাটে, নদীতে, সড়কে তাদের বেঘোরে জীবন দিতে হয়। বিআইডব্লিউটিএর একজন কর্মকর্তা বলেছেন, রাতের বেলা এই রুটে লঞ্চ চলাচল করার কথা নয়। তাহলে চলাচল করল কীভাবে? আমাদের দেশে অনিয়মই নিয়ম হয়ে যায়। এসব চলতে দেওয়া যায় না। কোনো দুর্ঘটনার পর কিছুদিন কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে, তারপর সবকিছু আগের মতো চলতে থাকে। লঞ্চ দুর্ঘটনা রোধে আগের সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে এমভি বিপাশার মালিক ও চালক এতটা স্বেচ্ছাচারিতা দেখাতে পারতেন না। নিছক লোক দেখানো নয়, লঞ্চ দুর্ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তার প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না। এবার তার পুনরাবৃত্তি হবে না বলেই আশা করি। এ ধরনের দুর্ঘটনারোধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সচেতনতার পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার নেওয়ার বিকল্প নেই।

No comments

Powered by Blogger.