ক্ষতিগ্রস্তদের সুদ মওকুফ হচ্ছে

শেয়ারবাজারে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করে যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের এক বছরের সুদের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মওকুফের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে নতুন আসা কোম্পানির শেয়ারের প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওতে ২০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণেরও প্রস্তাব করা হয়েছে।


পুঁজিবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে গঠিত বিশেষ স্কিম কমিটি এই সুপারিশ করেছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ১০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ ছাড়া পুঁজিবাজারবিষয়ক আট ধরনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) মতামত নেওয়াও বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। ১৯ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত জারি করা একটি নির্দেশনা গতকাল বুধবার সংশ্লিষ্ট মহলদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি পুষিয়ে দিতে গঠিত বিশেষ কমিটি ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১১ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত (৩৫ মাস) সময়কালে যাঁরা ঋণ নিয়ে ও নিজের টাকায় বিনিয়োগ করেছেন, তাঁদের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর এই সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ ৮৪ হাজার। এঁদের মধ্যে ঋণগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ছয় লাখ ৬৯ হাজার।
শেয়ারবাজারে যাঁরা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, কমিটি তাঁদের ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কমিটির হিসাব অনুযায়ী, ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এমন বিনিয়োগকারীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ ২৬ হাজার। ১০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ করে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীর সংখ্যা দুই লাখ ৫৮ হাজার।
ঋণগ্রস্ত ও ঋণের বাইরে থাকা বিনিয়োগকারীদের মোট ২২ হাজার ৩৪৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকার ক্ষতি নিরূপণ করেছে কমিটি। এর মধ্যে ঋণ ছাড়া যাঁরা ব্যবসা করেছেন, তাঁদের ক্ষতির পরিমাণ ১২ হাজার ২৭৯ কোটি ২৭ লাখ টাকা। আর ঋণ নিয়ে যাঁরা ব্যবসা করেছেন, তাঁদের ক্ষতি ১০ হাজার ৭০ কোটি ৬১ লাখ টাকা।
কমিটি জানিয়েছে, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৩৫ মাসে ঋণগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ঋণের বিপরীতে মোট সুদের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৬২৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছেন এমন বিনিয়োগকারীর ঋণের বিপরীতে সুদের পরিমাণ দুই হাজার ১২৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা, যা মোট সুদের ৮১ শতাংশ। আর ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকারীর সুদের পরিমাণ ৪৯৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা, যা মোট সুদের ১৯ শতাংশ।
কমিটি সুপারিশ করেছে, ঋণগ্রস্ত যেসব বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের এক বছরের (২০১১/২০১১-২০১২ অর্থবছর) সুদের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত মওকুফ করতে পারবে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির বিষয়টি আলাদা আলাদাভাবে বিবেচনায় নিয়ে সুদ মওকুফের সুপারিশ করা হয়। তবে মওকুফ করা সুদের পরিমাণ কোনো অবস্থাতেই ওই বিনিয়োগকারীর নিরূপিত মূলধনি ক্ষতির (ক্যাপিটাল লস) বেশি হতে পারবে না।
ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সুদ মওকুফের মাধ্যমে ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার সুপারিশ বাস্তবায়ন খুবই কঠিন বিষয়। কেন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সুদ মওকুফ করবে বা মওকুফ করা সুদের টাকা কোথায় থেকে আসবে—এসব বিষয়ের সুরাহা করে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি সহজে সম্ভব হবে বলে আমার মনে হয় না। এ ছাড়া সুদ মওকুফ করে দিয়ে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে—এটাও আমি মনে করি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘পুরো বিষয়টি সার্বিকভাবে বিবেচনায় নিয়ে হয়তো চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যার সমাধান হবে, এটা আমি মনে করি না। হয়তো সরকারের এই উদ্যোগ সাময়িকভাবে হলেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সহায়তা করবে, কিন্তু মূল সমস্যার সমাধান হবে না।’
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য: সচিবালয়ে গতকাল অনুষ্ঠিত পুঁজিবাজারবিষয়ক এক বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা জানেন যে একটা কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা এতে কিছু হিসাব-টিসাব করেছেন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও কিছু সময় লাগবে। কারণ, আরও কিছু কাজ বাকি রয়ে গেছে।’
ব্রোকারেজ হাউসসহ কয়েকটি পক্ষের সঙ্গে আলোচনার পরই ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ হওয়া দরকার মূলত দীর্ঘ মেয়াদে। কিন্তু আমাদের বিনিয়োগকারীরা তত বেশি প্রশিক্ষিত নন, যে কারণে এ বাজারে উত্থান-পতন হয় বেশি। এটি খুব খারাপ বিষয়। আর, বাজারের বর্তমান সমস্যা আসলে আস্থার। তারল্য কোনো সমস্যা নয় এখানে।’
ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের কী ধরনের বা কী প্রক্রিয়ায় ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে জানতে চাইলে মুহিত বলেন, ‘সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না।’ কবে জানা যাবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই ধরেন, ১০ দিন।’
অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা: পুঁজিবাজার বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা আট ধরনের নির্দেশনার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা পুঁজিবাজার সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত না হয়ে বিভিন্ন বক্তব্য ও মন্তব্য করার কারণে বাজার প্রভাবিত হওয়ার এবং বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। এ জন্য পুঁজিবাজারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বা বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে এসইসির সঙ্গে আলোচনা, পরামর্শ ও সমন্বয় প্রয়োজন।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও এসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, যেসব নির্দেশনা জারি করা হয়েছে, সেগুলো যথাযথভাবে পরিপালন বা মেনে চলা হচ্ছে কি না তা তদারকির জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি স্থায়ী ফোরাম করা উচিত। সেখানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধিকে সদস্যসচিব হিসেবে রাখা যেতে পারে।

No comments

Powered by Blogger.