রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প- আরও দুটি প্রশ্ন, জনবল তৈরিতে ভারতের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় ও প্রযুক্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
(ছবি:-১ রূপপুরের আবহাওয়া কোন ধাতুর ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা পরীক্ষার জন্য প্রায় ৫০ প্রকার ধাতুর পাত উন্মুক্ত স্থানে রাখা হয়েছে। এখন ধাতুর ওপর রূপপুরের পরিবেশের প্রভাব নিরূপণ করে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কোন যন্ত্রে কী ধরনের ধাতু ব্যবহার করা হবে, তা নির্ধারণ করা হবে l ছবি:-২ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এলাকায় বায়ুমান পরীক্ষা করছেন দুজন টেকনিশিয়ান। ছবির ছোট যন্ত্রটি দিয়ে প্রতিদিন তিনবার (সকাল, বিকেল ও রাত) তাঁরা বায়ুমান পরীক্ষা করেন। পরে সেই তথ্য পরীক্ষাগারে নানা ধরনের পরীক্ষা করা হয়। ১১ ডিসেম্বর বিকেলে ছবিটি তুলেছেন সাহাদাত পারভেজ)
প্রকল্পে ব্যয়
প্রকল্পের প্রাক্‌-নির্মাণ পর্বের ব্যয় সম্পর্কে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শুরু থেকে বলে এসেছেন রাশিয়ার কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় ঋণ হিসেবে ৫০ কোটি ডলার নেওয়ার কথা। বলা হয়েছে, এই টাকার পুরোটাই প্রাক্‌-নির্মাণ পর্বে লাগবে না। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এ পর্বে ব্যয় হবে ৫৫ কোটি ডলার। এর মধ্যে সাড়ে পাঁচ কোটি ডলার দিতে হবে বাংলাদেশকে। এ বিষয়টি নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে মতভেদও সৃষ্টি হয়েছিল। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ভুল-বোঝাবুঝির অবসান ঘটায় এবং সাড়ে পাঁচ কোটি ডলার দিতে রাজি হয়।
প্রাক্‌-নির্মাণ পর্বের কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট রুশ কোম্পানির সঙ্গে ইতিমধ্যে মোট ৫০ কোটি ডলারের তিনটি চুক্তি হয়ে গেছে। এর মধ্যে তৃতীয় চুক্তিটি সই হওয়ার আগেই ওই চুক্তির অধীনে ঠিকাদারি কোম্পানির অনুকূলে ১৯ কোটি ডলারের ক্রয় আদেশ অনুমোদন করে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির গত ১ জুনের সভায় ওই অনুমোদন দেওয়া হয়। আর চুক্তিটি সই হয় ৫ জুন। মূল প্রকল্পের ব্যয় সম্পর্কে রাশিয়ার পক্ষ থেকে সব সময় বলা হয়েছে, প্রাক্‌-নির্মাণ পর্বের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু সরকারের প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা শুরুতেই বলেছেন, এক হাজার মেগাওয়াটের প্রতিটি রি-অ্যাক্টরের জন্য ২০০ কোটি ডলার হিসেবে মূল প্রকল্পের ব্যয় হতে পারে ৪০০ কোটি ডলার। পরে প্রকল্প পরিচালক শৌকত আকবর এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলেন, মূল প্রকল্পের জন্য এক হাজার কোটি ডলার ঋণের ব্যাপারে সরকার রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে। রাশিয়া এই প্রকল্পে ঋণ হিসেবে দেওয়ার কথা মোট ব্যয়ের সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ। সেই অঙ্ক যদি এক হাজার কোটি ডলার হয়, তাহলে বাংলাদেশের ১০ শতাংশ এবং প্রকল্পের প্রাক্‌-নির্মাণ পর্বের ব্যয় মিলিয়ে মোট ব্যয় হবে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি ডলার বা প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ব্যয়ের এই অঙ্কটি প্রায় চারটি পদ্মা সেতুর ব্যয়ের সমান।
প্রযুক্তি
রূপপুর প্রকল্পে ‘ভিভিইআর-১০০০’ নামের যে প্রযুক্তির রি-অ্যাক্টর বাংলাদেশ নিতে চায়, গত কয়েক বছরে সেটি নিয়ে বেশ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, এর কিছু ত্রুটি ধরা পড়েছে। তা ছাড়া এর চেয়ে উন্নত প্রযুক্তি বাজারে এসেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ইউরোপের সমমানসম্পন্ন না হওয়ায় ১১টি ‘ভিভিইআর-১০০০’ রি-অ্যাক্টরের চুক্তি বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে হাঙ্গেরিতে দুটি, ইউক্রেনে তিনটি, জার্মানিতে চারটি ও চেক প্রজাতন্ত্রে দুটি রয়েছে। চীন তিয়ানওয়ানে ওই প্রযুক্তির রি-অ্যাক্টর বসালেও তার নিয়ন্ত্রণ প্যানেল নিয়েছে ইউরোপীয় একটি কনসোর্টিয়ামের কাছ থেকে। ভারতের তামিলনাড়ুর কুদনকুলামে এই প্রযুক্তির একটি কেন্দ্র অনেক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। জানতে চাইলে আবদুল মতিন বলেন, বাংলাদেশেরও উচিত ভিভিইআর-১০০০-এর পরিবর্তে উন্নততর সংস্করণের ভিভিইআর-১২০০ রি-অ্যাক্টর নেওয়া। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে সবার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার নিরাপত্তা। তাই নতুন প্রযুক্তি যখন পাওয়া যাচ্ছে, তখন পুরোনো প্রযুক্তি নেওয়া উচিত নয়। আর নতুন প্রযুক্তির রি-অ্যাক্টরের দামও তুলনামূলকভাবে বেশি নয়। অবশ্য রূপপুর প্রকল্প সূত্র বলেছে, রূপপুরে কোন প্রযুক্তির রি-অ্যাক্টর নেওয়া হবে, তা নির্ভর করবে সবগুলো সমীক্ষার ফলাফলের ওপর। রূপপুরে এখন সেসব সমীক্ষা চলছে।
জনবল তৈরিতে ভারতের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে
দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য অবকাঠামো (নিউক্লিয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচার) তৈরি ও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় দক্ষ জনবল তৈরি করতে ভারতও প্রশিক্ষণসহায়তা দেবে। সরকার এ ব্যাপারে ভারতের সহায়তা চেয়েছিল। সম্প্রতি ভারত তাদের সম্মতির কথা জানিয়েছে বলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র বলেছে। জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান ভারতের এই সম্মতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ভারত যেকোনো সময় সহযোগিতা করতে রাজি। কোন বিষয়ে কতজনকে সেখানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, তা চূড়ান্ত করে প্রস্তাব পাঠানো হবে। সরকারের পক্ষ থেকে ২০০৯ সাল থেকে বলে আসা হয়েছে যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রয়োজনীয় সব জনবল প্রশিক্ষণ দেবে রাশিয়া। এখন ভারতের কাছ থেকেও সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। কারণ, প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার রূপপুরে স​েরজমিন পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, পুরো অবকাঠামো তৈরির কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। সেখানে কর্মরত রুশ বিশেষজ্ঞরা বলেন, সমীক্ষার কাজও নির্বিঘ্নে চলছে। পাশাপাশি সমীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণের কাজ চলেছে মস্কোতে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনার সূত্র জানায়, প্রকল্পের কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবল গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চালাতে হবে। কিন্তু শুধু রাশিয়ায় প্রশিক্ষণ দিয়ে সময়মতো সব প্রয়োজন মেটানোর মতো জনবল তৈরি সম্ভব হবে না। তাই ভারতের সহায়তা নেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পরিচালক শৌকত আকবর প্রথম আলোকে বলেন, দুই ধরনের প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলা হচ্ছে। এক, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য জনবল। এর সম্পূর্ণটাই প্রশিক্ষণ দেবে রাশিয়া। দুই, পারমাণবিক অবকাঠামো তৈরির জন্য দক্ষ জনবল তৈরি। এই অংশের জনবল প্রশিক্ষণে ভারতের সহায়তা নেওয়া হবে।
শৌকত আকবর বলেন, দুই ধরনের মিলে মোট ৬০০ প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞ-কর্মকর্তা দরকার হবে। এর মধ্যে ৩০০ কারিগরি ও বিশেষজ্ঞ-কর্মকর্তার প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হতে পারে। এই জনবল কোনো নির্দিষ্ট বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য নয়। এদের কাজ হবে জাতীয় পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখতে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সুপারিশমালা ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সামগ্রিক কার্যক্রম গ্রহণ। এ সম্পর্কে পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী এ মতিন বলেন, ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার বিষয়টি খুবই সুবুদ্ধিপ্রসূত। কারণ, ভারত নিজেরাই রিঅ্যাক্টর তৈরি করে। তা ছাড়া বাংলাদেশ যে ধরনের রিঅ্যাক্টর বসাতে চায়, ভারতেও তা আছে। সেগুলোর সুবিধা-অসুবিধা ভারতীয় বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীরা ভালো জানেন। পারমাণবিক অবকাঠামো কোনো একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন বা সঞ্চালন লাইন তৈরির বিষয় নয়। নিরাপদে, নির্বিঘ্নে ও টেকসই উপায়ে একটি পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত প্রায় সবকিছুই পারমাণবিক অবকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। আইএইএর সমন্বিত পারমাণবিক অবকাঠামো গ্রুপ (আইএনআইজি) গত জানুয়ারিতে পারমাণবিক অবকাঠামোর ধারণাটি হালনাগাদ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিজেদের সামর্থ্য বাড়ানো; ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের সামর্থ্য বৃদ্ধি; আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নীতিমালা (আইএইএর মাইলস্টোন অ্যাপ্রোচ) অনুসরণ; পূর্বাপর সামঞ্জস্যপূর্ণ ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি ও মানসম্পন্ন তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ প্রভৃতি পারমাণবিক অবকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত।

No comments

Powered by Blogger.