চারদশকের বাংলাদেশ সমস্যা ও সম্ভাবনা by জি এম কামরুল ইসলাম

বাংলাদেশ অমিত সম্ভাবনা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল। সেদিন বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে একটা স্বাধীন দেশের জন্ম এবং একটা স্বাধীন জাতির আত্মপরিচয়ের সংগ্রামের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল।
আমাদের অগ্রজরা জীবন বিসর্জন দিয়ে মাতৃভাষার যথাযথ মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আমাদের সংবিধানসহ প্রতিটি আইন-কানুন অত্যন্ত উন্নতমানের। দেশে দীর্ঘদিন থেকে গণতন্ত্র চালু আছে। সন্ত্রাস দমনেও আমরা সাফল্য লাভ করেছি। অবকাঠামো ও অর্থনীতিসহ প্রায় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত একটা দেশকে তারপর থেকে আমরা বিশ্বের প্রায় ৪০ নম্বর শক্তিশালী অর্থনীতির দেশে পরিণত করেছি। বিভিন্ন ধরনের বড় বড় দুর্যোগ আর বিশ্বব্যাপী মন্দার মধ্যেও গত দুই দশক ধরে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের কাছাকাছি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আমাদের দক্ষতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত। ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশ হলেও খাদ্য উৎপাদনে আমরা প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। আমাদের জনসংখ্যার একটা বড় অংশই যুবক ও কর্মক্ষম, যাদের দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে ব্যবহার করে দেশে উন্নয়নের জোয়ার সৃষ্টি করা সম্ভব। আয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ সমগ্র বিশ্বের মধ্যে পোশাকশিল্পে দ্বিতীয় এবং রেমিট্যান্সে সপ্তম বৃহত্তর দেশ। আমাদের প্রায় এক কোটি লোক বিদেশে নিয়োজিত আছে। এ খাতে এখনো গুণগত এবং সংখ্যাগত কলেবর বৃদ্ধির প্রচুর সম্ভাবনা বিদ্যমান। ইতিমধ্যে দেশে একটা শক্তিশালী ও বড় আকারের উদ্যোক্তা ও মালিক শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছে। নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নসহ মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালীকরণ এবং সামাজিক অর্জনের মাধ্যমে আমরা জাতিসংঘের সহস্রাব্দ লক্ষমাত্রা অর্জনে প্রভূত সাফল্য অর্জন করেছি। নারীর ক্ষমতায়নের বিচারে আমাদের দেশের অবস্থান অষ্টম। ক্ষুদ্র ঋণের জন্য বিশ্বখ্যাত গ্রামীণ ব্যাংক এবং ব্র্যাকের মতো পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এনজিও আমাদের দেশেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে আমাদের অবস্থান প্রথম। ক্রিকেটে আমরা টেস্ট খেলার দেশ। এ রকম বড় বড় অনেক অর্জন আমাদের আছে। আমাদের এতসব অর্জনের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে দেশের কৃষক-শ্রমিক আর পেশাজীবী আপামর জনসাধারণ। তাঁরা কারো কোনো সাহায্য-সহযোগিতার জন্য অপেক্ষা না করেই কিংবা নূ্যনতম কিছু পেয়েই রাত-দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে দেশকে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি, বীর-প্রতীক আর ঝিনাইদহের হরিবাবুর (হরিধানের আবিষ্কারক) মতো লোকেরা যাঁরা নিজ উদ্যোগে গাছ লাগান, স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তাঘাট মেরামত ও সংস্কার করেন, এমনকি নিজে রিকশা চালিয়েও সাধারণ মানুষের জন্য হাসপাতাল স্থাপন করেন, তাঁদের উদ্যোগ আর মানবতা আমাদের আগামী দিনের সমৃদ্ধি আর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়ে থাকে।
কিছুদিন আগে প্রাক্তন সৈনিকদের এক সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে একজন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার শৃঙ্খলার অভাবকে আমাদের অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। স্বাধীনতার পর সেই সত্তরের দশকে আমরা যখন স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করেছি, তখন দেশের এক নম্বর সমস্যা কি তার ওপর অনেক উপস্থিত বক্তৃতা আর বিতর্ক করেছি এবং শুনেছি। আজকের মতো এত বেশি টেলিভিশন টক শো না হলেও তখনো নানা পর্যায়ে এ বিষয় নিয়েই অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। আজ মধ্য বয়স অতিক্রম করে এসে বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতি আর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে একই ধরনের প্রশ্ন আমাদের মনে বারবার ঘুরেফিরে আসে। আমি নিশ্চিত যে উলি্লখিত বিষয়গুলো আজও আমাদের বড় বড় সমস্যা সে ব্যাপারে আমার মতো কারো কোনো দ্বিমত নেই। তবে সব দিক বিবেচনা করে আমার মনে হয় যে বিবেক আর নীতি-নৈতিকতার অবক্ষয় এবং জাতি হিসেবে সম্মান হারানো আমাদের সমাজের অন্যতম সমস্যা। দেশ ও সমাজের বাহ্যিক অগ্রগতি হলেও বিবেকবিবর্জিত দেশ কর্মকাণ্ড নিয়ে বিশ্ব সমাজে আমরা যথাযথ মানসম্মান নিয়ে চলতে পারছি না। ছোটবেলায় পড়ে ছিলাম, "If money is lost nothing is lost, if health is lost, something is lost, if character is lost everything is lost" অর্থাৎ অর্থকড়ি কিংবা স্বাস্থ্য নয় বরং চরিত্র হারালে একজন মানুষ তার সব কিছু হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। আমাদের দেশ, আমাদের সমাজের অবস্থাও অনেকটা তাই হয়েছে। আমরা আমাদের চরিত্রের ভালো দিকগুলো হারিয়ে মানুষ হিসেবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। সবদিক বিশ্লেষণ করে তাই বলা যায় যে যারা বর্তমানে আমাদের সমাজের চালাক ও অধিক সুবিধাপ্রাপ্ত এবং যারা আমাদের আগামী প্রজন্ম, তাদের অনেকেই বিবেক আর নীতি-নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে শুধু ব্যক্তিস্বার্থে কাজ করছেন বিধায় জাতি হিসেবে আমরা যোগ্য সম্মান এবং যথাযথ অবস্থান থেকে বঞ্চিত হয়েছি। বিশ্ব সমাজে আমাদের অবদান আর অর্জনের কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন হচ্ছে না।
১৬ কোটি লোক নিয়ে আমাদের দেশ ও সমাজের বিস্তৃতি। তাই কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে যেকোনো ভালো উদ্যোগই হতে হবে ব্যাপক আকারে যাতে তা সমগ্র সমাজে একটা কার্যকর আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে। একটা বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, একটা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর কিংবা একটা আলোচনা সভার মাধ্যমে ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করা যেতে পারে, কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছু হবে না। তাই এ দেশে কোনো ভালো উদ্যোগের মূলমন্ত্রই হবে একটা বা কিছু হাসপাতাল তৈরি কিংবা কিছু ভালো কাজ নয়, বরং হাজার হাজার হাসপাতাল কিংবা হাজার হাজার ভালো কাজ করতে হবে। তাহলেই আমাদের সমাজে একটা পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। নীতি আর নৈতিকতার শিক্ষার ক্ষেত্রেও কথাটি সমভাবে প্রযোজ্য। সমাজে উদাহরণ হিসেবে নয়, বরং ব্যাপকভাবে নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা চালু করতে হবে। স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিষয়টি চালু করার পাশাপাশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পর্যায়সহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা এবং অনুশীলন কঠোরভাবে চালু করতে হবে। দুর্নীতিবাজসহ সমাজের জন্য কষ্টের যারা কারণ হয়, তাদের অবশ্যই কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। এ জন্য দরকার দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং যুগোপযোগী আইন-কানুন ও শিক্ষাব্যবস্থা। তাহলেই আমাদের দেশ ও সমাজের সম্ভাবনার পূর্ণ বাস্তবায়ন হবে। পর্যায়ক্রমে ব্যক্তি ও দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার হবে। দেশ ও জাতি বিশ্ব দরবারে যথাযথ সম্মান ও প্রতিপত্তি অর্জন করতে পারবে। আমরা সবাই সেই দিনের অপেক্ষায় থাকব। মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সাহায্য করুন।

লেখক : সমাজ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
E-mail:quamrul_gm@yahoo.com.

No comments

Powered by Blogger.